হাসপাতাল থেকে অনেক দিন পরে বাসায় ফিরে প্লাবন বেশ ফুরফুরে মেজাজে। আজ ওদের দাম্পত্য জীবনের সাংসারিক জীবন শুরু। জীবনের এই সময়ে অহনার মতো জীবনসঙ্গী পেয়ে নিজেকে ধন্য মনে করছে।
অপরদিকে অহনাও প্লাবনের মতো একজন দায়িত্বশীল ভালো মানুষকে পেয়ে সন্তুষ্ট। অনন্য যেনো ওদের জীবনে সেতু বন্ধন। ওদের তিনজনকে দেখে বুঝাই যায় না যে কেউ কারোর ছিলো না। ওদের সম্পর্ক যেনো আজন্মের।
ভোরের আলো ফুটতেই অহনা বিছানা ছেড়ে উঠতে গেলেই প্লাবন আলিঙ্গনে বাহুডোরে বাঁধে। অহনায় লজ্জায় লাল হয়ে গেছে। প্লিজ ছেড়ে দাও ছেলে দেখবে।
ও ঘুমাচ্ছে আর দেখলে দেখুক। আমাকে ছেড়ে যেও না। অহনাকে আরো কাছে টেনে নেয়। প্লাবনের উষ্ণ আলিঙ্গনে অহনারও ভালো লাগছে। এভাবেই মধুর আবেগময় সময় দুজন দুজনার সাথে মিশে যায়।
এদিকে হাসপাতালের ডাক্তার রিনি মেডাম কল করে বাসার ঠিকানা জেনে নেয়। অহনা ভাবে হয়তো ইরার প্লাবনের কথা জেনেছে তাই আসতে চায় তাই প্রথমে ঠিকানা দিতে চায়নি কিন্তু রিনির সাথে আলাপে তেমন আভাস পাওয়া যায়নি।
প্লাবন বসার ঘরে বসে বিশ্রাম নিচ্ছে এমন সময় কলিং বেলের শব্দ। অহনা ছেলেকে খাবার খাইয়ে বারান্দায় বসে ছিলো তখন হেনা দরজা খুলে ডাঃ রিনিকে দেখে ভেতরে আসতে বলে।
ভাইয়া ডাঃ রিনি মেডাম আর সাথে কারা যেনো এসেছে।
উনাদের ভেতরে আসতে বল।
রিনির পিছনে প্রথমে অভি ও একটু পরে ইরা প্রবেশ করে। প্লাবন অভিকে চিনে না আর অভিও প্লাবনকে চিনেনা । দুজনেই করমর্দন করে কুশল বিনিময় করে। প্লিজ বসুন আপনারা।
আচ্ছা আপনি এখন সুস্থ আছেন?
হুম আল্লাহর রহমতে ভালো আছি। আগামীকাল চেকাপ করে কাজে ফিরব। আমি বন জঙ্গলের মানুষ তাই শহুরে জীবন ভালো লাগছে না। প্রাণখুলে নিঃশ্বাস নিতে পারছি না।
এই হেনা তোর আপুকে ডেকে আন।
হেনা অনন্যকে কোলে নিয়ে রুমে এসেই অভিকে দেখে চমকে যায়।
রিনি বলে, মিসেস অহনা ইনি আমার বোনের বর অভি রায়হান। আর আমার বোনও আসছে ও একটু অসুস্থ তাই গাড়িতে বসে আছে।
প্লাবন অভির নাম শুনেই অহনার দিকে তাকিয়ে বুঝে যায় এই সে অভি সাহেব যার জন্য অহনা আত্মহত্যা করতে গিয়েছিলো।
অহনার কোলে অনন্যকে দেখেই অভি চিনে ফেলে নিজের সন্তানকে। অভি কি বলবে কিছুই বুঝতে পারছে না। একদিকে নিজের অতীত আরেকদিকে তারই কোলে নিজের একমাত্র সন্তান।
অহনা যেনো পাথরের মূর্তি হয়ে গেছে। অনন্যকে প্লাবন নিজের কোলে নিয়ে অহনাকে বসতে বলে। রুমের সবাই যখন চুপচাপ ঠিক তখন ইরাকে নিয়ে ইরার মা ভেতরে আসে। প্লাবন দরজায় ইরাকে দেখে চমকে যায়। একি কি দেখছে আজ?
অভির সাথে ইরা এলো কোত্থেকে? প্লাবনও কোথায় যেনো হারিয়ে গেলো।
এতোক্ষণ ইরা প্লাবনের দিকে ভালো করে তাকায়নি। প্লাবনের কোলে নিজের ছেলেকে দেখে সেদিকে তাকাতেই প্লাবনের চোখে চখ পরে।
কি হচ্ছে এসব? প্লাবনের কোলে আমার ছেলে? ইরা কাঁদতে কাঁদতে ছেলেকে কোলে নিতে গেলে অহনা অনন্যকে বুকে টেনে নেয়।
মা দেখো এই যে আমাদের অয়ন। ও বেঁচে আছে। আমি ত অনেকবার বলেছি আমি আমার ছেলেকে ফিরে পাবো । দেখো আজ ঠিক ফিরে পেলাম।
এবার অহনা বলে, কে আপনার ছেলে? ও আমাদের ছেলে অনন্য। আপনার ছেলের মতো দেখতে হলেই কি আপনার ছেলে হবে?
দেখুন ওর গালেও আমার মত কালো তিল আছে। আমরা ওকে হারিয়ে ফেলেছিলাম। গতবছর পাহাড়ে বেড়াতে ডাকাতদের কবলে পরে ওকে হারিয়ে ফেলি। আমরা অনেক খুঁজেছি কিন্তু কোত্থাও পায়নি।
অনন্য অহনাকে শক্ত করে ধরে আছে। প্লাবনের বুঝতে পেরেছে অনন্য অভি আর ইরার ছেলে। আল্লাহর কি অবদান যে যাদের জন্য আমি আর অহনা মরতে গিয়েছিলাম আজ তাদের সন্তান আমাদের কাছে।
অহনা অভির দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না ,সে শুধু প্লাবনকে বলছে আমি আমার ছেলেকে কাউকে দিবো না। কিন্তু বিধির কি নির্মম পরিহাস আজ এই করুণ পরিস্থিতিতে আজ সবাই মুখোমুখি।
সব কিছু শুনে প্লাবন অহনাকে রাজি করায় কিন্তু অনন্য কিছুতেই অহনাকে ছেড়ে একটিবারের জন্য অভি বা ইরার কাছে যায়নি।
ডাঃ রিনি সবার উদ্দেশ্যে বলেন , ইরা আপু তুমি তো তোমার ছেলের খোঁজ পেয়েছো তাই ওকে আগামীকাল এসে নিয়ে যেও। আর প্লাবন সাহেব আপনারাও তো ২/১ দিনের মধ্যে ফিরে যাবেন তাই আজ ও আপনাদের কাছেই থাক।
অহনাকে ছেলেকে বুকে নিয়ে রুমে চলে গেলো। অভিকে প্লাবন কিছু বলতে গিয়েও বলেনি।সারারাত প্লাবন অহনাকে বুঝিয়েছে। আল্লাহর ইচ্ছায় ওদের ছেলে আমাদের কাছে ছিলো আবার তাঁর ইচ্ছাই বাবা মায়ের কাছে ফিরছে।
পরের দিন সকালেই অভি আর ইরা অনন্যকে নিতে চলে আসে। ওরা আসার আগেই অহনা ছেলেকে নতুক পোশাক পরিয়ে সাজিয়ে গুছিয়ে প্লাবনের কোলে দিয়ে ছাদে চলে যায়। প্লাবনকে বলে আমি সহ্য করতে পারব না।
প্লাবনের কোল থেকে অভি নিতে চাইলেও অনন্য যেতে চায় না। তখন এক পর্যায়ে জোর করে অনন্যকে কোলে তুলে নেয়।ইরার তো চোখের জলে বুক ভেসে যাচ্ছে। অভি ছেলেকে আদর করে ইরার কোলে দেয়। প্লাবনের চোখেও জল গড়িয়ে পরছে।
যাওয়ার সময় অভি বলে আমি আপনি ও আপনার কাছে চিরঋণী হলাম। যদিও এ ঋণ শোধ করার সাধ্য আমার নাই তবুও আপনাদের কাছে থাকার সুযোগটুকু চাইছি।
এবার প্লাবনের সোজাসুজি জবাব ,আমি বন জঙ্গলের মানুষ তাই আজকের পরে আর যোগাযোগ রাখতে চাইনা তবে ছেলেকে দেখতে আসবো। আপনারা ভালো থাকুন।
এবার ইরা কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে বলে আমার ছেলের পুনর্জন্মের জন্য চিরকৃতজ্ঞ রইলাম।অভিও প্লাবনের কাছে সীমাহীন কৃতজ্ঞতা জানিয়ে চলে যায়।
অহনা ছাদে দাঁড়িয়ে ছেলের চলে যাওয়া দেখে সহ্য করতে পারছেনা। ছেলেটা বারবার মা মা বলে কাঁদছে। কান্না করতে করতে অহনা দৌঁড়ে রুমে চলে আসে।
সেই সকালে নাস্তা করেছে এখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেছে কেউ কিছু খায়নি। কিন্তু প্লাবন অসুস্থ ওকে না খাইয়ে রাখা কি ঠিক হলো?
এমন সময় প্লাবন অহনাকে বলে চলো বাইরে থেকে ঘুরে আসি।
এই শরীরে কোথায় যাবে?
চলো কাছাকাছি কোনো রেল ষ্টেশন থাকলে সেখানে যাবো।
দুজনেই রেডি হয়ে কাছাকাছি একটা রেল ষ্টেশনের কাছে খোলা জায়গায় গিয়ে বসে। অহনাও বাইরে এসে হালকা বোধ করতেছে।
রেললাইন ধরে দুজনে হাত ধরে হাঁটতে থাকে। অহনা বলে ওঠে এমনই একটা জায়গায় আমার পুনর্জন্ম হয়েছিলো। আর আমার নতুন জীবন তুমি দিয়েছিলে। আমি বারবার তোমার জন্যই জন্ম নিতে চাই।
এই যে মেডাম জন্ম দেয়ার মালিক আল্লাহ। আমি শুধু কর্তব্য পালন করেছি আর সে কথা বলতে গেলে তুমিই আমার পুনর্জন্ম দিয়েছো।
আজ ডাঃ রিনি আমাকে সব বলেছেন । তুমি নিজের লিভার দিয়ে আমার প্রাণ বাঁচিয়েছো। তোমার এই ঋণ আমি কিরে শোধ করব?
অহনা এবার প্লাবনের বুকে মাথা রেখে বলে আমায় শুধু ভালোবেসো। আমাদের এই পুনর্জন্মে আমরা যেনো আজীবন এক হয়ে থাকি। তোমাতে নিজেকে সঁপে দিলাম চিরতরে।
এমন সময় ট্রেনের হুইসেল বেজে উঠে আর তখন প্লাবনে অহনাকে নিয়ে রেললাইন থেকে দূরে সরে দাঁড়ায়। গোধূলির রাঙা আলোয় দুজন আলিঙ্গনে বেঁধেছে ,আত্মার আত্মার সাথে মিলন দেহের সাথে দেহের এ যেনো স্বর্গীয় এক উপাখ্যানের সুচনা।






