ফজরের নামাজ পড়ে মেঘ জায়নামাজে বসে কাঁদতে ছিলো। রোদেলাকে কিছু না বলেই ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথে ঘর থেকে বেরিয়ে পরে।আলো -আশার কাছে এসেছে। ওদের সাথে কথা বলে মেঘ জানতে পারে যে, শাহেদ যে আজ বাইরে চলে যাচ্ছে সেটা মেয়েরা জানেনা। মেয়েরা কষ্ট পাবে বলে মেঘও কিছু বলেনা। মেয়েদের সাথে কিছুক্ষণ থেকে বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।
মেঘ রাস্তায় অন্যমনষ্কভাবে হাঁটতে ছিলো ঠিক তখন একটা গাড়ির ধাক্কায় রাস্তায় পরে যায়। গাড়ির চালক দ্রুত নেমে আসে আর দেখে মেঘের কপাল ফেটে রক্ত বেরুচ্ছে আর অজ্ঞান হয়ে আছে। এদিকে মেঘের কাছে অনেক লোক জড়ো হয়েছে।গাড়ির চালক পথচারীদের সহায়তায় মেঘকে গাড়িতে তুলে হাসপাতালে নিয়ে যায়। হাসপাতালের ইমারজেন্সি ওয়ার্ডে মেঘের প্রাথমিক চিকিৎসা চলছে ইতোমধ্যে গাড়ির চালক তার মালিককে এই দুর্ঘটনার কথা জানায়। প্রায় ঘণ্টাখানেক চলে গেছে কিন্তু চালকের একবারের জন্যেও মনে হয়নি উনার পরিচয় জানা দরকার। মালিককে বলে তাড়াতাড়ি হাসপাতালে চলে আসতে। মেঘের ব্যাগে ফোন ছিলো যা ভেঙে গেছে আর ব্যাগের ভেতর তেমন কিছু পাওয়া যায়নি।
গাড়ির মালিক হাসপাতালে এসে রোগীর খোঁজখবর করেন। গাড়ি চালক নাইম মালিককে দেখে দৌড়ে কাছে গিয়ে কান্না করে দেয়। স্যার উনার যদি খারাপ কিছু হয়ে যায় তাহলে আমার তো জেল হয়ে যাবে আর উনার পরিবারের সদস্যদের কতো বড়ো ক্ষতি হবে। স্যার আপনি ঐ মেডামকে বাঁচান। নাইম তুমি অস্থির হইও না আমি ডাক্তারদের সাথে কথা বলে দেখছি। এমন সময় একজন ডাক্তার এসে বলেন রোগীর ভয়ের কিছু নয়। উনি এখন শঙ্কামুক্ত,এইমাত্র জ্ঞান ফিরেছে কিছুক্ষণের মধ্যেই উনাকে বেডে দেয়া হবে।উনি কথা বললে উনার পরিবারকে খুঁজে বের করার দায়িত্ব কিন্তু আপনাদের।
নাইম অপরাধীর মতো ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এমন সময় নার্স এসে বললো রোগীর জ্ঞান ফিরেছে ।উনার পরিবারের একজন ভেতরে আসুন। নাইমের মালিক বলেন আমি আসতে পারি? আসলে এখনো উনার পরিবারের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। উনার সাথে কথা বলে সব জানা যাবে।এমন সময় রোদ্দুরের ফোন বেজে উঠে। হ্যাঁ নাইম রোদ্দুরের গাড়ির চালক। রোদেলা ফোন করে বলে বাবা সকাল থেকে মাকে বাসায় পাচ্ছিনা। আমাকে কিছু না বলে কোথাও যায়না।আমি আশাকে ফোন করে জানলাম মা খুব সকালে ওদের ওখানে গিয়েছিলো আর একটু পরেই চলে এসেছে কিন্তু এখন তো প্রায় ১২টা বাজে তবুও মাকে পাচ্ছি না। মায়ের ফোনটাও সুইচ অফ বলছে।
রোদ্দুর মেয়েকে বলে মা মণি আমি হাসপাতালে আসছি।একটু পরে কথা বলছি আর চিন্তা করোনা তোমার মা হয়তো কোথাও গেছে। মেঘের পুরো মাথা সাদা ব্যান্ডিজে মোড়ানো থাকলেও মুখের দিকে তাকিয়েই রোদ্দুর চিনে ফেলে।
রোদ্দুর মেঘের হাত ধরে জিজ্ঞেস করে তুমি কোথায় এসেছিলে? আল্লাহর অশেষ রহমত তোমার তেমন কিছু হয়নি। রোদ্দুরের দিকে একবার তাকিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলে।মেঘের দুচোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। রোদ্দুর মেঘের হাত ধরে অপলক নয়নে তাকিয়ে আছে।হাত দিয়ে মেঘের চোখের জল মুছিয়ে দেয়। মেঘ তুমি ঠিক আছো ২/১ দিন পরে বাসায় ফিরতে পারবে। প্লিজ আর কেঁদো না। অনেক সাধনা আর অপেক্ষার পরে তোমায় পেয়েছি তাই আর কষ্ট পেতে দিবো না। মেঘ একটা কথাও বলছে না। রোদ্দুরের মোবাইলে এমন সময় রোদেলার ফোন আসে। মা মণি আমি তোমার মায়ের কাছে তুমি দ্রুত আল-রাজি হাসপাতালে চলে আসো।
ওপাশ থেকে রোদেলার কান্নার আওয়াজ শুনে রোদ্দুর বলে তুমি কাঁদছ কেন? তোমার মায়ের ছোট্ট একটা এক্সিডেন্ট হয়েছে আর এখন সম্পূর্ণ শঙ্কামুক্ত।ঠিক আছে বাবা আমি এক্ষুণি আসছি। রোদ্দুর বাইরে এসে নাইমকে চলে যেতে বলে।
নাইম বলে স্যার ঐ মেডামের তো বাড়ির কেউ এলো না। উনার বাসা কোথায় জানলে আমি গিয়ে খবর দিতাম।
তুমি নিশ্চিন্তে বাড়ি চলে যাও। আজ তোমার ছুটি। আমি নিজেই ড্রাইভ করে বাড়ি ফিরবো। স্যার আপনি কি পরে যাবেন? হ্যাঁ আমি আরও কিছুক্ষণ আছি। ঠিক আছে স্যার আমি আসি।
রোদেলা হাসপাতালে এসে মাকে বেডে ব্যান্ডিজ বাঁধা অবস্থায় দেখে কেঁদে ফেলে। এতোক্ষণ পরে মেঘ কথা বলে।মা আমি পরে গিয়ে একটু ব্যথা পেয়েছি তুমি কান্না করছো কেন?মেয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেই চলেছে। এমন সময় রোদ্দুর মেঘের জন্য কিছু খাবার আর ঔষধ নিয়ে কেবিনে ঢুকে।
বাবার কাছ থেকে রোদেলা জেনে ফেলে কিভাবে তার মা হাসপাতালে। রোদ্দুর মেয়েকে মায়ের কাছে রেখে বাইরে খাবার আনতে যায়। রোদেলা মাকে সুপ খাইয়ে দিয়ে বাবাকে বলে তুমি এখন খাও। না মা এখানে খাবো না চলো আমরা হাসপাতালের কেন্টিনে গিয়ে খাই।
সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হয়ে গেছে তবুও রোদ্দুর বাড়ি ফেরার নাম করেনা। তখন রোদেলা বাবাকে বলে বাবা তুমি এখন বাসায় যাও আমি মায়ের কাছে আছি। রোদ্দুর যেতে চায় না কিন্তু মেয়ের জোরাজুরিতে রাতে বাসায় ফিরে আসে।
হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে মা মেয়ে বাসায় চলে আসে। রোদ্দুর মেঘকে নিজের কাছে নেবার জন্য অনেক অনুরোধ করে কিন্তু মেঘ সাড়া দেয় না। মেঘের মনে এখনো রোদ্দুরের প্রতি অগাধ ভালোবাসা কিন্তু মাঝে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনার জন্য অনুশোচনায় ভুগছে। এদিকে বাপ বেটি মিলে পরিকল্পনা করে কিভাবে তারা আবার একই বৃত্তে থাকতে পারবে। রোদ্দুরের বাড়িতে কাউকে কিছু জানায় না। কারণ মেঘের বাবা যে আচরণ রোদ্দুরের সাথে করেছিলো তার জন্য তারা মেঘকে মেনে নিতে পারবে না। তাই মেয়েই হচ্ছে তার সুখ দুঃখের ভাগীদার। রোদেলা বাবাকে কথা দেয় যে, যে কোনো মূল্যে সে তার মাকে বাবার সাথে পুনরায় মিল করিয়ে দিবে। এটাও বলে যে, বাবা মা ছেলে মেয়ের বিয়ে দেয় আর এখন আমি মেয়ে হয়ে তোমাদের আবার বিয়ে দিবো। মেয়ের কথায় রোদ্দুর হাসতে থাকে।
এদিকে রোদ্দুর নতুন একটা ফ্ল্যাট ভাড়া করে। মেয়েকে নিয়ে ফ্ল্যাট সাজিয়ে গুছিয়ে রাখে। মেঘের শরীর এখন পুরোপুরি সুস্থ।রোদেলা মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে বলে মা আমি একটা জিনিস চাইবো তুমি দিবে তো? আমার কাছে থাকলে অবশ্যই দিবো। তোমার কাছে আছে বলেই তো চাইছি। আচ্ছা বলো কি চাই তোমার? মা আমি চাই তুমি আর বাবা আবার এক হয়ে যাও। রোদেলা আমি তো বলেছি সেটা সম্ভব নয়। তুমি শুধু একা নও আলো-আশা আছে। কিছুতেই এটা সম্ভব নয়। মা আমি ওদের সাথে কথা বলেছি ওরা শুনে খুব খুশি হয়েছে। শাহেদ আংকেল ওদেরকে না জানিয়ে বিদেশ চলে গেছে একটা ফোন পর্যন্ত করেনি।
ওরা আমার বাবাকে বাবা বলবে। আর আমি বাবার কাছে ওদের কথা বলেছি।বাবা তো ওদের কথা শুনে বললো যে, ওদেরকে হোস্টেলে থাকতে হবেনা আমরা সবাই একসাথে থাকবো। মা প্লিজ আর না করো না। মেঘ কিছুই বলেনা জানালায় দাঁড়িয়ে আকাশ পানে অপলক নয়নে আনমনে কি যেনো ভেবে চলেছে।
এর মাঝে রোদ্দুরের সাথে মেঘের দেখা না হলেও ফোনে নিয়মিত কথা হয়। ধীরে ধীরে মেঘও বুজ্ঝে যে, নিজের জন্য না হলেও সন্তানদের জন্যে রোদ্দুরকে প্রয়োজন। আর রোদ্দুরের প্রতি অগাধ আস্থা আর অফুরান ভালোবাসা অবিচল। আঠারো বছর বয়সে রোদ্দুরের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলো। মাঝে আঠারো বছর কেটে গেছে। এখন ছত্রিশ বছর বয়সে আবার বিয়ে করবে এটা ভাবতেই মেঘ দুই পা পিছিয়ে যায় আবার রোদ্দুরের ভালোবাসার টানে এক পা এগোয়।
শুক্রবার সাধারণত রোদ্দুর বাসার বাইরে যায় না। কিন্তু আজ সকাল বেলায় মাকে সালাম করে বাইরে বেরুতে গেলে রোদ্দুরের মা বলে কি রে এই সাত সকালে কই যাবি? মা আমার অফিসিয়াল কাজে দুই দিন ঢাকার বাইরে থাকবো। এই প্রথম মায়ের কাছে মিথ্যে কথা বলে বের হচ্ছি। মেঘকে নিয়ে আলাদা থাকি পরে সময় সুযোগ মতো সবাইকে জানাবো।
আলো-আশাকে রোদেলা হোস্টেল থেকে বাবার দেয়া নতুন ফ্ল্যাটে নিয়ে এসেছে। তিন বোন মিলে বাবা মায়ের রুম সুন্দর করে সাজিয়েছে । রোদ্দুর কাজি নিয়ে এসেছে আর সাথে খাবারের প্যাকেট আর কিছু ফুল আছে। রোদেলাকে সাথে নিয়ে আগেই মেঘের জন্য নতুন শাড়ি কিনেছে। রোদেলা আলো-আশাকে বাসায় রেখে মাকে আনতে গেছে। মেঘকে নীল রঙের শাড়িতে বেশ লাগছে। ফ্ল্যাটের দরজায় সুন্দর করে লেখা “মেঘালয়”। মেঘ ঘরে প্রবেশ করতে গিয়ে রোদ্দুরকে নতুন পাঞ্জাবী পরা দেখে বিস্মিত। মনে হচ্ছে এ যেনো সেই দিন ফিরে পেলো। তিন মেয়ে তাদের মাকে বাবার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করে দিলো আর এতে সাক্ষী হলো মেঘের বাবার গাড়ির ড্রাইভার আংকেল আর রোদ্দুরের গাড়ির চালক নাইম।
মেঘ লজ্জায় মুখ নিচু করে বসে আছে। রোদেলার আজ খুব খুশির দিন। জন্মের পর আজই প্রথম বাবা মায়ের সাথে এক বাসায় থাকবে। ওরা তিন বোনই আজ মহা খুশি। সবাইকে বিদায় দিয়ে রোদ্দুর মেয়েদের নিয়ে খেতে বসে মেঘকে ডেকে নেয়। মেয়েদের সামনে মেঘ লজ্জা পেলেও রোদ্দুর খুব স্বাভাবিক আছে। ওরা তিন বোন এক রুমে ঘুমোতে গেলো। মেঘ ডাইনিং রুমেই বসে আছে। এবার রোদ্দুর মেঘের কাছে এসে দাঁড়ায়। এই যে মেডাম এখানেই থাকবে? তোমার বেডরুমে গিয়ে বসো আর দেখো আমার তিন মেয়ে কি করেছে? মেঘ কিছু না বলে বেডরুমের দিকে পা বাড়ায়। বেডরুমে ঢুকতেই বৃষ্টির মতো নানা রঙের ফুলের পাপড়িতে আচ্ছাদিত হয়।
মেঘ এসবে অভিভূত আহ্লাদিত।বেডরুমের সাথে যে বাড়ান্দা সেখানে দাঁড়ালে পুরো আকাশ দেখা যায়। আজ বা কাল পূর্ণিমা তাই চাঁদের আলোতে চারিদিক প্লাবিত।রোদ্দুর রুমের বাইরে থেকে বলে আমি কি আসতে পারি? মেঘ পিছন ফিরে বলে তোমার ঘর তুমি আমাকে জিজ্ঞেস করছো কেন? ঘুরে ঢোকার সময় নিশ্চয়ই নাম দেখেছো। এ ফ্ল্যাটের মালিক তুমি । “ মেঘালয়” মানে মেঘের আলয় অর্থাৎ মেঘের বাড়ি।
রোদ্দুর মেঘের খুব কাছে এসে জিজ্ঞেস করে এই বাড়ি তোমার পছন্দ হয়েছে? আমাদের জীবনের শুরুটা হয়েছিলো রনির বাড়িতে আর মাঝপথে তা থেমেও গিয়েছিলো।তাই আজ যখন তোমাকে আবার নিজের করে পেলাম তাই তোমার মনের মতো করে সাজানোর চেষ্টা করেছি।রোদ্দুরের কথাগুলো যেনো মেঘের কান পর্যন্ত পৌঁছায়নি। মেঘ আনমনে জানালার ফাঁকে চাঁদের দিকে তাকিয়ে আছে। মেঘ কোনো কথা না বলায় রোদ্দুরও বুঝতে পারে যে মেঘ কি যেনো ভাবছে। রোদ্দুর মেঘের হাত ধরে বারান্দায় নিয়ে আস।
আলতো করে কাঁধে হাত রাখে।মেঘও রোদ্দুরের স্পর্শে উজ্জীবিত।মেঘ রোদ্দুরের আলিঙ্গনে নিবিড়ভাবে মিশে যায়। এদিকে চাঁদের আলোয় দুজনে মাখামাখি।রোদ্দুরের নিঃশ্বাসের উষ্ণতায় এক স্বর্গীয় অনুভূতিতে মেঘের তনুমন শিহরিত আহ্লাদিত। মেঘ রোদ্দুরের বুকে মুখ গুঁজে শুধু একটি কথাই বলে আমাকে ছেড়ে আর কোথাও যাবে না তো? রোদ্দুর মেঘের কপালে আলতো করে উষ্ঠদ্বয় ছুঁয়ে দিয়ে বলে আমি তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাবো না। তুমি যে আমার প্রাণের স্পন্দন ীবার রোদ্দুর মেঘকে নিয়ে ঘরে ফুল বিছানো খাটে এসে বসে। আজ সারারাত দুজনে আদরে সোহাগে মাখামাখি।রোদ্দুর মেঘকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরে বলে সব কিছুরই শুরু থেকে শেষ হয়। তোমার আমার জীবনের পথচলা না হয় শেষ থেকে শুরু হলো। হয়তো এখনো অনেকটা পথ আছে তাই আমাদের জীবনের চলা হোক ‘শেষ থেকে শুরু’।






