আজিজুন নাহার আঁখি

শেষ থেকে শুরু পর্ব-৭

রোদ্দুরদের বাড়ি থেকে অফিস আসতে অনেক জ্যাম থাকে তাই দেশে ফেরার পরই রোদ্দুর মা-বাবাকে নিয়ে উত্তরায় নতুন বাড়িতে উঠেছে। আর পুরোনো বাড়িটা ভেঙে নতুন বিল্ডিং তৈরি হচ্ছে। রোদ্দুরের বড়ো ভাই বাড়ির কাজের খোঁজ খবর নেয় ।তাই রোদ্দুরের তেমন যাওয়া হয় না।
শুক্রবার রোদ্দুরের মা বলে, বাবা চল না আজ আমরা বাড়ি থেকে ঘুরে আসি। কতোদিন বাড়ি যাই না। তোর বাবাকে বড়ো বউমা খেয়াল করবে ,আমাকে নিয়ে চল।

ঠিক আছে মা ,তুমি রেডি হও।তাহলে আমি ওখানে গিয়েই জুম্মার নামাজ আদায় করবো।মাকে নিয়ে বারোটার মধ্যেই সায়েদাবাদের বাড়িতে পৌঁছে গেলাম। বাড়ি পৌঁছে মা যেমন নস্টালজিক হয়ে গেলো আমিও তেমনি। পুরোনো সেই সব স্মৃতি বারবার মনে পড়ছে। মা বাড়ির চারিদিকে ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকলো। আমাদেরকে দেখে আমার ছোটো কাকা এগিয়ে আসছে। চাচা মায়ের সাথে কথা বলতে বলতে আমি বাড়ির চারপাশটা দেখে নিলাম। আজ শুক্রবার তাই নামাজে যাবার তাড়া আছে। ছোটো কাকী এসে মাকে উনাদের বাড়ি নিয়ে গেলো আর আমি আর কাকা বাড়ির পাশের মসজিদে নামাজে গেলাম।

মসজিদ থেকে নামাজ পড়ে ফেরার সময় মসজিদের খতিব হাবিব সাহেব আমাকে ডেকে বললেন, ভাই আপনার একটা চিঠি আছে।
আমার চিঠি? এখন কি আর কেউ চিঠি লিখে?
ভাই আপনি একটু দাঁড়ান আমি এক্ষুণি নিয়ে আসছি। এই বলে হাবিব সাহেব মসজিদের ভেতরে গেলেন।
আমি বাইরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছি আর ভাবছি কে আমায় লিখতে পারে?
একটা রঙিন খাম আমার হাতে ধরিয়ে দিইয়ে বললেন, ভাই ভার্সিটি পড়ুয়া একটা মেয়ে এটা দিয়ে গেছে। আর বলেছে এটা না কি খুব জরুরি।এর আগে না কি আপনাদের বাড়ির ঠিকানায় চিঠি পোস্ট করে কোনো উত্তর পায় নাই। তাই আজ এসছিলো দেখা করতে।কিন্তু কাউকে না পেয়ে আমার কাছে দিয়ে গেছে আর বলেছে আমি যেনো পৌঁছে দেই। আল্লাহর কি অশেষ রহমত আজ সকালে দিয়েছে আর আজই আপনার কাছে দিতে পারলাম।

আমি হাবিব সাহেবকে ধন্যবাদ দিয়ে চলে আসলাম। খামের উপরে শুধু লেখা আছে অতিব জরুরি।কোনো নাম নাই ঠিকানা নাই।এটা আবার কে দিলো? খামটা খুলতে যাবো ঠিক তখন ছোটো কাকা বললেন ,চল ভেতরে চল। কাকার সাথে আমিও বাড়ির ভেতরে গেলাম। কাকী এই অল্প সময়ে আমাদের জন্য খাবার টেবিলে দিয়েছেন। খাওয়া শেষে মাকে নিয়ে বিদায় নিলাম। বাড়ি থেকে বের হবার সময় দেখলাম মা চোখের জল মুছছে।আসলে এই বাড়িতেই মায়ের জীবনের অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে তাই যাওয়ার সময় মন কেমন করছে।

মাকে নিয়ে আসছি তাই আর খামটা খোলা হয়নি। মায়ের সাথে নানান বিষয়ে কথা বলতে বলতে বাড়ি চলে এলাম। বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে গেছে তাই ঐ চিঠির কথা ভুলে গেলাম। বাড়ি ফিরে বাবার সাথে কিছুক্ষণ গল্প করে নিজের রুমে চলে আসে। তমা আমার জন্য অপেক্ষা করে বসে আছে। রুমে আসা মাত্রই আমাকে খাবার খাওয়ার জন্য তাড়া দেয়। খাওয়ার ইচ্ছা না থাকার পরেও ডাইনিং এ গেলাম। সামান্য একটু খেয়েই রুমে এসে শুয়ে পরলাম। আমাকে বিছানায় শোয়া দেখে তমা কিছু বলতে গিয়ে যেনো থেমে গেলো। আমিও আর আগ্রহ দেখালাম না। সারাদিন বাইরে ঘুরাঘুরি ভীষণ ক্লান্ত ছিলাম তাই কখন যে ঘুমিয়েছি টের পাইনি।

প্রতিদিনের মতো যথারীতি সকালের নাস্তা সেরে অফিসের উদ্দেশ্যে বের হলাম। গাড়িতে উঠে বসতে গিয়েই গতকালের সেই চিঠির খাম চোখে পরে। ড্রাইভারকে গাড়ি স্টার্ট দিতে বলেই খাম খুলে সাদা এক টুকরো কাগজ পাই। কাগজে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা আপনার সাথে অনেক জরুরি কথা আছে। আমার মোবাইল নাম্বার দিলাম Plese call me as soon as.আর কিছুই লেখা নাই কারোর নাম নাই শুধু ফোন নাম্বার। আমার কাছে অবাক লাগছে।

পকেট থেকে আমার ফোনে নাম্বারটা ডায়াল করলাম কিন্তু সুইচ অফ বলছে। ভারী মুশকিলে পরলাম তো লিখেছে জরুরি কথা আছে আর নিজেই ফোন অফ রাখছে। কিছুক্ষণ পরে আবার ফোন দিলাম তখনও একই কথা শোনাচ্ছে। যা হোক এখন আর ফোন দিবো না। পরে আবার ফোন করে দেখবো আসলে ঘটনা কি? কে এত জরুরি প্রয়োজনে আমাকে খুঁজছে?
অফিসের কাজে ব্যস্ত হলে আমি বাইরের সব ভুলে যাই। তাই ঐ অপরচিত ফোনের কথা বেমালুম ভুলে গেলাম। রাতে বাড়ি ফিরে যখন ঘুমাতে যাবো তখন ফোনটা হাতে নিতেই একটা মেসেজের নোটিফিকেশন চোখে পড়ে। মেসেজ ওপেন করতেই দেখি “আপনাকে এত রাতে মেসেজ দেয়ার জন্য দুঃখিত ।রাত হয়ে গেছে তাই ফোন করলাম না। সত্যিই আপনার সাথে আমার জরুরি কথা আছে। দিনে আমার পরীক্ষা ছিলো তাই ফোন ধরতে পারিনি।প্লিজ আপনি আমাকে দেখা করার সুযোগ দিন”।

চিঠিটি উল্টেপাল্টে কয়েক বার দেখলাম যে কোথাও প্রেরকের নাম লেখা আছে কিনা কিন্তু কোথাও পেলাম না। আমার কাছে এতো জরুরি সে তো আমার অফিসে আসতে পারে তা না এসে আমাদের পুরনো বাড়ির ঠিকানায় কেন খুঁজছে বুঝতে পারছি না। আচ্ছা আমাকে কোনো বিপদে ফেলবে না তো? আবার ভাবছি বিপদে ফেললে কি আর ফোন নাম্বার দেয়? আসলেই হয়তো আমার সাথে জরুরি কথা আছে। যাকগে আগামীকাল একবার ফোন করে জেনে নিবো কোথায় দেখা করতে চায়।

শাহেদের অতিরিক্ত বাড়াবাড়ির কারণে মেঘ এখন মায়ের কাছে। আলো আশাকে সাথে নিয়েই মেঘ চলে এসেছে। এর মধ্যে শাহেদ আর মেঘের ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। আলো আর আশাকে ওর বাবা নিতে চায় কিন্তু মেঘ যেতে দিতে চায় না। কিন্তু মেয়েরা এখন কলেজে পড়ে তাই ওরা মাকে বুঝিয়ে বাবার কাছে চলে যায়।কারণ ওদের পড়াশোনা সহ অন্যান্য খরচ মেটাতে গেলে মেঘকে অনেক কষ্ট করতে হবে তাই মেয়েরা বাবার কাছে চলে যায়। এদিকে মেঘ মেয়েদের ছেড়ে রোদেলাকে দূরে রেখে বুকে কষ্ট চাপা দিয়ে দিন পার করতেছে।
মেয়েরা মাঝে মাঝে মায়ের কাছে চলে আসে।এভাবে আসা যাওয়ার মধ্যে সময় কাটে।শাহেদের আগের রূপ আর এখনকার আচরণ আকাশ পাতাল ব্যবধান। আগের পক্ষের সন্তান দীপ শিখাই যেনো শুধু তার সন্তান। আলো আশার প্রতি তেমন নজর দেয় না।ওদের সাথে মাঝে মাঝেই খারাপ ব্যবহার করে।
মেঘের শরীরটা ইদানীং ভালো যাচ্ছে না। তাই রোদেলা মাকে ঢাকায় নিয়ে আসে চিকিৎসা করানোর জন্য। হলে তো আর মাকে রাখা যায়না তাই ওর নানা রাকিব সাহেবের ড্রাইভারের বাসায় রাখার সুযোগ হয়। রোদেলা মাকে বলে আমি টিউশনি করে এক রুমের বাসা নিয়ে তুমি আর আমি থাকবো। মেঘ মেয়ের কথায় সায় না দিলেও মনে মনে খুশি হয় এই ভেবে যে তার মেয়ে কতো দায়িত্বশীল ।পরীক্ষা চলছে তাই প্রতিদিন মায়ের কাছে আসতে পারিনি। এদিকে ড্রাইভার নানা বৃদ্ধ হলেও মেঘের আদর যত্নে ত্রুটি করেনা। মালিকের মেয়েকে সেই আগের মতোই কেয়ার করে।

আলো আশা দুজনেই ঢাকায় হলিক্রসে ভর্তি হয়েছে। তাই মায়ের সাথে মাঝে মাঝে দেখা হয়। রোদেলাও বোনদের দেখতে হোস্টেলে মাকে নিয়ে যায়। মেঘ মেয়েদের নিজের কাছে রাখতে চায় কিন্তু নিজেই তো থাকে অন্যের বাসায়। চট্রগ্রামে ফিরে গিয়েই কি করবে? আপাতত ড্রাইভার কাকার সাথে আলোচনা উনার বাসার কাছেই আলাদা একটা রুম ভাড়ার ব্যবস্থা করেছে। মেয়েরা হোস্টেলে থাকে তাই মেঘের একার জন্য এক রুমই যথেষ্ঠ।
রোদেলা টিউশনি করে নিজের খরচ মিটিয়ে মায়ের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করেছে।মেঘের শরীর আগের চেয়ে একটু ভালোর দিকে তাই মেয়েকে বলে আমাকে টিউশন ব্যবস্থা করে দে। আমি আর কতোদিন বসে থাকবো। রোদেলা মাকে জড়িয়ে ধরে বলে মা তুমি অনেক কষ্ঠ করেছো এখন আর নয়। এবার তোমার সুখের দিন আসবে।মেয়ের কথায় মেঘ কি বলবে বুঝে উঠতে পারেনা। আসলে রোদেলা ধরেই নিয়েছে এবার তার বাবা মায়ের মিল করাবেই।

Leave a Comment