আজিজুন নাহার আঁখি

সুপ্রিয় সতীর্থ,
আসসালামু আলাইকুম। সবার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে কিছু বলতে এসেছি। আমার কথায় যদি কারোর মন খারাপ হয় বা পছন্দ না হয় তাহলে ইগনোর করতে পারেন। বর্তমান প্রেক্ষাপট বিবেচনায় সবার উদ্দেশ্যে দুই চারটা কথা শেয়ার করার জন্যই আমার আজকের উপস্থাপন।
আশা করছি আপনারা ভালো আছেন। অবশ্য দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে ভালো থাকা সম্ভব হচ্ছে না। আমরা একটা নতুন পরিবেশের মাঝে দিনাতিপাত করছি। আমাদের সন্তানদের বুকের তাজা রক্তের দাগ এখনো মুছে যায়নি। আহত ছাত্রদের ক্ষত শুকায়নি।
সন্তান হারা বাবা মায়ের আর্তনাদ,হাহাকার,দীর্ঘশ্বাস যেনো বাতাসে মিশে গেছে। আর এরই মধ্যে বন্যায় ভাসছে দেশের লাখো লাখো মানুষ। আমাদের সন্তানেরা সব জায়গায় নিজেদেরকে শতভাগ উৎসর্গ করেছে। রাজপথে যেমন রক্ত দিয়েছে তেমনি বানভাসি মানুষের দ্বারেদ্বারে ত্রান নিয়ে ছুটে গিয়েছে। আমরা অবশ্যই তাদের এসব কাজকে স্যালুট জানাই।
মানুষ জন্মের পরে তার পরিবার থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে তার কথাবার্তা, চালচলন পোশাক পরিচ্ছদ কেমন হবে। আর জ্ঞানের ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করার জন্য শিশুদের স্কুলে পাঠানো হয় শিক্ষকের কাছে।
কোমলমতি শিশুদের আদর স্নেহে একটু একটু করে গড়ে তুলেন বাবা মায়ের পাশাপাশি তাদের শিক্ষাগুরু। অ,আ, ক,খ থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত প্রতিটি জায়গায় শিক্ষক ছাত্রদের জ্ঞান সমৃদ্ধ করার কাজে লিপ্ত হন।
আদর দিয়ে শাসন দিয়ে তাদেরকে প্রকৃত মানুষ গড়তে নিজেদের শ্রম মেধা ঢেলে দেন।
এখানে একটা কথা উল্লেখ না করলেই নয় যে শিক্ষার জন্য ছাত্র অভিভাবক, শিক্ষক এই তিনের সমন্বয় প্রয়োজন। শিক্ষকদের মধ্যেও ভালো মন্দ আছে। কেউ কেউ ব্যক্তিগত সুযোগ সুবিধার জন্য শিক্ষার্থীদের সাথে খারাপ আচরণ করে আবার প্রতিষ্ঠান পরিচালনায়ও আধিপত্য বিস্তার করে অন্যদের ক্ষতি করে।কিন্তু এধরণের শিক্ষকের সংখ্যা অতি নগন্য। কোনো শিক্ষক যদি নীতি বহির্ভূত কাজে লিপ্ত থাকেন বা কোনো অপরাধ করে থাকেন অবশ্যই তাদেরকে আইনের আওতায় এনে বিচার করতে হবে। ছাত্র শিক্ষকের সম্পর্কে কখনো শত্রুতা থাকতে পারে না। ছাত্র শিক্ষকের মধ্যে শ্রদ্ধা, স্নেহ,ভালোবাসা বিদ্যমান।
গত কয়েকদিন যাবত বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধানদের জোর করে পদত্যাগ করানো দেখে পুরো শিক্ষক জাতি স্তম্ভিত। গায়ের জোরে আজ ছাত্ররা যেভাবে শিক্ষকদের অসম্মান করছে তা কি অভিভাবকদের দৃষ্টিতে আসেনি?অনলাইনে গেলেই কান ধরে ওঠবস করানো, গায়ে হাত তোলা থেকে শুরু করে জুতার মালা পর্যন্ত পরানোর ভিডিও চিত্র দেখা যাচ্ছে। ছাত্র সন্তানতূল্য হয়েও বাবা মায়ের বয়সী শিক্ষক আজ লাঞ্চিত হচ্ছে।ভুলে গেলে চলবে না ” বন্যেরা বনে সুন্দর শিশুরা মাতৃক্রোড়ে”। ছাত্রদের কাজ শ্রেণিকক্ষে শিক্ষককে লাঞ্চিত করার কাজ নয়।
আমি শুধু শিক্ষক নই একজন অভিভাবক। তাই অভিভাবকদের কাছে নিবেদন আপনাদের সন্তানদের উষ্কে না দিয়ে ঠান্ডা মাথায় বুঝান। আজ যারা শিক্ষকদের অসম্মান করছে ভবিষ্যতে যে তারা তাদের বাবা মায়ের সাথে খারাপ ব্যবহার করবে না সেটা কে বলবে? মানুষ ভুলের উর্ধ্বে নয়। অনেক সময় পিতামাতার ভুল সিদ্ধান্তের জন্য সন্তানের জীবনে বাঁধা আসে বা আসতে পারে। বাবা মায়ের অপরাধ ধরা পরলে তখন কি বাবা মাকেও অসম্মান করবে?
জীবনে সাফল্য অর্জন করতে বাবা মায়ের আশীর্বাদ প্রয়োজন তেমনি শিক্ষকের আশীর্বাদও প্রয়োজন। আর আশীর্বাদ গায়ের জোরে বা অর্থে কেনা যায় না। আরও একটা কথা সম্মান না করলে সম্মান পাওয়া যায় না।আজ যাদের কারণে শিক্ষক অসম্মানিত হলেন, পারিবারিক, সামাজিক ভাবে হেয় হলেন তার দায় শুধু ছাত্রের নয় আমাদেরও। আর ছাত্রদের পিছনে যদি মদদদাতা থাকে তাহলে তাদের খোঁজ নেয়ার ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করছি। আমাদের সূর্য সন্তানরা অনেক বাঁধা পেরিয়েছে। তারা জয়ী হয়েছে তাদের দাবী আদায়ে।সবাই তাদের এই অবদান আজীবন স্মরণ করবে।
প্রিয় অভিভাবক আর সময়ক্ষেপণ নয় এখনই সময় সন্তানদের সঠিক পথে আনুন।ওরা আমাদের সূর্য সন্তান ওরা সাহসী বীর তাই ওদের গায়ে কালিমা লাগলে তা ধুয়ে দেয়ার দায়িত্ব কিন্ত আমাদের অভিভাবকদের। আমার আপনার সন্তানের জন্য যেনো কোনো পরিবারের ভবিষ্যৎ অন্ধকার না হয় সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখার অনুরোধ করছি। অনেক রক্ত ঝরেছে অনেক ক্ষত হয়েছে এখন হৃদয়ে ক্ষত না করি।ছাত্ররা যেনো কারোর মদদে নিজেদেরকে উশৃংখল করে না তুলে। সন্তানের ভুল ত্রুটি বাবা মা কখনো মনে রাখে না।আমার বিশ্বাস শিক্ষকও ছাত্রের ভুল ত্রুটি মনে রাখবেন না।
একটিবার ভাবুন তো আপনার সন্তান আপনার সাথে এমন আচরণ করছে তখন কেমন লাগবে? শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পবিত্রতা রক্ষা করতে যদি কোনো শিক্ষককে বাদ দিতে হয় তাহলে তাকে আইনের আওতায় এনে বাদ দেয়ার ব্যবস্থা করুন।প্লিজ আমাদের সন্তানদের দিকে যেনো কেউ আঙ্গুল তুলতে না পারে সেই ব্যবস্থা করুন। আজ অনলাইনে নিউজে দেখলাম সেদিন অধ্যক্ষ নুরূল ইসলাম স্যার পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করার সাথে সাথেই স্ট্রোক করেছিলেন আর আজ তিনি মারা গেছেন। আমরা কি বিবেকের কাছে একবারও জিজ্ঞেস করেছি এটা কি ঠিক হয়েছে?
অনলাইনে শিক্ষকদের অসম্মান দেখে অনেকেই দু:খ প্রকাশ করে স্ট্যাটাস দিচ্ছে। কেউ কেউ সেই সব পোস্টের বিপরীতে পোস্টে লিখছে যে তারা না কি সুশীলতা দেখাচ্ছে।এটা না কি ঠিক হচ্ছে না। আচ্ছা আপনার মনকে একবার জিজ্ঞেস করে দেখুন তো ছাত্রের কাছে শিক্ষক লাঞ্চিত হওয়া কি ঠিক? শিক্ষককে যদি মানুষ গড়ার কারিগর বলা হয় তাহলে সেটা আজ ভুল প্রমাণিত হচ্ছে।
আমি শিক্ষকতা পেশায় আছি ২১ বছর ৯ মাস ধরে। আর এই দীর্ঘ পথ চলতে আমি আমার ছাত্রদের অকৃত্রিম ভালোবাসায় মুগ্ধ হয়েছি। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে শিক্ষক হিসেবে অসহায় বোধ করি।
ছাত্র শিক্ষকের সম্পর্ক হোক শ্রদ্ধার,স্নেহের,ভালোবাসার। দেশে বিদেশে সব জায়গায় আমাদের সন্তানেরা বীরের মতো সমৃদ্ধি বয়ে আনবে ইনশাআল্লাহ। ছাত্রের মাথায় শিক্ষকের আশীর্বাদের ছোঁয়া পাওয়ার জন্য আর অপমান নয় শ্রদ্ধা,সম্মান বজায় থাকুক।
আমার সন্তানসম ছাত্রদের উজ্জ্বল ভবিষ্যত কামনায় আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি।

Leave a Comment