প্লাবনের জ্ঞান ফেরার পর অহনাকে দেখতে চায় কিন্তু অহনা যে পাশের কেবিনে আছে সেটা কেউ বলে না।
একটা সপ্তাহ যে কিভাবে পার হয়েছে আল্লাহ পাক জানে। অহনা ব্যস্ত হয়ে গেছে প্লাবনের কাছে আসার জন্য। অনন্যকে হেনা মাঝে মাঝে অহনাকে দেখিয়ে নিয়ে গেছে।
অহনা যে প্লাবনকে লিভার দিয়েছে এটা এখন পুরো হাসপাতালের সবাই জানে। অহনার এই ত্যাগ আজীবন মনে রাখার মতো।
ওদের যে ডাক্তার অপারেশন করেছেন তার সাথে আরও ৫/৬ জন ডাক্তার ছিলেন। তাদের একজন ইরার খালাতো বোন হয়। সে ইরাকে এই অসাধারণ আত্মত্যাগের কথা বলে।
ইরার এই জুটিকে দেখতে ইচ্ছা পোষণ করে। তখন ইরার বোন বলে ঠিক আছে উনারা সুস্থ হোক একদিন তোমাকে নিয়ে যাবো।
প্লাবনকে নার্স স্যুপ খাওয়াচ্ছিলো তখন ডাক্তারের সাথে অহনাও কেবিনে আসে। অহনাকে এতো দিন পরে দেখে আবেগে আপ্লুত হয়ে প্লাবনের চোখ ছলছল করে। অহনা তো প্লাবনের হাত ধরে কেঁদেই ফেলে।
ডাক্তার প্লাবনকে বলেন, এই যে মি: প্লাবন সব সময় বউকে যত্নে আদরে ভরিয়ে রাখবেন। এমন স্ত্রী পাওয়া তো সৌভাগ্যের।
জি স্যার আমি অহনাকে কখনো কষ্ট দিবো না। আচ্ছা অহনা তুমি এতো দিন পরে এলে কেন? আমার তো কবেই জ্ঞান ফিরেছে।
ডাক্তার তো আমাকে আসতে দেয়নি। আর কোত্থাও যাবো না। এই আমি তোমার কাছে আছি কাছেই থাকব।
অহনা এখন পুরোপুরি সুস্থ হলেও ডাক্তার সাবধানে থাকতে বলেছেন। প্লাবনও ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে যাচ্ছে। আর কয়েকটি দিন পরেই বাড়ি ফিরতে পারবে।
বাইরে অঝোর ধারায় বৃষ্টি পড়ছে আর মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। অন্ধকার হয়ে আসছি চারিদিক। অহনা প্লাবনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। এ কয়দিনে হাসপাতালের সবাই ওদের দেখে মুগ্ধ।
আজ ইরাকে নিয়ে অভি হাসপাতালে আসছে। বাচ্চাটাকে হারিয়ে ইরা একেবারে অসুস্থ হয়ে পরেছিলো। ডাক্তারের চিকিৎসা আর অভির আন্তরিকতা দায়িত্ববোধ ইরাকে ধীরে ধীরে সুস্থ করে তুলেছে।
প্লাবন যে হাসপাতালে আছে ভাগ্যক্রমে ইরাও একই হাসপাতালে। ডাক্তার দেখানোর পরে ইরা অভিকে নিয়ে ওর খালাতো বোনের চেম্বারে যায়।
কি ইরা আপু,অভি ভাইয়া আপনারা কতক্ষণ? আমাকে একবার কল দিবেন না?
তুই ব্যস্ত তাই কল করিনি ভাবছি সামনাসামনি গিয়েই কথা বলবো।
এই চল না আমাদের তোর ঐ রোগীদের সাথে আলাপ করিয়ে দে?
ওহ আপু তুমি সেই লিভারের রোগীর কথা বলছো?
হুম, আমি উনাদের সাথে পরিচিত হতে চাই।
পৃথিবীতে এখনো এতো ভালোবাসা আছে যে বিয়ের আগেই বয় ফ্রেন্ডকে নিজের অর্গান দিতে রাজি হয়?
তোমরা কি বলছো? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।
আরে ভাইয়া আমাদের হাসপাতালে এক মেয়ে তার বয়ফ্রেন্ডকে লিভার দিতে রাজি ছিলো। পরে আমাদের স্যার যখন বলেছে লিগ্যাল সম্পর্ক ছাড়া অর্গান দেয়া যাবেনা তখন ঐদিনই হাসপাতালের কেবিনে মেয়েটি ছেলেটির সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। অবশ্য ছেলেটি এখনো জানেনি যে ডোনার তার স্ত্রী। মেয়েটির অনুরোধে আমরা বিষয়টি গোপন রেখেছি।
শুনলাম ওদের একটা দত্তক সন্তানও আছে। বিয়ে না করেও ওরা বাবা মা হিসেবে ঐ সন্তান লালন পালন করছে। এমন পবিত্র ভালোবাসা দুনিয়ায় খুব কম দেখা যায়। ছেলেটার অবস্থা খুব আশংকাজনক ছিলো আল্লাহর রহমতে এখন আর কোনো শংকা নাই। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে রিলিজ করা যাবে।
ইরা তুমি কি সত্যিই যাবে উনাদের কেবিনে?
হ্যাঁ আমি তো যাবোই তুমিও চলো।
হ্যাঁ ভাইয়া চলুন, আর এখন আমার রাউন্ডের সময় তাই উনারা কিছু মনে করবে না।
প্লাবন উল্টো দিকে এক পাশ হয়ে শুয়ে আছে। ডাক্তার রিনি কেবিনের দরজায় নক করে। কেউ সাড়া না দেওয়ায় ভেতরে গিয়ে দেখে প্লাবন শুয়ে আছে আর অহনা জায়নামাজে বসে দোয়া করতেছে। দ্রুত জায়নামাজ গুছিয়ে ডাক্তারের পাশে এসে দাঁড়ায়।
এই যে মেডাম আপনি সুস্থ আছেন তো?
জি আলহামদুলিল্লাহ।
বরের খবর কি? আগের চেয়ে তো বেটার লাগছে।
হুম ও আপনাদের সেবায় অনেক ভালো আছে।
আপনাদের সাথে আমার আপু কথা বলতে চায়? কি ভেতরে আসতে বলব?
হুম বলুন।
ইরা ভেতরে ঢুকেই সালাম দেয়। অহনা ইরাকে দেখেই অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে আছ।কেননা প্লাবনের কাছে ইরার যে ছবি দেখেছে তার সাথে ইনার চেহারার হুবহু মিল আছে। আর ঠিক তখন ডা: রিনি বলে ইরা আপু ইনিই অহনা।ইরার গালের কালো তিল জ্বলজ্বল করছে যা দেখেও অহনা আন্দাজ করেছে ইনি ইরা। কিন্তু সে না চেনার ভান করে।
আপনার ভালোবাসা নিজ চোখে দেখতে এলাম।রিনির কাছে আপনাদের অনেক গল্প শুনেছি। আপনার স্বামী এখন সুস্থ?
হ্যাঁ আল্লাহর অশেষ কৃপায় ও সুস্থ হচ্ছে।
উনি তো ও পাশ মুখ করে শুয়ে আছে তাই পরিচিত হতে পারলাম না। আরেকদিন আসব। অহনাও চায়নি প্লাবন এই মুহূর্তে ইরাকে দেখে অতীত মনে করে কষ্ট পাক। অভি কেবিনের বাইরে অপেক্ষা করছে। ইরা অহনার সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করে বেরিয়ে গেলো। অহনার মনটা হটাৎ খারাপ হয়ে গেলো। প্লাবন যাকে ভালোবাসতো আজ সে এখানে এসছিলো। আচ্ছা প্লাবন কি এখনো ইরাকে ভালোবাসে? ইরা যদি ফিরে আসে তাহলে কি প্লাবন ইরাকে গ্রহণ করবে? মনের ভিতর নানান প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে বারবার। আচমকা দমকা হাওয়ায় অহনার চেতনা ফিরলো। প্লাবন যে কয়েকবার অহনাকে ডেকেছে কিন্তু কোনো সাড়া পায়নি। আচ্ছা তুমি কখন জাগলে?
অনেকক্ষণ আগেই , তোমাকে ডেকেছি কিন্তু তুমি কোথায় যেনো হারিয়ে গিয়েছিলে।
আমি আবার কোথায় হারাবো? আমি তো এখানেই।
হাসপাতাল বাসা প্লাবন অনন্য সবাইকে আগলে রাখাই এখন অহনার প্রধান কাজ। নিজেও যে অসুস্থ সে ভুলেই গিয়েছে।
আজ প্লাবন বেশ ভালো আছে। অহনার সাথে কেবিন থেকে করিডোরে একটু হাঁটাহাঁটি করছে। অনেক বড় ঝড় বয়ে গেলো ওদের উপর। প্লাবন এখনো জানেনা যে তার পুনর্জন্মের জন্য অহনার আত্মত্যাগ।
আজও ইরা আর অভি হাসপাতালে আসছে চেকাপ করাতে। ইরা ডাক্তারের সাথে আলাপের সময় অভি বারান্দায় অপেক্ষা করছে। হটাৎ করে উপরের করিডোরে অহনাকে দেখে চমকে উঠে।
অহনাকে দেখে মনের ভিতর তোলপাড় চলছে। অহনা ঠিক আগের মতোই আছে। আচ্ছা সাথের ঐ লোকটা নিশ্চয়ই অহনার বর। যাকগে অহনা ভালো থাকুক সেটাই চাই।
প্লাবনকে একটা চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে অহনা রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে। ইরা ডাক্তারের রুম থেকে বেরিয়ে দেখে অভি দাঁড়িয়েই আছে।
আচ্ছা তুমি দাঁড়িয়ে আছো কেন? রিনির রুমে গিয়ে বসতে পারতে?
অভির সাথে কথা বলতে বলতে উপর দিকে তাকিয়ে অহনাকে দেখেই চিনে ফেলে।
অভির সাথে কথা বলতে বলতে উপর দিকে তাকিয়ে অহনাকে দেখেই চিনে ফেলে।
এই অভি দেখো ঐ যে মেয়েটাকে দেখছ না, ও ওর বরকে নিজের লিভার দিয়েছে। খুব ভালোবাসা দুজনের মধ্যে।ইস সেদিন গেলাম কিন্তু মেয়েটার নামই জানা হয়নি। এই চলো না যাই ওদের কাছে।
কি পাগলামি কথা বলছো? অচেনা মানুষের কাছে বারবার যেতে নাই।আর উনারা কি তোমার আত্মীয়? চলো বাসায় যাই।
ইরার ইচ্ছা থাকা সত্বেও ওদের কাছে না গিয়ে অভির সাথে বাসায় ফিরলো।
বাসায় ফেরার পর থেকে অভির মনটা কেমন যেনো করছে। অহনা অভিকে অনেক ভালোবাসতো। অভির জন্য ঘর ছেড়েছিলো। পরে অভি খবর নিয়ে জেনেছে অহনা আর সেদিনের পরে বাড়ি ফিরেনি। বাবার কথায় ইরাকে বিয়ে করে অভিও ঢাকার বাইরে চলে যায়। আর কখনো অহনার খোঁজ নেয়া হয়নি। আজ মনে হচ্ছে সত্যিই অহনার প্রতি অভি অবিচার করেছে আর এজন্যই হয়তো আজ একমাত্র সন্তানকে আল্লাহ পাক দূরে সরিয়েছে। বাসায় ফিরে অভি ইরার সাথে কোনো কথা না বলে পড়ার রুমে গিয়ে চুপচাপ বসে আছে।
ইরা রাতের খাবার খাওয়ার জন্য দুইবার করে ডেকে গেছে কিন্তু অভির কানে সে ডাক পৌঁছায়নি। অভি অতীতে ফিরে গিয়েছিলো।
ইরা আমি রাতে কিছু খাবো না। তুমি খেয়ে শুয়ে পরো। আমি একটু পরে আসছি।
মাঝে মাখেই অভি রাতে না খেয়েই ঘুমিয়ে পরে। তাই ইরাও আর জোর করলো না।
হেনা অনন্যকে নিয়ে এসেছে। আজ প্লাবনকে বেশ ভালো মনে হচ্ছে। অনেকদিন পরে ছেলেকে কোলে নিয়ে বসে আছে। আরও বেশি ভালো লাগছে যখন ডাক্তার বলেছে আগামীকাল রিলিজ দিবে।
হাসপাতাল থেকে ঢাকায় কিছুদিন থেকে তারপর অফিসের কাজে জয়েন করবে। বাগানের সবাই ওদের জন্য অপেক্ষা করে আছে। ফরেস্টের সব কর্মকর্তা কর্মচারী প্লাবনের পাশে ছিলো বলে এতো বড়ো জার্নিতে তেমন বেগ পেতে হয়নি।
অহনা সব গুছিয়ে নিয়েছে। প্লাবনকে ড্রেস চেঞ্জ করিয়েছে। ডাক্তারের সাথে কথা বলে সব বুঝে নিয়েছে। রুস্থম আলীও চলে এসেছে। প্লাবনের কোলে অনন্যকে বসিয়ে সব প্যাক করতে অহনা আর হেনা ব্যস্ত।
এমন সময় ডা: রিনি আসে ওদেরকে দেখার জন্য। অনন্যকে দেখেই রিনির ইরার ছেলে অয়নের কথা মনে পড়ে। আচ্ছা অহনা ও কে?
ও আমার ছেলে অনন্য।
ওহ ওকেই আপনারা দত্তক নিয়েছেন?
ও আমাদের ছেলে অনন্য এটা প্লাবন বলে।
রিনি আর দেরি না করে ইরাকে ফোন দেয় কিন্তু ইরা ফোন ধরেই না।






