এম্বুলেন্স নিয়ে ওরা ঢাকায় হাসপাতালে প্লাবনকে ভর্তি করলো।
প্লাবনের লিভারের সমস্যা ধরা পরেছে যত দ্রুত সম্ভব লিভার চেঞ্জ করতে হবে। এসব কথা শুনে অহনার দুচোখে অশ্রুর বন্যা বয়ে চলছে।
অহনা ডাক্তারকে বললো স্যার আমি আমার লিভার দিতে প্রস্তুত আছি। আপনারা সব ব্যবস্থা করেন।
দেখুন আপনি চাইলেই তো সম্ভব নয় এখানে অনেক কিছুর ম্যাচিং থাকতে হয়।
স্যার আমাদের ব্লাড গ্রুপ দুজনেরই AB+ তাই অন্যান্য কিছু মিলবে ইনশাআল্লাহ।
ঠিক আছে আপনার পরীক্ষা নিরীক্ষাও আমরা করছি দেখি ম্যাচ করে কি না।
স্যার একটা অনুরোধ যদি ওর সাথে আমার সব মিলে যায় তাহলে আপনি কখনোই ওকে বলবেন না যে আমিই ওকে লিভার দিয়েছি।
ঠিক আছে আগে মিলে যাক তারপর দেখা যাবে।
প্লাবন একা শুয়ে থাকতে থাকতে বোর হয়ে গেছে। অনেকক্ষণ অহনার দেখা নাই। আচ্ছা অহনা কই গেলো?
এমন সময় এক পেয়ালা গরম স্যুপ হাতে নিয়ে অহনার প্রবেশ।
কি মশাই কি ভাবছ? আর চিন্তা করবে না দেখবে এক মাসের মধ্যে তুমি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে কাজে ফিরবে।
আলাদিনের চেরাগ পেয়েছ না কি?
হুম পেয়েছিই তো।
হেনাকে বলতো অনন্যকে নিয়ে আসতে। কয়দিন ছেলেটাকে আদর করিনা। ওর জন্য মনটা কেমন যেনো করছে।
আচ্ছা আজ বিকেলে আনতে বলব।
পরের দিন সকালে অহনার সব পরীক্ষা নিরীক্ষা হলো।
সব যেনো মীরাক্কেল , প্পাবনের সব কিছুর সাথে অহনার সব ম্যাচ হয়ে গেছে।
ডাক্তার এই সুসংবাদ দেবার জন্যই কেবিনে আসছিলো। কিন্তু অহনা ইশারায় না করলো।
অহনা ডাক্তারের চেম্বারে গিয়ে সব শুনে আল্লাহর কাছে শোকর আদায় করলো।
স্যার তাহলে আর দেরী নয়।আপনি অপারেশন করার ব্যবস্থা করুন।
হুম সেতো করতেই হবে কিন্তু একটা বড়ো বাঁধা আছে।
আবার বাঁধা কিসের?
লিগ্যাল সম্পর্ক ছাড়া এতো বড়ো অর্গান নেয়া যাবে না।
আপনি যদি প্লাবন সাহেবকে বিয়ে করেন তাহলেই লিভার দিতে পারবেন তা না হলে পারবেন না।
অহনা এক মিনিট সময়ও নিলো না।
স্যার আমরা আজ বা আগামীকালই বিয়ে করব। আমি প্লাবনকে রাজি করাচ্ছি।
স্যার আপনার হাসপাতালের কেবিনে বিয়ের ব্যবস্থা করতে দিবেন তো?
ওকে আপনাদের বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হোক। রোগীর আরও কিছু টেস্ট করে অপারেশনের তারিখ ঠিক করব।
অহনা প্লাবনের হাত ধরে কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে, আমায় বিয়ে করবে? বড্ড ভালোবেসে ফেলেছি গো।
প্লাবন অবাক বিস্ময়ে, কি বললে আমায় বিয়ে করবে? এই অসুস্থ মানুষকে জীবনে ক’টা দিন পাবে?
হুম আমি আজই বিয়ে করতে চাই।
অহনা বিয়ে ছেলে খেলা নয়,তোমার ভবিষ্যৎ নষ্ট করার অধিকার আমার নাই।
আমি ভেবেচিন্তে কথাটি বলেছি। কেনো আমাকে বুঝি তোমার পছন্দ নয়?
না অহনা আমি সেটা বলিনি। আসলে আমার অল্প আয়ুর সাথে তোমাকে জড়াতে চাইনা।
আমি আর কিচ্ছু শুনছি না আজ সন্ধ্যায় তোমার আমার বিয়ে হচ্ছে।
আমি এখন বাইরে যাবো তোমার জন্য পাঞ্জাবি আর আমার জন্য শাড়ি আর ফুল কিনে আনব। আর আমাদের বাবুটার জন্যেও নতুন পাঞ্জাবি কিনব। এই প্রথম সন্তানের সামনে বাবা মায়ের বিয়ে হবে।কি মজা তাই না?
তুমি পাগলামি করো না অহনা।
আমি পাগলামি করছি না তুমি শুধু আমায় ছুঁয়ে কথা দাও আমাকে ছেড়ে কোত্থাও যাবে না।
আমি কথা দিয়ে যদি কথা না রাখতে পারি।আল্লাহ পাক যদি আমায় আগেই তুলে নেয়।
অহনা প্লাবনের মুখ চেপে ধরে বলে, এসব বাজে কথা কখনোই বলবে না।
অহনা আকাশী রঙের শাড়ি পরেছে আর প্লাবনের গায়ে আকাশী রঙের পাঞ্জাবি।
ডাক্তার,নার্সদের উপস্থিতিতে বিয়ের রেজিষ্ট্রেশন ও ইসলাম ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী বিয়ে পরানো হলো। রুস্তম আলী হেনা আর অনন্যকে নিয়ে ঠিক সময় মতো পৌঁছে গেছে।
রুস্তম আলী মিষ্টি এনে সবাইকে খাওয়ালো।
প্লাবন একটু খানির জন্য বেডে বসেছিলো। অনন্য প্লাবনের কোলে যাবার জন্য বায়না ধরায় অহনা অনন্যকে কোলে নিয়ে প্লাবনের মাথার কাছে বসে। অনন্যর হাত প্লাবনের কপালে ছুঁয়ে দিয়ে বলে বাবাকে আদর করে দাও।
অনন্যর কচি হাতের স্পর্শে প্লাবনের দুচোখ গড়িয়ে জল পড়ে।
অহনা অনন্যকে আদর করে বুঝিয়ে হেনার সাথে বাসায় পাঠিয়ে দেয়।
প্লাবনের শরীরে ব্লাড দেয়া হচ্ছে। শরীর ক্রমশ খারাপের দিকে।
অহনা প্লাবনের কাছে এসে কখন বসেছে প্লাবন খেয়ালই করেনি। প্লাবন ঘুমিয়ে পরেছিলো।
নার্স রাতের ঔষধ অহনাকে বুঝিয়ে দিয়ে গেলো। আর বললো মেডাম দরকার হলে আমাকে ডাক দিয়েন।
আজ প্লাবনকে অনেক আপন মনে হচ্ছে। ইচ্ছে করছে শক্ত করে জড়িয়ে ধরতে কিন্তু ও যে অসুস্থ তাই তো ওর পাশে হাত ধরে বসে থাকা ছাড়া উপায় নাই।
প্লাবনের চোখেমুখে খুশির আভা কিন্তু শারীরিক অসুস্থতার কাছে সব বন্দী।
এমন একটা দিন আজ ওদের জীবনে কিন্তু জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে আজ অহনাকে দেবার কিছুই নাই। প্লাবন অহনার কপালটা ছুঁয়ে দেয় আর বলে অনেক অনেক ভালোবাসি তোমায়। আমার হাত শক্ত করে ধরে রেখো ছেড়ে দিওনা কিন্তু —-
প্লাবন মাঝে মাঝেই ঘুমিয়ে যাচ্ছে কিন্তু অহনা সারারাত প্লাবনের হাত ধরে বসে ছিলো।
ভোরের সোনালী রবির কিরণে প্লাবনকে অসাধারণ লাগছে। অহনা নামাজ পড়ে প্লাবনে শিয়রে দোয়া পড়তে ছিলো তখন প্লাবন অহনাকে হাত ধরে কাছে টানে। অহনাও একটু সময়ের জন্য প্লাবনের বুকে মাথা রেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে।
সকাল নয়টায় প্লাবনের কেবিনে ডাক্তার রাউন্ডে এসে বলেন, মি: প্লাবন আপনি সৌভাগ্যবান, আপনার জন্য লিভার পাওয়া গিয়েছে। আজকে আপনার কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা হবে আর ডোনারের পরীক্ষা নিরীক্ষা চলছে সব ঠিকঠাক থাকলে আগামীকাল আপনার লিভার প্রতিস্থাপন করব ইনশাআল্লাহ।
স্যার কে সেই মহান, আমি তাকে দেখতে চাই।
এখন তো সম্ভব নয়, আপনার স্ত্রীর সাথে দেখা হয়েছে। আপনি মানসিকভাবে শক্ত থাকুন। দেখবেন আপনি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যাবেন।
আচ্ছা ডোনারের ক্ষতি হবে না তো?
না উনি আপনাকে হাফ লিভার দিবে আর কয়েক মাসের মধ্যে উনার লিভার পূর্বের মতো হয়ে যাবে।
So don’t worry.
অনেকক্ষণ অহনাকে না দেখে প্লাবন নার্সদের কাছে খোঁজ করে।
সারাদিন অহনার উপর দিয়েও অনেক ধকল গিয়েছে। একদিকে এতো এতো টেস্ট আরেকদিকে প্লাবনের জন্য টেনশন। অনন্যকে দেখভালের জন্য হেনা থাকলেও অহনার ছেলেটার কাছে না গেলে অস্থির হয়ে যায়।
আগামীকালই অপারেশন হবে তাই অহনা হেনাকে সব বুঝিয়ে দিলো। ডাক্তার বলেছে অহনাকেও এক সপ্তাহ হাসপাতালের বেডে থাকতে হবে তারপর আরও মাসখানেক খুব সাবধানে থাকতে হবে।
এরই মধ্যে ঢাকায় দুই রুমের একটা বাসা ভাড়া করতে হয়েছে। প্লাবনের অফিস অর্থনৈতিক ভাবে সাহায্য না করলে কি যে হতো আল্লাহ পাক জানে।
বিকেলে প্লাবনের কেবিনে ঢুকতেই দূরে অভির মতো একজনকে দেখতে পেয়ে দ্রুত কেবিনে ঢুকে গেলো। না ও যদি অভি হয় তাহলে ঐ প্রতারকের চেহারা সে দেখতে চায় না।
অহনা প্লাবনের পাশে বসে আগামীকাল অপারেশন নিয়ে অনেক আলাপ করে। প্লাবনকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করতে নানা ধরনের কথা বলে।
সন্ধ্যার পরে নার্স এসে বলে এখন খাবার খাওয়ার পর আর কোনো খাবার খাবেন না।
প্লাবনের অফিস থেকে নিলয় এসেছে সাথে ওর স্ত্রীও আছে। অপারেশনের সময় পাশে থাকার আর কে আছে?
এতো বড়ো জার্নি কিন্তু আপন বলতে অফিসের লোক ছাড়া আর কেউ নাই। ভাগ্যিস হেনার কাছে অনন্য থাকে।
অহনা শুধু আল্লাহর কাছে এটাই প্রার্থনা করে প্লাবন যেনো দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠে।
প্লাবনের অপারেশন করার জন্য অহনা বন্ডসই দেয় কিন্তু অহনার জন্য কে স্বাক্ষর দিবে?
তখন নিলয় বলে আমি দিচ্ছি আর সম্পর্কের ওখানে লেখে ভাই।
সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হলে প্লাবনকে ও টিতে নিয়ে যায়।তখন প্লাবন অহনার হাত ধরে বলে আমায় ক্ষমা করে দিও। যদি বেঁচে ফিরি তোমাকে কখনো কান্না করতে দিবনা। অহনাও বলে ইনশাআল্লাহ তুমি সুস্থ হয়েই ফিরবে।
অহনা ও টিতে যাবার আগে অনন্যকে কোলে নিয়ে আদর করে অশ্রুসজল চোখে সবার কাছে থেকে বিদায় নেয়।
দীর্ঘ ৫/৬ ঘন্টার অপারেশন শেষে ডাক্তার হাসিমুখে বের হন।
অহনার জ্ঞান ফেরার পর নার্স বলে অপারেশন সাকসেসফুল। প্লাবন সাহেবকে অবজারভেশনে রাখা হয়েছে। ২ দিন পরে কেবিনে দেয়া হবে। অহনার চোখের জল গড়িয়ে পরে এ কষ্টের অশ্রুপাত নয় এ যে সুখের কান্না।






