জামিল হোসেন একটা সরকারি অফিসের অফিস সহকারীর কাজ করে। মা,স্ত্রী এক ছেলে এক মেয়ে নিয়ে ছোট্ট সংসার। পেশাগত কারণে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াতে হয়। কেননা তিন বছরের বেশি কোনো জায়গায় থাকতে পারেনি।
এবারও বদলীর আদেশ পেয়েছেন। সাত দিনের মধ্যেই নতুন কর্মস্থলে যোগদান করতে হবে। এদিকে ছেলে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ছে আর মেয়েটা এখনো স্কুলে যায়নি সবে মাত্র চার বছরে পা দিয়েছে।জামিলের ছেলে রানা মেধাবী কিন্ত খুব শান্তশিষ্ঠ। রানার বয়স যখন তিন বছর তখন একটা দুর্ঘটনায় একটা চোখ অন্ধ হয়ে যায়। ডাক্তার বলেছে একটা চোখ দিয়েই দেখতে হবে এটা আর ভালো হবে না। রানার এ নিয়ে মানসিক কষ্ট থাকলেও সে পড়াশোনায় অনেক ভালো।
জামিল হোসেন এদিকের সব কাজ গুছিয়ে ছেলের স্কুল থেকে ছাড়পত্রও এনেছেন। পরের দিন সকালেই রওনা দিতে হবে তাই রাতেই সব গুছিয়ে রাখলেন। একটা মফস্বল শহরে পোস্টিং হয়েছে। নতুন কর্মস্থলে যোগদান করার আগেই ওখানে গিয়ে বাসা ঠিক করে এসেছেন। তাই সবাইকে নিয়ে কোনো ঝামেলা হয়নি।
দুইদিন হলো এখানে এসেছেন তাই রাস্তাঘাট,মানুষজন সব অচেনা। পরের দিন সকালে রানাকে নিয়ে স্কুলে ভর্তি করানোর জন্য বের হলেন।বাসা থেকে একটু দূরে একটা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে রানাকে ভর্তি করা হলো। প্রথম শুধু শিক্ষকদের সাথে পরিচিত হলেন। প্রধান শিক্ষককে রানার খুব ভালো লেগেছে কেননা অন্য শিক্ষকবৃন্দ রানার এক চোখ অন্ধ হলো কিভাবে জানতে চাইলেও প্রধান শিক্ষক আদর করে রানাকে কাছে ডেকে বললেন রানা তোমার কি দেখতে সমস্যা হয়? রানা মাথা নাড়িয়ে না বললো। তখন প্রধান শিক্ষক বলেন ,বেশ ভালো কথা বাবা, তুমি নিয়মিত স্কুল আসবে ও ঠিকমতো পড়াশোনা করবে। কি পারবে তো? রানা হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়িয়ে বাবার সাথে বাসায় চলে এলো।
পরের দিন সকালে রানা মায়ের সাথে স্কুলে যায়। এই স্কুলে প্রথম দিন তাই রানা চুপচাপ ছিলো।স্যার ম্যামদের সবাইকে রানার খুব পছন্দ হুয়েছে। বেশিরভাগ সহপাঠীরা অনেক ভালো। তারা নিজ থেকেই রানার সাথে কথা বলেছে। তবে এর মধ্যে কয়েকজন কেমন যেনো ।ওরা রানাকে দেখে মিটমিট করে হাসছিলো।পঞ্চম শ্রেণিতে পড়লেও কয়েকটা শিক্ষার্থী বেশ দুষ্টু। রানার এক চোখ অন্ধ তাই ওকে দেখেই মুখ টিপে হাসতে থাকে।
এই ক্লাসেই এখানকার এক প্রতাপশালীর ছেলে পড়ে ও বেশ দুষ্টু। ওর নাম সুজন। সুজনকে নিয়ন্ত্রণ করতে স্যার মেডামদের অনেক ঝক্কি পোহাতে হয়। সুজনকে শাসন করা তো দূরের কথা বুঝাতে গেলেও ওর বাবা এসে হুমকি দেয়। রানা স্কুলে আসছে এক সপ্তাহ পার হয়েছে কিন্তু সুজনের সাথে আজই দেখা। সুজন মায়ের সাথে বেড়াতে গিয়েছিলো তাই এ কয়দিনে স্কুলে আসতে পারেনি।
রানা ক্লাসে দ্বিতীয় সারির বেঞ্চের এক পাশে বসেছে। আর তার পাশের সারিতেই সুজন বসেছে। ইংরেজি ক্লাস হচ্ছে। এই ক্লাসটা সবাই খুব এনজয় করে কেননা অনন্যা ম্যাম প্রতিটি লেসন খুব আন্তরিকতার সাথে উপস্থাপন করেন আর বিভিন্ন ধরণের গেম ও দলীয় কাজের মাধ্যমে পাঠটি আকর্ষনীয় ভাবে উপস্থাপন করেন। এই এক সপ্তাহে রানাও ম্যামের পড়ানোতে মুগ্ধ হয়েছে। একমাত্র সুজনকে সামলানো তার জন্য কষ্টকর তবুও একেক দিন একেক ধরণের কৌশলে সুজনকে ক্লাসে পড়ায় ধরে রাখেন। রানা ম্যামের প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর আনন্দের সাথে দেয়।
এদিকে ক্লাস শুরুর আগেই সাজিদ সুজনকে রানার কথা বলেছে। আর রানা মনে মনে ভেবে রেখেছে ম্যাম চলে গেলেই রানাকে নাস্তানাবুদ করবে। কারণ এর পরেই টিফিনের জন্য বিরতি। ম্যাম সবাইকে ধন্যবাদ দিয়ে ক্লাস রুম থেকে বের হন। আর তখনই সুজন ক্লাসের সামনে দাঁড়িয়ে সবার উদ্দেশ্যে বলে এই বন্ধুরা আমাদের ক্লাসে এমন একজন কে আছে যে সবার চেয়ে আলাদা? সবাই এদিক ওদিক তাকিয়ে বলে কই সবাইতো মানুষ এখানে আবার আলাদা কে?
আরে তোরা কি সব দিনকানা? একজন আছে যে আমাদের চেয়ে আলাদা। শুনবি কে সে?
সবাই সমস্বরে বলে উঠলো বল তো দেখি আমাদের চেয়ে আলাদা কে?
তখন জোরে জোরে বলতে থাকে
“এক চোখ যার কানা
খায় শুধু বাদামটানা
নামটা সবার জানা
সে হলো দেড় ব্যাটারি রানা”
ছন্দে ছন্দে সুজন তার ২/৩ জন বন্ধুকে নিয়ে রানার বেঞ্চের কাছে গিয়ে বারবার বলতে থাকে। এসব শুনে রানার চোখে জল চলে আসে।সুজনের কথাগুলো অধিকাংশ ছাত্রদের অপছন্দ হলেও সবাই চুপ করে থাকে। কারণ সুজনকে কেউ কিছু বললে ও মিথ্যে কথা বলে শিক্ষকদের কাছে দোষী বানাব ও বাবার কাছে বলে মার খাওয়াবে। তাই অন্যায় জেনেও সবাই চুপ থাকে। রানা চুপচাপ তার সীটেই বসে থাকে। অন্যান্য স্যারদের ক্লাসেও রানা মনোযোগী থাকার চেষ্টা করে। এবার ছুটির ঘণ্টা বেজে উঠলো। তাই সবাই বই খাতা গুছিয়ে বের হতে থাকে আর তখনও সুজন আবারও বলতে থাকে
“এক চোখ যার কানা
খায় শুধু বাদাম টানা
নামটা সবার জানা
সে হলো দেড় ব্যাটারী রানা দেড় ব্যাটারী রানা।
রানা স্কুল থেকে ফিরে মন খারাপ করে বসে আছে দেখে মা জিজ্ঞেস করে বাবা কি হয়েছে তোমার? কেউ কিছু বলেছে? রানা মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে।
মা বুঝতে পারে যে রানার চোখ নিয়ে কেউ কিছু বলেছে। তাই ছেলেকে অন্য কথা বলে শান্ত করার চেষ্টা করে। পরের দিন রানা মায়ের সাথে স্কুলে যায়। মা চলে আসার পরে সুজন আবার বলতে থাকে এসে গেছে আমাদের দেড় ব্যাটারী কানা নামটা তার রানা ।
রানার এখানে আর আসতে চায়না । আজ বাসায় গিয়ে বাবাকে বলতেই হবে। রানা নিজেকে খুব অবহেলিত মনে করছে।সুজন শুধু রানাকে বুলিং করেনি তার দ্বারা অনেকেই বুলিংএর স্বীকার হয়েছে। এই তো কিছুদিন আজে রমেশ নামে একটা ছেলে ভর্তি হয়েছিলো। রমেশ দেখতে একটু নাদুসনুদুস ছিলো।তাকে দেখলেই বলতো “ মাছের মধ্যে পটকা আর আমাদের রমেশ ভোটকা”।আবার আলীর গায়ের রঙ কালো ছিলো বলে তাকে দেখলেই বলতো নাম রেখেছে” আলী দেখতে মা কালী”।
এরকম নানা ভাবে সুজন সহপাঠী বা অন্য ক্লাসের শিক্ষার্থীদের বুলিং করতো। তার বুলিং এর কারণে নিয়মিত স্কুলে আসা বন্ধ করেছে।রানাও কয়েক দিন ধরে স্কুলে আসেনি তাই অনন্যা ম্যাম রানাদের বাড়িতে যান । আর ওখানে গিয়ে জানতে পারেন যে, সুজন বুলিং করায় রানা লজ্জায় স্কুলে যাচ্ছে না। ম্যাম রানাকে অনেক বুঝিয়ে আসেন যেনো নিয়মিত স্কুলে যায়।
এতোদিন সুজনকে বুঝিয়ে কিছুই করা যায়নি তার প্রতাপশালী বাবার জন্য। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে তার বাবাও অন্যদের বুলিং করেন। পরিবার থেকে আগে শিক্ষা নিয়ে পরে স্কুলে ভর্তি হয়। তাই পারিবারিক শিক্ষাটা বাচ্চাদের উপর প্রভাব পরে।
স্কুলে অভিভাবক সমাবেশের আয়োজন করে শিক্ষকবৃন্দ বিভিন্ন বিষয়ে অভিভাবকদের অবগত করেন। অনন্যা ম্যাম বিশেষ করে বুলিং নিয়ে আলোচনা শুরু করেন। বিভিন্ন উদাহরণের মাধ্যমে তিনি সবাইকে বুঝানোর চেষ্টা করেন যে, বুলিং কোনো মানসিক ব্যধি নয় এটা এক ধরণের সামাজিক ব্যাধি। তাই এই ব্যাধি থেকে মুক্তি বা প্রতিরোধ করতে আপনাদের সবার সহযোগিতা কাম্য। তিনি আরও বলে যে বুলিং করে সেও এক সময় হয়তো অনুশোচনা করবে কিন্তু ততক্ষণে যে বুলিং এর স্বীকার তার মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখতে পারবে না। তাই মা বাবা, দাদা-দাদী,নানা-নানী সহ অন্যান্য সবাইকে বুলিং ত্যাগ করতে হবে। সন্তানকে সুস্থ সুন্দর পরিবেশ দিতে অবশ্যই বুলিং ত্যাগ করতে হবে।
অনন্যা ম্যাম দাঁড়িয়ে সবার উদ্দেশ্যে বললেন।আমরা কেউ বুলিং করবো না আর বুলিং এর স্বীকার হলে লজ্জায় ভয়ে নিজেকে গুটিয়ে রাখবো না।আমরা মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব তাই সবার কাছে সেরা হয়েই থাকতে চাই।আর এটাই হোক আমাদের ব্রত।
পরিশেষে একটা কথা বলতে চাই
“বুলিং ত্যাগ করি
সভ্য সমাজ গড়ি”
অভিভাবকবৃন্দ অনন্যা ম্যামের কথা নিয়ে অনেক আলাপ আলোচনা করেন।তাদের কাছে ম্যামের কথা অনেক ভালো লেগেছে। আসলে পারিবারিক শিক্ষার অভাবে শিশুরা অস্বাভাবিক আচরণ করে থাকে।
রানার মা বাড়ি গিয়ে ম্যামের কথার অনেক প্রশংসা করেন।রানাকে বুঝিয়ে বলেন বাবা তুমি এখন থেকে নিয়মিত স্কুলে যাবে। দেখবে কেউ তোমাকে আর কিছু বলবে না। রানা বলে হ্যাঁ মা আমি এখন থেকে আর ওদের কথায় কষ্ট পাবো না।
এদিকে সুজনের মা-বাবা দুজনেই সভায় উপস্থিত ছিলেন। ম্যাম সুজনের নাম না বললেও ওর মা বুঝেছে যে এসব কাজ তার ছেলেই করেছে। ম্যাম অনেক ভালো তাই সবার সামনে আমাদের লজ্জা দেননি। সুজনের বাবা প্রথমে ম্যামের কথা তাচ্ছিল্যের সাথে নিলেও পরে স্ত্রীর কথায় বুঝেন যে আসলে এতোদিন তিনি যে মানুষকে নিয়ে হাসিতামাশা করেছেন তা ঠিক হয়নি।মনে মনে স্থির করলেন যে আর কাউকে নিয়ে হাসাহাসি করবেন না।
সুজনকে ডেকে এনে বলেন বাবা তুমি আর কাউকে নিয়ে হাসিতামাশা করো না। বাবার কথায় বলে, বাবা তুমিও ম্যামের কথায় পালটে গেলে?
পাল্টাবো না কেন? এতোদিন আমি বুঝতাম না তাই আমিও মানুষকে অবহেলা করতাম আর তোমাকেও করতে দিতাম।আজ থেকে আর এসব কিছুই করবো না।বাবার কথায় সুজনের মুখ ভার হয়ে গেছে। তখন সুজনের মা ছেলেকে কাছে নিয়ে বলেন বাবা ধরো আজ যদি তোমার কোনো সমস্যা থাকতো আর সেই কথা নিয়ে যদি অন্যরা হাসাহাসি করতো তখন তোমার কেমন লাগতো? ধরো কোনো দুর্ঘটনায় তোমার হাত পা বা চোখের ক্ষতি হল আর তখন যদি অন্যেরা হাসি তামাশা করে তখন কি তোমার ভালো লাগবে? আল্লাহ পাক আমাদের যেভাবে রেখেছেন তার জন্য শোকর আদায় করতে হবে। বাবা আজ আমায় কথা দাও আর কোনোদিন কাউকে নিয়ে হাসি ঠাট্টা করবে না। এবার সুজন শান্ত হয়ে গেছে। মাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলে। মা আমি আর কখনো কাউকে নিয়ে এসব কিছু করবো না।
পরের দিন সুজন সবার আগে ক্লাসে গিয়ে বসে। এদিকে রানাও মায়ের সাথে স্কুলে গিয়ে ক্লাসে গিয়ে বসে।রানা বরাবরই খুব শান্ত প্রকৃতির ছেলে কিন্তু সুজন তো অনেক চঞ্চল কিন্তু আজ সেও শান্ত হয়ে আছে। খুব মনোযোগ সহকারে স্যারের ক্লাস করলো।
এবার অনন্যা ম্যাম ক্লাসে আসেন।ম্যাম আসার সাথে সাথে সবাই করতালির মাধ্যমে অভ্যর্থনা জানায়। ম্যাম জিজ্ঞেস করেন কি হলো সোনা মণিরা? আজ সবাই হাসিখুশি? নিরব দাঁড়িয়ে বলে ম্যাম গতকাল আপনি যে সুন্দর সুন্দর কথা বলেছেন সেসব কথা আমাদের বাবা মায়ের খুব ভালো লেগেছে। ম্যাম আপনি অনেক ভালো।সবাই হাসিখুশি থাকলেও সুজন একেবারে চুপচাপ বসে আছে। অনন্যা ম্যাম রানাকে বললেন এখন থেকে নিয়মিত স্কুলে আসবে।জি ম্যাম আর স্কুলে আসা বাদ দিবো না। ম্যাম সবাইকে দলে কাজ দিলেন। এমন সময় সুজন ম্যামের কাছে গিয়ে আস্তে করে বলে ম্যাম সরি।আমি আর কখনো কাউকে নিয়ে হাসিতামাশা করবো না।আসলে আমাকে কেউ এভাবে বলেনি তাই আমি কতোজনকে কষ্ট । মা আমাকে বলেছে আপনার কথা মতো চলতে।সুজনের এই পরিবর্তন দেখে ম্যাম অনেক খুশি হন। সুজনের মাথায় হাত বুলিয়ে দেন বলেন বাবা তুমি এখন থেকে সবার সাথে মিশবে। অনন্যা ম্যামের ক্লাস শেষ আর সাথে সাথে টিফিনের ঘণ্টা বেজে উঠলো।
রানা মায়ের দেয়া খাবার খাচ্ছে আর সেই মুহূর্তে সুজন রানার কাছে এসে বলে সরি বন্ধু। আমি তোমাকে অনেক খারাপ কথা বলেছি আজ থেকে আর কাউকে অবহেলা করবো না। আমি তোমাকে বন্ধু বানাতে চাই? তুমি কি আমার বন্ধু হবে? রানা বলে যদি বন্ধু মনে করো তাহলে সরি বলছো কেন? হ্যাঁ আমিও তোমার সাথে বন্ধুত্ব করতে চাই। রানা সুজন কোলাকুলি করছে আর তা দেখে ক্লাসের সবাই জোরে করতালি দেয়।
পারিবারিক শিক্ষা আর সুদক্ষ ব্যক্তির সঠিক মোটিভেশান একজন শিশুকে সঠিক পথে চলতে সাহায্য করে। অনন্যা ম্যামের জ্ঞানগর্ভ আলোচনা, আন্তরিকতা আর অভিভাবকদের সাথে সমন্বয়ে সুজন আজ স্বাভাবিক আচরণ করছে।






