আজিজুন নাহার আঁখি

এক মায়ের আর্তনাদ

শিখা ও রাকেশ এর স্কুল জীবনের কিশোর প্রেম একসময় গভীর ভালোবাসায় রূপ নেয়। আর কলেজ পেরুনোর আগেই তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়। একদিন কলেজ থেকে ফেরার পথে বৃষ্টির মধ্যে তারা কাছেই এক মন্দিরে আশ্রয় নেয়।
বৃষ্টিস্নাত শিখা ও রাকেশ একে অপরের ভালোবাসাকে পরিপূর্ণ করতে পুরোহিতের সাথে কথা বলে। আর মন্দিরেই তাদের অনানুষ্ঠানিক বিয়ে হয়। অঝোরে বৃষ্টি পড়তে থাকে তাই ঠাকুর মশাই ওদেরকে থাকার ব্যবস্থা করে দেয়।
শিখা বাড়ি ফেরার জন্য ছটফট করতে থাকলেও প্রকৃতি তার পথ রোধ করে। দুজনের ভালোবাসার সাক্ষী থাকে ঐ মন্দিরের পুরোহিত। দুজনেই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয় যে কারোর বাড়িতে বিয়ের খবর আপাতত জানাবে না। সন্ধ্যার পরপরই বৃষ্টি থেমে গেলে দুজনেই যার যার বাড়িতে ফিরে আসে।
শিখা বাড়ি ফেরার পরে মায়ের কাছে অনেক জবাবদিহিতা করতে হয়। কিন্তু সবার অজানা থাকে সেই বৃষ্টিস্নাত দিনের কথা। পরের দিন শিখা কলেজে যায়না তাই রাকেশের সাথে দেখাও হয়না। রাকেশ অবশ্য শিখার জন্য অপেক্ষায় ছিলো।
এরপর শিখাকে নিয়ে রাকেশ বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জায়গায় সময় পার করে। এভাবে ২/৩ মাস যাবার পর হটাৎ করে একদিন শিখার খুব বমি হয়, গা গুলোয়,মাথা ঝিমঝিম করে। সেদিনও শিখা কলেজে যায়না। পরের দিন কলেজ থেকে ফেরার পথে আবারও মাথা ঘুরে পরে গেলে রাকেশ পাশেই একটা নার্সিং হোমে নিয়ে যায়। নার্সিং হোমের ডাক্তার পরীক্ষা নিরীক্ষা করে বলে যে শিখা অন্ত:স্বত্বা। কথাটা শুনে শিখা রাকেশকে বলে যে আজই তাদের বিয়ের কথা সবাইকে জানাতে। কিন্তু রাকেশ এতে দ্বিমত পোষণ করে এবং অনাগত সন্তানকে এবারশন করতে বলে। কিন্তু শিখা কোনোভাবেই এবারশন করতে রাজি হয়না।
রাকেশ নানা ভাবে শিখাকে বুঝাতে থাকে কিন্তু শিখা বলে আমি মরে যাবো কিন্তু আমার ভেতরে যে আসছে তাকে হত্যা করতে পারব না। রাকেশের সাথে কথা কাটাকাটি করে বাড়ি ফিরে শিখা চিন্তার সাগরে হাবুডুবু খেতে থাকে।
কয়েকদিন শিখা এভাবেই বাড়িতে থাকে। তারপর কলেজে গিয়ে রাকেশকে খুঁজে পেলেও রাকেশ এড়িয়ে যায়। লাইব্রেরিতে রাকেশ পড়তেছিলো তখন শিখা পাশে বসা মাত্রই উঠে আসে আর শিখা রাকেশের হাত ধরে বলে চলো আজ সবাইকে জানিয়ে দেই। রাকেশ বলে কি জানাবে? কি প্রমাণ আছে তোমার সন্তান আমার? মন্দিরের যে পুরোহিত আমাদের বিয়ের সাক্ষী সে গত পরশু হার্ট অ্যাটাক করে মারা গেছে। এখন হয় এবারশন করাও না হয় আমাকে পাবে না।
এবার শিখার আরও চিন্তা হতে থাকে। এক কথায় দুই কথায় রাকেশের সাথে ঝগড়া হয় এবং শিখা বলে যে এই সন্তান পৃথিবীর আলো দেখবে আর তখন ঠিক রাকেশ যে তার জন্মদাতা এটা প্রমাণ করবো।
রাকেশের মাথায় দুষ্ট বুদ্ধি খেলা করে। সে শিখাকে মেরে ফেলতে চায়। আর এজন্য সে শিখার বাড়ি ফেরার পথে বিষাক্ত এসিড নিয়ে অপেক্ষা করে। গাছের আড়াল থেকে শিখার উপর এসিড নিক্ষেপ করে দৌড়ে পালায়। এসিডদগ্ধ শিখা যন্ত্রণায় ছটফট করে অজ্ঞান হয়ে যায়।
জ্ঞান ফিরে সে কিছুই দেখতে পায়না কারণ তার পুরো চোখ মুখ ব্যান্ডেজ পেঁচিয়ে রাখা হয়েছে। শিখার মায়ের আর্তচিৎকারে হাসপাতালের পরিবেশ ভারি হয়ে ওঠে। এরই মধ্যে যখন সবাই জেনেছে যে শিখা প্রেগন্যান্ট আর ঠিক তখন সবাই তাকে অবহেলা অপমান করে সরে যায়। এমনকি শিখার বাবা ভাইবোনও চলে যায়। পাশে থাকে শুধু তার মা। মা একবারও জানতে চায়নি শিখার এই অবস্থা কিভাবে হয়েছে? দিন রাত মেয়ের সেবা করে যাচ্ছে। যাই করুক তার মেয়ে কিন্তু সে যেনো বেঁচে থাকে। শিখার বাবা সাফসাফ জানিয়েছে যে এই কুলাঙ্গার মেয়েকে সে কোনোদিনও বাড়িতে উঠতে দিবেনা আর এক্ষুনি যদি শিখার মা বাড়ি না ফিরে তাহলে তাকেও না। শিখার মাও স্বামীকে জানিয়ে দেয় শিখা আমার নাড়িছেঁড়া ধন আমি তাকে বিপদে ফেলে কোথায় যাই? প্রয়োজনে আমি আমার মেয়েকে নিয়ে রাস্তায় থাকব। এক সপ্তাহ এভাবেই কেটে যায় আর শিখা জানতেও পারেনা যে তার এই কষ্টের কারণ রাকেশ। এসিডদগ্ধ শিখার একটা চোখ অন্ধ হয়ে যায় যা আর ঠিক হবার নয়। মুখটা পুড়ে বিশ্রী দেখতে ভয়ংকর। তারপরও শিখার মা শিখার এই যুদ্ধে তার পাশে থেকে জীবন যুদ্ধে লড়াই করতে থাকে।

শিখাকে নিয়ে ওর মা রেল স্টেশনের কাছেই একটা বস্তিতে গিয়ে ওঠে। বিভিন্ন বাসায় বাসায় ঘুরেও কোনো কাজের ব্যবস্থা করতে পারেনা। তখন নিজের কানের দুল বিক্রি করে স্টেশনে ঘুরে ঘুরে পানির বোতল বিক্রি করে নিজেদের চলার ব্যবস্থা করে। এদিকে শিখার মুখ এসিডে এতোটাই ঝলসেছে যে তাকালেই ভয় করে। তাই সারাক্ষণ মুখের একপাশে ঘোমটা টেনে ঢেকে রাখে। একদিকে শিখার চিকিৎসা আরেকদিকে থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করতে শিখার মা হিমশিম খায়। আর শিখার বাবাতো সেই যে হাসপাতাল থেকে চলে গিয়েছে আর খবর নেয়নি।
শিখার একটা চোখ তো তখনই ঝলসে নষ্ট হয়ে গেছে এখন আরেকটা চোখেও কম দেখছে। তাই শিখার মা মেয়েকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। বিভিন্ন পরীক্ষা করে ডাক্তার জানান যে শিখার এই চোখে অতি দ্রুত একটা সার্জারী করা লাগবে তা না হলে এটাও নষ্ট হতে পারে। একথা শোনার পর শিখার মায়ের চিন্তা আরও বেড়ে যায়।একদিকে শিখা প্রেগন্যান্ট আরেকদিকে চোখের সার্জারি।ডাক্তার বলেছেন বাচ্চা ডেলিভারি হবার পরে দ্রুত সার্জারি করতে হবে।
অসুস্থ শিখার পাশে মা ছাড়া আর কেউ নাই। বারবার রাকেশের কথা মনে করে ঘৃণায় ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠে। এ কাকে ভালোবেসেছিলো যে কি না নিজের স্ত্রীকে বিপদে ফেলে সরে গেছে। নিজের উপরও রাগ হয় কিন্তু শিখা মাকেও বলেনা রাকেশের পরিচয়। মনে মনে স্থির করে সুস্থ হলে টিউশনি করে নিজেদের ব্যবস্থা করবে মাকে আর কষ্ট করতে দিবে না।
দেখতে দেখতে সন্তান প্রসবের সময় এসে যায়। কোনো সার্জারি ছাড়া শিখার কোল জুড়ে এক কন্যা সন্তানের জন্ম হয়। হাসপাতালে দুই দিন থাকার পরই বস্তিতে ফিরে আসে। শিখা তার মেয়ের নাম রাখে আলো। বেশিরভাগ সময় আলো শিখার মায়ের কোলেই থাকে।
আলোর বয়স দুই মাস হবার পরে শিখার চোখের সার্জারির দিন ঠিক হয়। একটা এনজিও থেকে শিখার মা ঋণ নিয়েছে মেয়ের চিকিৎসার জন্য। ডাক্তার নার্সদের সেবায় শিখা সেরে উঠে আবার সেই বস্তিতেই ফিরে আসে।
শিখার মা পানির বোতল নিয়ে এ বেলা ও বেলা স্টেশনে ঘুরে বেড়ায়। মায়ের কষ্ট দেখে শিখার মনের ভেতর নানা চিন্তাভাবনা চলতে থাকে। এতোদিনেও আয়নায় কখনো নিজেকে দেখেনি। শিখা মায়ের কাছে আয়না চেয়েও পায়নি কারণ শিখার মা চায়নি তার মেয়ে নিজের এই ভয়ংকর চেহারা দেখে কষ্ট পাক। শিখা ভাবতো হয়তো তার চোখ নষ্ট হয়েছে তাই মা এক পাশ ঢেকে রাখতে বলে।
শিখার মা ঘরে ফেরার পরে মায়ের কাছে আয়নার জন্য বায়না করে।শিখাকে অনেক না করার পরেও যখন খুব জোড়াজুড়ি করতে থাকে তখন পাশের ঘর থেকে একটা আয়না শিখার হাতে দেবার পর আয়না মুখের সামনে ধরার পর শিখা এতো জোরে চিৎকার করে যে আলোও ভয় পেয়ে কেঁদে দেয়। শিখার আর্তচিৎকার, মায়ের আহাজারিতে বস্তির ছোট্ট ঘরটা যেনো দু:খের সাগরে পরিণত হয়।
শিখার মা মেয়েকে বলে এভাবে ভেঙে পরলে তোর মেয়ে আলোকে বড়ো করবি কিভাবে? মায়েদের কান্না লুকাতে হয় সন্তানকে ভালো রাখতে। আজ থেকে আর কান্না নয়। তোর সামনে অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে তাই ভেঙে পড়া যাবে না। আর তোর এই মা তো আছে তোর সাথে। মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে আদরের হাত মাথায় বুলায়।

শিখার মায়ের অদম্য মনোবলে শিখা নিজের দুর্বলতাকে নিয়ে আর আগের মতো নিজেকে অসহায় মনে করেনা। শিখা মেয়েকে একজন প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। এসিডদগ্ধ মুখ কাউকে না দেখিয়ে কিভাবে উপার্জন করা যায় সেটা ভাবতে থাকে। শিখার মায়ের আয়ে আর এখন সংসার চলতে চায়না।
বস্তিতে বিভিন্ন এনজিও কাজ করে। সেই এনজিওদের মধ্যে একটা এনজিও এখানে স্কুল খোলার কথা বলে। আর এ কথা শুনে শিখা ওর মাকে বলে যে সে বস্তির ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা করাতে চায়।
সামান্য অর্থের বিনিময়ে শিখা ছোটো ছোটো শিশুদের পড়াশোনার দায়িত্ব নেয়। এভাবেই ৩/৪ বছর পার হয়। দেখতে দেখতে আলোও বড়ো হতে থাকে। শিখাকে বস্তির সবাই খুব পছন্দ করে।শিখাও সবার সাথে খুব আপন করে মিশে। বস্তির কেউ শিখার সম্পূর্ণ মুখ না দেখলেও ভালোবাসার কমতি নাই। শিখাও ওদের অকৃত্রিম ভালোবাসায় নিজেকে উজার করে দেয়।
কিন্তু শিখার এই সুখ কপালে সহ্য হয়নি। তাইতো স্টেশন থেকে ফেরার পথে শিখার মা সড়ক দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই মারা যায়। এ যেনো অমানিশার ঘোর আঁধারে ডুবে যাওয়া। একদিকে এসিডদগ্ধ মুখ নিয়ে বাইরে যাবার উপায় নাই আরেকদিকে মায়ের চিরপ্রস্থান।
শিখা আঁচল দিয়ে মুখ ঢেকে কান্না করলেও আলো বুঝে তার মায়ের কষ্ট। মাকে হারিয়ে শিখা নিজেকে অসহায় ভাবতে থাকে। কিন্তু পরক্ষণেই মায়ের কথা মনে পড়ে যায়, মা বলেছিলো ভেঙে পড়লে চলবে না। তোকে লড়াই করেই টিকে থাকতে হবে দেখিয়ে দিতে হবে একজন মা সব পারে। মায়ের মন দুর্বল করতে নেই মা শক্ত হলে সন্তান হয়। তুই আমাকে দেখ তোর আমার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে তাই বলে আমি কি শেষ হয়ে গেছি? হ্যাঁ হয়তো আমি তোকে ভালো খেতে দেইনা ভালো জায়গায় রাখতে পারিনি কিন্তু চলতে তো পারছি। তোকেও ঢাল হতে হবে তোর সন্তাকে রক্ষা করতে হবে।
মায়ের সব কথা বারবার মনে পড়ছে। আলোকে বুকে জড়িয়ে ধরে শিখার কান্নায় বস্তির ছোট্ট ঘর কম্পিত হয়। শিখার সামনের পথ অনেক কঠিন। সে জানে না কিভাবে আলোকে বড়ো করবে? বস্তির শিশুদের স্কুলে পড়ানোর পাশাপাশি শিখা একটা বাসায় কাজ করে।
এভাবেই কয়েক বছর পার হয়। আলোও বড়ো হয়েছে সে এখন প্রাইমারিতে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে।আলো অত্যন্ত মেধাবী তাই স্কুলের শিক্ষকগণ খুব স্নেহ করে। আলো একটু সময়ের জন্যেও মায়ের এসিডদগ্ধ মুখ দেখতে পারেনি।শিখা খুব সতর্ক থাকে যাতে আলো কোনোভাবে তার চেহারা দেখতে না পারে। শিখার জীবনে একটাই লক্ষ্য মেয়েকে সমাজের এমন একটা স্থানে পৌঁছে দেয়া যাতে মাথা উঁচু করে চলতে পারে।
কারোর কারোর জীবন যেনো শুধু লড়াই করে বেঁচে থাকে। তেমনি শিখার জীবনেও শুরু হলো আরেকটা যুদ্ধ। বস্তির স্কুলের কাজটা চলে গেছে শুধু শিখা তার চেহারা দেখায়নি বলে। শিখা শুধু মেয়ের কথা ভেবে তাদের জানায়নি যে সে এসিডদগ্ধ দেখতে ভয়ংকর। তাইতো কাজটা ছেড়ে দিতে হলো।
কথায় আছে রাখে আল্লাহ মারে কে? তাইতো এই অসময়ে একটা বৃদ্ধাশ্রমে কাজের বিজ্ঞপ্তি দেখে সেখানে ছুটে যায়। শুরু হয় তার জীবনের নতুন আরেক অধ্যায়। আর এই অধ্যায়ের শুরুটা ভালো হলেও শেষ অধ্যায়ে কি আছে তা জানতে আগামীকালের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

বৃদ্ধাশ্রমে বাবা মায়ের বয়সীদের সেবা করে তাদের সাথে গল্প করে শিখার দিনগুলো ভালোই কাটছিলো। বৃদ্ধাশ্রমের ভেতরে ছোট্ট একটা ঘরে শিখা আর আলোর বসবাস। ধীরে ধীরে শিখার মিষ্টি মধুর ব্যবহারে আশ্রমের সবার কাছে প্রিয় হয়ে ওঠে।
আলোকে স্কুলে পাঠানো থেকে শুরু করে ঘরের কাজ আশ্রমের কাজ করে শিখা যেনো একটুও সময় পায়না। তবে যখনই ক্লান্ত হয়ে যায় তখনই মায়ের কথাগুলো মনে করে নিজেকে শক্ত করে। আলোর আড়ালে মাঝে মাঝে নিজেকে আয়নায় দেখে কান্নায় ভেঙে পরে। আগে রাকেশকে নিয়ে ভাবতো এখন আর রাকেশের কথা মনে করতে চায় না। কারোর কাছে ভালোবাসার গল্প শুনলে শিখার ভেতরে যেনো যন্ত্রণা হয়। কিসের ভালোবাসা কিসের প্রেম যে কি-না অন্যায় ভাবে ছেড়ে যায় তাকে কি ভালোবাসা বলে?
শিখার একটাই লক্ষ্য আলোকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। আলোও মায়ের কথার বাইরে যায় না। সারাদিন খাটাখাটুনি করতে করতে শিখার সন্ধ্যা হলেই ঘুমিয়ে পড়তে ইচ্ছা করে কিন্তু আশ্রমের জন্য সেই রাত ১০/ ১১ টা বেজে যায়।
দেখতে দেখতে এভাবেই ১০ বছর পার হয়ে গেছে।আলো এখন স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে কলেজে পা দিয়েছে। শিখার মনেও শংকা দানা বেঁধেছে। যদি আলোও তার মতো ভুল করে। না না তার মেয়ের জীবন এমন বিভীষিকাময় হতে পারেনা। অবশ্য আলোকে খুব সাবধানে চলতে বলে।
আশ্রমের কেয়ারটেকার কাকাকে বলা আছে যে আলোর প্রতি খেয়াল রাখতে। কেয়ারটেকার নগেন শিখাকে মেয়ের মতো দেখে তাই আলোকে সেই ছোটো বেলা থেকে আদর করে।এখন আশ্রমের বাবা মায়ের সংখ্যা বেড়েই চলছে আর তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মানুষের আনাগোনা। অবশ্য আশ্রমে কাজের লোকের সংখ্যাও বেড়েছে। তবে শিখা পুরোনো লোক তাই সবাই শিখাকে কদর করে।
সেদিন আশ্রম থেকে ঘরে ফিরতে ফিরতে শিখার রাত ১১টা বেজে যায়। ঘরে ফিরে দরজা খোলা দেখেই শিখার বুকের মধ্যে মোচড় দিয়ে ওঠে। ঘরে ঢুকে আলোকে কোথাও না পেয়ে দিশেহারা অবস্থায় নগেনকে ডাক দেয়। শিখার আর এই অবস্থা দেখে নগেনও কান্নায় ভেঙে পড়ে। শিখা পুরো আশ্রম খুঁজেও কোত্থাও আলোকে পাওয়া যায়না।
গেটের দারোয়ান বলে যে আলো দিদি ভাই তো কলেজ থেকে ফেরার পর গেটের বাইরে বের হয়নি। দেখেন ভেতরে কোথাও বসে হয়তো পড়াশোনা করছে। আচ্ছা আলো কি ছাদে আছে? এবার শিখার মনে একটু সাহস পায় আবার মেয়ের উপর রাগও হয়। শিখা ছাদে যেতে চাইলে নগেন বলে আরে ও ছাদে থাকলে তো আমার চোখে পড়তো। আলো দিদি ভাই মনে হয় কোনো বান্ধবীর বাড়িতে গেছে। এই কথা বলে শিখাকে ঘরে নিয়ে আসতে চাইলে শিখা দারোয়ানকে নিয়ে ছাদের দিকে পা বাড়ায়।
ছাদের উপর চিলেকোঠায় নগেন একাই থাকে। দিনের বেলা ছাদ খোলা থাকলেও রাতে ছাদে কেউ উঠে না। ছাদে উঠার সিড়িতে কাঠের দরজা দিয়ে আটকানো যা একটু ধাক্কা দিলেই খুলে যায়।
দরজা ধাক্কা দেয়ার সাথে সাথে নগেনের মুখটা যেন আঁধার কালো অমানিশা ভর করে। ছাদে উঠে আলো আলো বলে ডাকলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায় না। আলোকে না পেয়ে নামার সময় গোঙানির শব্দে শিখা থমকে দাঁড়ায়। দারোয়ানকে নিয়ে সামনে এগোতেই শব্দ বাড়তে থাকে। এখন স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে শব্দটা নগেনের ঘর থেকেই আসছে।
এদিকে নগেন কোথায় যেনো উধাও হয়ে যায়। দরজা ভেঙে হাত পা মুখ বাঁধা আলোর রক্তাক্ত দেহ দেখে শিখা ওখানেই লুটিয়ে পরে। কে বা কারা আলোকে অত্যাচার করে এভাবে ফেলে রেখেছে। দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অজ্ঞান আলোর শরীরে নর পিশাচের নখের আঁচড়ে ক্ষতবিক্ষত। শিখার জীবনে শুরু হয় আরেক লড়াই। আলো বাঁচলে জানা যাবে তার এই অবস্থার জন্য দায়ী কে আর মারা গেলে অজানা থেকে যাবে সেদিন রাতে বৃদ্ধাশ্রমের ভেতর কি ঘটেছিলো?

Leave a Comment