আজিজুন নাহার আঁখি

শেষ থেকে শুরু পর্ব-৮

আকাশ কালো মেঘে আচ্ছন্ন মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। মায়ের কাছে যাবে বলে রোদেলা রেডি হচ্ছিলো কিন্তু হটাৎ করে আবহাওয়ার এই অবস্থায় আর বের হতে পারলো না। ব্যাগ থেকে মোবাইল বের করে মাকে জানিয়ে দেই যে আজ আসব না। না জানালে মা চিন্তা করবে। মায়ের সাথে কথা বলে ফোন রাখতেই আপরিচিত নাম্বার থেকে কল আসে। সালাম দিতেই ওপাশ থেকে বলেন আমি রেদোয়ান সিহাব এই নাম্বার থেকে কেউ মেসেজ দিয়েছিলো। আপনি কি সেই? রোদেলা জন্মের পর এই প্রথম নিজের জন্মদাতা পিতার কণ্ঠস্বর শুনে পুরো স্তব্ধ হয়ে গেছে।আচ্ছা কেউ কি শুনছেন? আমি আপনার সাথে দেখা করতে চাই। বলুন কবে কোথায় আসবো?

রোদেলা যেনো কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলো। শেষের কথাটি শুনেই বলে হ্যাঁ আমিই আপনাকে চিঠি ও মেসেজ দিয়েছিলাম। স্যার আপনার সাথে আমার খুবই জরুরি কথা আছে । আর আপনি আমাকে আপনি বলবেন না ।আমি রোদেলা আপনার মেয়ের বয়সী হবো হয়তো। কথাটি বলতে গিয়ে রোদেলার কণ্ঠ ধরে আসছে কিন্তু নিজেকে সামলে নিতে পেরেছে। স্যার আগামীকাল আপনি যখন বলবেন তখনই আসতে পারবো।
স্যার আমি তো ভার্সিটির হলে থাকি তাই এদিকে কোথাও আসলে—-। স্যার রমনায় আসতে পারবেন?
ঠিক আছে বিকেল ৪টায় আমি রমনায় থাকবো।

রোদেলার চোখেমুখে খুশির বন্যা বয়ে যাচ্ছে। একটা রাত পেরুলেই বাবাকে দেখতে পারবো। বাবার গায়ের গন্ধ কেমন সেটা জানতে পারবো। বাবার সাথে মায়ের দেখা করাতে পারবো।ইচ্ছে করছে এখনই মাকে বলে দেই যে তোমার মেয়ে তার বাবাকে খুঁজে পেয়েছে। কিন্তু না এখন বলা ঠিক হবে না। বাবা যদি মাকে ভুলে যেয়ে থাকে তাহলে তো মা অনেক কষ্ট পাবে। আমি আর মাকে কষ্ট দিতে পারবো না। রোদেলা সারারাত অনেক কথা গুছিয়ে রাখতে গিয়ে বারবার এলোমেলো করছে। একবার ভাবছে প্রথম দেখাতেই বাবা বলে জড়িয়ে ধরবে আবার ভাবছে অন্য কথা।সারারাত কথার জাল বুনতে বুনতে কখন যে ঘুমিয়েছে সে টেরও পায়নি।

আচ্ছা মেয়েটা আমাকে কি বলবে? কে এই রোদেলা? এই নামে তো কাউকে মনে পড়ছে না। যাকগে আগামীকাল কথা বললেই বুঝা যাবে। মেয়েটার কথা শুনে ওকে ফ্রট মনে হয়নি। নিশ্চয়ই জরুরি কোনো দরকারে আমার সাথে কথা বলতে চায়।আকাশটা আজ মেঘলা আর আমার মনেও যে শুধু মেঘের বসবাস। আজ মেঘকে বেশি করে মনে পড়ছে। এতো বছর পার হয়ে গেছে অনেক খুঁজেও মেঘকে পাইনি তবুও মনে হচ্ছে একদিন না একদিন মেঘের দেখা পাবোই। এটা আমার আত্মবিশ্বাস। মেঘের সাথে আবার দেখা না করে কথা না বলে মরে যাবো? আল্লাহ পাক সহায় আমি মেঘের খোঁজ পাবো ইনশাল্লাহ।

সকালে অফিসে যাবার পথেই মোবাইলে এলার্ম দিয়ে রাখলাম। কাজে ব্যস্ত হয়ে গেলে হয়তো ভুলে যেতে পারি। কেনো যেনো এই রোদেলার সাথে দেখা করার জন্য আমার মনেও তাগিদ অনুভব করছি।ভার্সিটির ওদিকে যেতে ইচ্ছে করেনা। কতোদিন ক্যাম্পাসে যাইনা। গেলেই মনটা বিষাদে ভরে যায়। চারুকলায় তো মেঘের সাথে পরিচয় তারপর প্রেম বিয়ে। আর ভাগ্যের নির্মমতায় আমি মেঘকে হারিয়ে ফেললাম।আল্লাহর কাছে একটাই চাওয়া যদি কোনো পূণ্য করে থাকি তাহলে তার জন্যে হলেও মেঘকে আবার ফিরে পেতে চাই।

দুপুরে লাঞ্চ করেই রমনার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। আমি সময় মেইনটেইন করে চলি। আমার জন্য কেউ অপেক্ষা করে বিরক্ত হবে সেটা আমার পছন্দ নয়। তাই যাতে ঐ মেয়েটাকে দাঁড়িয়ে থাকতে না হয় সে জন্যেই আগে রওনা দেয়া। পৌনে চার টার দিকে আমি রমনায় পৌঁছে গেলাম। মূল ফটক পেরুতেই ছোটো ছোটো ছেলে মেয়েরা ফুল কেনার জন্যে ঘিরে ধরলো। আর ওদের মুখের হাসি ফোটাতে তিনজনের কাছে যতো ফুল ছিলো সব কিনলাম। এরপর সেই ফুল থেকে এক গুচ্ছ ফুল রেখে আর সব ফুল ওদেরকেই উপহার দিলাম। প্রথমে ওরা নিতে চায়নি কিন্তু যখন বুঝালাম আমার কেনা জিনিস আমি যে কাউকে উপহার হিসেবে দিতে পারি।তখন হাসিমুখে ফুলগুলো নিয়ে চলে গেলো।

হাতে এক গুচ্ছ ফুল নিয়ে বটমূলের কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। ঠিক এমন সময় ফোনে রিং বেজে উঠলো। হ্যালো বলতেই স্যার আপনি কোথায়? আমি বললাম বটমূলের কাছে। আমি সামনে তাকাতেই দেখি নীল রঙের থ্রি-পিস পরে অল্প বয়সী একটা মেয়ে আমার দিকে এগিয়ে আসছে। অবশ্য এখানে অনেকেই আসা যাওয়া করছে আসলে মেয়েটিকে তো আমি চিনি না তাই ধারণা করছি এই হবে হয়তো।আমার খুব কাছে এসেই মেয়েটি ফোন করতেই আমার হাতের ফোনে রিং বেজে উঠে। আর মেয়েটা আমার দিকে তাকিয়ে একেবারে স্ট্যাচু হয়ে যায়।আমার দিকে নিষ্পলক ভাবে তাকিয়ে আছে। আমিই এগিয়ে গিয়ে বললাম তুমি রোদেলা?

জি আমিই রোদেলা।আপনি আপনি রেদোয়ান সিহাব রোদ্দুর?
হ্যাঁ আমিই রোদ্দুর। তুমি ঠিক আছো তো? কেমন যেনো অন্যমনষ্ক দেখাচ্ছে।
জি না স্যার আমি ঠিক আছি। স্যার সরি আপনাকে অপেক্ষা করতে হলো? চলুন ওখানে গিয়ে বসি।
রোদেলা এতো কাছ থেকে নিজের বাবাকে দেখছে কথা বলছে এ যেনো সব স্বপ্ন।কিন্তু না আজই বাবার কাছে আমার পরিচয় বলা যাবে না। আগে বাবা মায়ের দেখা করাবো তারপর আমি বাবার আদর স্নেহ ভালোবাসায় পরিপূর্ণ হবো।বাবার সান্নিধ্যে রোদেলার মধ্যে স্বর্গীয় অনুভূতি খেলে যাচ্ছে।

রোদ্দুর একটা বেঞ্চিতে বসে রোদেলাকে পাশে বসতে বলে। রোদ্দুরও রোদেলাকে দেখে কেমন যেনো হয়ে গেলো।দুজনেই চুপ হয়ে আছে।এবার রোদ্দুর নিজ থেকে নিরবতা ভেঙে বলে,আচ্ছা আমার সাথে তোমার কি জরুরি কথা আছে?আমাকে চেন কিভাবে? আমি তো অনেক বছর দেশের বাইরে ছিলাম।বুঝতেই পারছিনা আমাকে তোমার কি দরকার।

স্যার আমি এতোগুলো প্রশ্নের জবাব একবারে কিভাবে দিব? এক এক করে দিচ্ছি।আমি এর আগে কখনো আপনাকে দেখিনি। আজই প্রথম আপনাকে দেখলাম তবে। তবে আপনি আমার অনেক চেনা।

কি বললে? আজই প্রথম দেখলে আর বলছো আমি অনেক চেনা।
স্যার আপনার অনেক গল্প শুনেছি তাই বলছি চেনা।
আচ্ছা কে সে? আমাকে নিয়ে তোমার কাছে গল্প করেছে?
স্যার আপনিও তাকে চেনেন। তিনি আপনার অনেক —–
কি বললে? আমিও চিনি।
হ্যাঁ স্যার আপনিও চেনেন।
ঠিক আছে তাহলে বলো কে সে?

স্যার আপনার একটা মূল্যবান সম্পদ আমার কাছে আছে।আমি সেটা দিতেই আপনাকে হন্যে হয়ে খুঁজেছি। আপনাকে অনেক চিঠি লিখেছি কিন্তু কোনো জবাব পাইনি। সেদিন মসজিদের খতিবের কাছে চিঠিটা দিয়েছিলাম শুধু আপনাকে আপনার সম্পদ বুঝিয়ে দিবো এই জন্য।
এই বাচ্চা মেয়েটা কি বলছে? আচ্ছা কি বললে আমার মূল্যবান সম্পদ তোমার কাছে? খুলে বলোতো সব।
স্যার আপনি কি কিছু হারিয়েছেন?
না তেমন কিছু হারাইনি তবে আমার জীবনের অনেকটা সময় হারিয়েছি। প্লিজ বলো কি আছে তোমার কাছে?

স্যার দেখুন আকাশে সাদা মেঘের ভেলা ভেসে বেড়াচ্ছে।আবার আকাশে মিলিয়েও যাচ্ছে।তেমনি কোনো মেঘের সন্ধান আছে আমার কাছে।
কি বললে মেঘের সন্ধান? কোথায় সেই মেঘ?
আমি মোবাইলের স্ক্রীনে মায়ের আগের সময়ের ছবি বের করে উনার সামনে ধরতেই —–
কে মেঘ ? তুমি ওকে কোথায় পেলে? আমি কতো খুঁজেছি কিন্তু কোত্থাও পাইনি। মেঘ কোথায় আছে? কেমন আছে?

মায়ের ছবি দেখেই উনি আবেগে কান্না করে দিলেন? স্যার উনি এখন ঢাকাতেই আছেন। আপনি চাইলে আমি উনাকে আপনার সামনে দাঁড় করাতে পারবো।
আমি আজই এক্ষুণি মেঘের কাছে যেতে চাই। যার জন্য সারাজীবন অপেক্ষায় থাকলাম আজ তার খোঁজ পেয়ে কাছে যাবো না?
আজ নয় স্যার । এখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে আর উনি তো আপনার কথা জানেন না? অন্য কোনো দিন দেখা করিয়ে দিবো।
না আমি আর দেরি করতে পারছি না। আচ্ছা ওর মোবাইল নাম্বার দাও।

না স্যার ফোনে নয়। আপনাদের সরাসরি দেখা করার দায়িত্ব আমার।এতোদিন অপেক্ষা করেছেন এখন ২/১ দিন পারবেন না? বাবাকে কাছে পেয়েও বলতে পারছিনা বাবা আমি তোমার মেয়ে আমি তোমাদের ভালোবাসার ফল। বাবা তো জানেই না তার একটা মেয়ে আছে। আগামীকাল এখানেই মাকে নিয়ে আসবো সেটা বলে বাবার কাছে বিদায় নিতে চাচ্ছি। কিন্তু জন্মের পরে এই প্রথম নিজের বাবাকে দেখে খুব করে বাবা ডাকতে ইচ্ছে করছে কিন্তু না আজ নয়।আগে মায়ের সাথে দেখা হোক মা নিজে বলুক তারপর আমি বাবার আদর খাবো।

Leave a Comment