এই মেয়েটা কে? মেঘকে ও চিনে কিভাবে কিছুই তো জানা হলো না। থাক আগামীকাল যখন আসবে তখন জিজ্ঞেস করবো। তবে মেয়েটা অনেক ভালো আর ওর কাছে আমি চির কৃতজ্ঞ হয়ে রইলাম। রোদেলার চলে যাবার দিকে অপলক নয়নে তাকিয়ে আছে রোদ্দুর। বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে গেছে। ফ্রেস হয়ে রোদেলাকে ফোন দিয়ে খোঁজ নিলো ও ঠিকমতো পৌঁছেছে কি না।আজ রোদ্দুরের খুব ভালো লাগছে। রনিদের বাড়িতে কাটানো সময়ের কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ে।
হলে ফিরেই মায়ের কাছে ফোন দেই। মা আমি আগামীকাল তোমাকে নিয়ে একটু বের হবো তুমি রেডি হয়ে থেকো। দুপুরের খাবার খাবো একসাথে।মা কিছ জিজ্ঞেস করার আগেই বলি তুমি কিন্তু না করতে পারবে না। আমি যেখানে নিয়ে যাবো সেখানে তোমার খারাপ লাগবে না।মায়ের কাছে বাবার কথা কিছুই বললাম না।
সকালে ভার্সিটির ক্লাস শেষ করেই মায়ের কাছে চলে এসেছি।মাকে নিয়ে ৩টার দিকেই বের হলাম।
রিক্সা নিয়ে চলে এলাম রমনায়।বারবার জিজ্ঞেস করছে এখানে কেন এসেছি? আমি মাকে নিয়ে পার্কের ভেতরে প্রবেশ করেই দেখি বাবা আগে এসে অপেক্ষা করছে। আসলে বুঝতে পারছি না কিভাবে মাকে বাবার সামনে নিয়ে যাবো। আমি বরং বাবাকে একটা মেসেজ দেই যে আমি আপনার মেঘকে নিয়ে আপনার কাছেই আসছি। কিন্তু আমি আপনাদের সামনে থাকতে চাচ্ছি না। কিন্তু মা তো একা থাকবে না। ইস কি করি কিছুই তো বুঝতে পারছি না।
কিছুই বলবো না। বাবার কাছেই একটা বেঞ্চিতে মাকে নিয়ে বসলাম। একটু পরেই বাবা আমাদের দেখে এগিয়ে আসছেন তাই দেখে আমি মাকে বললাম আমি এক বোতল পানি কিনে আনি।তুমি এখানেই থাকো। আমি মাকে ওখানে রেখে একটু দূরে এসে বসলাম।
রোদ্দুর মেঘকে দেখে আবেগে আপ্লুত হয়ে গেছে। মেঘের কাছে এসে হাউমাউ করে কেঁদে দেয়। মেঘ কান্নার শব্দে রোদ্দুরের দিকে তাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে যায়। দুজন দুজনের দিকে অপলক নয়নে তাকিয়ে আছে। কারোর মুখে কোনো কথা নেই। মেঘ নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। এবার রোদ্দুর মেঘের হাত ধরে বলে মেঘ তুমি ভালো আছো? তোমাকে অনেক খুঁজেছি কিন্তু কোথাও তোমার সন্ধান পাইনি। কিন্তু আমার বিশ্বাস ছিলো যে তোমাকে না দেখে আমার মরণ হবে না।
রোদ্দুর একাই কথা বলছে আর মেঘ শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। কি বলবে মেঘ? এই দীর্ঘ আঠারো বছরে যে অনেক ঘটনা ঘটে গেছে। জীবনের এতো কষ্টের কথা কিভাবে রোদ্দুরকে বলবে।
নিরবে কেটে গেলো অনেকটা সময়। রোদ্দুরের অপেক্ষার পালা আজ শেষ হলো। তার আত্মবিশ্বাস ছিলো যে মেঘের দেখা সে পাবেই।আল্লাহ পাকের অশেষ রহমত তাদের আবার দেখা হলো। মেঘ যেনো একটা ঘোরের মাঝে আছে। কি বলবে কিছুই বুঝতে পারছে না। তার জীবনে কতো অঘটন ঘটে গেছে সে কি করে আজ স্বাভাবিক থাকবে। নিরবতা ভেঙে রোদ্দুরই জানতে চায় মেঘের এতোদিনের জমানো কথা।কিন্তু মেঘ চুপ হয়ে গেছে।রোদ্দুরও আবারও জিজ্ঞেস করে আচ্ছা রোদেলা তোমার কে হয়? আমি এই মেয়েটির কাছে চির কৃতজ্ঞ থাকলাম।আজ ওর জন্যেই আমি তোমাকে পেলাম।তোমাকে আমি আর এক মুহূর্তের জন্য হারাতে দিবো না।মেঘ তখন ক্ষীণস্বরে বলে রোদেলা আমাদের সন্তান।
আমাদের সন্তান মানে? ওর বাবা কে?
রোদেলার বাবার নাম রেদোয়ান শিহাব রোদ্দুর।
কি বললে ? আবার বলো কি বললে?রোদেলা আমার মেয়ে?
হ্যাঁ ও তোমার আমার ভালোবাসার প্রতীক।
এবার রোদ্দুরের চোখেমুখে এক অন্যরকম আভাস দেখা যাচ্ছে।আশে পাশে তাকিয়ে রোদেলাকে খুঁজতে থাকে।
রোদেলা মা বাবাকে রেখে একটু দূরে গিয়ে বসে আছে। রোদ্দুর খুঁজতে খুঁজতে রোদেলার কাছে এসেই মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে।আবেগে আপ্লুত বাবা মেয়ে। দুজনের চোখেই অশ্রু ঝরছে।এই অশ্রু কষ্টের নয় এ অশ্রু সুখের। মেয়েকে আদরে আহলাদে ভরিয়ে দেয়।রোদ্দুরের আজ সুখের শেষ নাই।স্ত্রী মেয়েকে পেয়ে আজ পরিপূর্ণ।
এদিকে মেঘ একমনে আকাশ পানে তাকিয়ে আছে। রোদেলা মাকে জড়িয়ে ধরে কান্না করে। রোদ্দুর বলে চলো আর দূরে নয়।আজই আমি তোমাদের নিয়ে যাবো। মেঘ ছোট্ট করে বলে অনেক দেরী হয়ে গেছে। এখন আর সম্ভব নয়।
সম্ভব নয় কেন? আমি আমার স্ত্রী সন্তানকে নিয়ে একসাথে এতে কে বাঁধা দিবে? আমার মেয়েকে আর হলে থাকতে দিবো না।
তোমার মেয়েকে নিয়ে যাও কিন্তু আমি যে আজ অনেক দূরে। আমি কিছুতেই আর তোমার কাছে ফিরতে পারবো না।আমার যে আর ফেরার উপায় নাই।
মা তুমি এমন করে বলছো কেন? বাবাকে সব খুলে বলো। বাবা সব বুঝবে।আমি একসাথে মা বাবার আদর পাইনি ।আজ আল্লাহ পাক আমার বাবাকে আমাদের কাছে দিয়েছে। আমি তোমাদের সাথে থাকতে চাই।
রোদেলা তুমি সব জেনেও কি করে বলছো ? আমার জীবন তো আগের মতো নাই। রোদ্দুর এতোক্ষণ দুজনের কথা শুনতেছিলো। আচ্ছা মেঘ তোমার জীবনে যা ঘটার ঘটে গেছে সেটা শুনতে চাইনা।আমি শুধু তোমাকে আমার করে চাই।
না রোদ্দুর তা হয়না। আমি তোমাকে ঠকাতে পারব না।আমি যেমন আছি তেমনই থাকবো।
রোদেলা চলো আমাকে বাসায় নিয়ে চলো। ভালো থেকো রোদ্দুর,আমাকে ক্ষমা করে দিও। এটা বলেই মেঘ উঠে দাঁড়াতেই রোদ্দুর মেঘের হাত ধরে বলে প্লিজ তুমি আমাকে আর একা করে দিও না। আমি তোমাকে অনেক খোঁজার পরে আজ পেলাম আর হারাতে চাইনা। আচ্ছা আমিই আসছি তোমার সাথে ।
না রোদ্দুর তা হয়না। আমার জীবন এখন সম্পূর্ণ পালটে গেছে ।
দুজনের কথার মাঝে রোদেলা বলে,মা আমি বাবাকে ফিরে পেয়েছি তাই আমরা এখন থেকে একসাথে থাকবো।আর মা শোনো আমি বাবাকে সব খুলে বলবো। সব শুনে বাবা যদি দূরে চলে যায় তাহলে তুমি যা বলবে তাই হবে।
রোদ্দুর গাড়িতে করে ওদের পৌঁছে দিতে চায় কিন্তু মেঘ রাজী হয়না। মেয়ের হাত ধরে মেঘ রোদ্দুরের দিকে করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। ভালো থেকো বলেই রিক্সায় চড়ে রওনা দেয়।মেয়েকে আদর করে বিদায় জানিয়ে রোদ্দুরও ওদের চলে যাওয়ার দিকে অসহায়ের মতো তাকিয়ে থাকে।
রাতে ফোনে বাবা আর মেয়ের মধ্যে অনেক কথা হয়। কিন্তু মেঘ বাইরে থেকে এসেই রুমে শুয়ে আছে। চোখের জলে বুক ভেসে যাচ্ছে। যে রোদ্দুরকে কাছে পাবার জন্য ব্যকুল ছিলো আর আজ কিনা তার সাথে দুরত্ব তৈরি করতে চাইছে। মেঘের আজ বারবার পুরোনো স্মৃতি মনে পড়ছে । যদিও শাহেদের সাথে মেঘের ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে কিন্তু তারপরও রোদ্দুরের কাছে ফিরতে মনটা কেমন যেনো করছে।রোদ্দুরকে আঁকড়ে ধরতে চাইতে গিয়ে এক অপরাধ বোধে নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছে। রোদ্দুর অনেক বার ফোনে মেঘকে চেয়েছে কিন্তু মেঘই নিজেকে গুটিয়ে রাখছে। সারারাত চুপচাপ কেঁদে কেঁদে পার করেছে।
এদিকে রোদ্দুর বাড়ি ফিরে কারোর সাথে কথা না বলেই নিজের ঘরে গিয়ে চুপচাপ বসে আছে। মেয়ের সাথে অনেক কথা হয় কিন্তু মেঘের সাথে একটিবারও কথা হয়নি। রোদ্দুরের মন উতলা হয়ে গেছে। নিজের ভালোবাসার মানুষকে কাছে পেয়েও দূরে রয়েছে। আগামীকাল সকালেই রোদেলাকে নিয়ে ঘুরতে যাবে সেটা ফোনে কনফার্ম করেছে। মেয়েকে নিয়ে কোথায় যাবে?মেঘ আর রোদেলাকে নিয়ে কোথায় থাকবে সেটা চিন্তা করতে করতে শেষ রাতের দিকে ঘুমিয়ে পড়ে।
পরের দিন সকালেই রোদেলা বাবার সাথে বেড়িয়ে পড়ে।বাবা মেয়ে মনের আনন্দে ঘুরে বেড়ায়। আর এর ফাঁকে রোদেলা তার বাবার কাছে মায়ের জীবনের করুণতম ঘটনা বলতে গিয়ে অনেকবার কেঁদেছে।রোদেলা মায়ের কাছে শোনা সব কথা রোদ্দুরকে বলে। আর মাঝখানে বিভীষিকাময় ঘটনাও বলে। আর বর্তমানে যে মেঘের পাশে কেউ নেই সেটাও বলে। রোদেলার মুখ থেকে সব শুনে রোদ্দুর স্তব্ধ হয়ে যায়।মেঘের জীবনে এতো যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়েছে? যে মেঘ অভাব কি তা দেখেনি আজ সে পরের আশ্রয়ে।রোদ্দুরও মেয়ের কাছে তার জীবনের সব খুলে বলে।
দীর্ঘ আঠারো বছরের কথা কি একদিনে বলা যায়?তাইতো রোদ্দুর দুই একদিনের মধ্যে ওদেরকে নিয়ে থাকার কথা ভাবে।রোদেলা বাবার কাছে কিছু সময় চেয়ে নেয়।মেয়ে বাবাকে নিশ্চয়তা দেয় যে ,মাকে বাবার সাথে আবার এক করে দিবে।
রোদ্দুর মেয়েকে নামিয়ে দিয়ে আসার সময় কান্না করলেও মেয়েও কান্না করে আর তাই নিজেকে সামলে নিয়ে রোদ্দুর মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলে আর কান্নাকাটি নয়। এখন থেকে আমরা প্রানখুলে হাসবো একসাথে বাঁচবো।
বাসায় ফিরে রোদেলা দেখে মেঘ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে অপলক নয়নে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে।মন মনে কি যেনো ভেবেই চলেছে। রোদেলা কতোক্ষণ ধরে পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে তা টেরও পায়নি। রোদেলা পিছন থেকে মাকে জড়িয়ে ধরে বলে মা আমি কখন এসেছি আর তুমি দেখলেই না।
কখন এলি? শোন আগামীকাল আলো আর আশাকে দেখতে যাবো। তুই যাবি?
মা কাল আমার ক্লাস আছে ।তুমি যাও আমি বিকেলে গিয়ে দেখে আসবো।মা শোনো বাবা তোমাকে আগের মতোই ভালোবাসে।তোমাকে আর কষ্ট করতে দিবো না ।আমি বাবাকে কথা দিয়ে এসেছি তুমি কোনো অযুহাত দিবে না।আমি আমার বাবা মায়ের মিলন চাই তাদের সুখ চাই।
মেয়ের কথায় মেঘ কিছুই বলতে পারে না।নিরবে শুধু শুনে যায়।রোদেলাকে আজ অনেক বড়ো মনে হচ্ছে।একদিকে রোদ্দুরের হাতছানি আরেকদিকে সমাজ সন্তান? আর কিছু মাথায় আসছে না।এমন সময় মেঘের মোবাইলে রিং বেজে ওঠে। ফোন ধরতেই শাহেদ বলে পরশু আমি আগের জায়গায় ফিরে যাচ্ছি মানে দেশের বাইরে চলে যাচ্ছি। আমি ওখানেই স্থায়ীভাবে থাকবো।আলো আর আশাকে রেখে যাচ্ছি । এ কথা বলেই ফোন রেখে দেয়। মেঘের চোখেমুখে দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্টই বুঝা যাচ্ছে। মেয়ে দুটো হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করছে কিভাবে এতো খরচ মেটাবো?পিছন থেকে রোদেলা মাকে জড়িয়ে ধরে বলে ,মা জানো বাবা তোমার জন্য সারাজীবন অপেক্ষা করে ছিলো। এখন তোমরা আবার এক হতে পারো না? মেঘের মুখে কোনো কথা নেই। জানালার বাইরের দিকে অপলক নয়নে তাকিয়ে আছে। রোদেলা আবারো বলে মা প্লিজ চলো বাবার সাথে থাকি। আচ্ছা তুমি আরও একটু সময় নাও।






