মেঘকে ওর বাবা নিয়ে যাবার পরই রনিদের বাড়ি থানা থেকে পুলিশ এসে রনি আর রোদ্দুরকে নিয়ে যায়। রনির মা থানায় এসে ওদেরকে নিয়ে আসার কারণ জিজ্ঞেস করলে বলে এরা নারী পাচারকারীর দলের লোক। আমাদের কাছে ইনফরমেশন আছে। ওদের ফোনও নিয়ে সুইচ অফ করে দেয়।
পরের দিন কোর্টে জামিনের আবেদন করলে রনিকে ছেড়ে দেয় কিন্তু রোদ্দুরকে আটকে রাখে। রনি বের হয়ে মেঘের ফোনে কল করে সুইচ অফ পায়।
এক সপ্তাহ সিলেট কারাগারে আটকে রাখার পর রোদ্দুরকে ঢাকায় পাঠায়। রোদ্দুরের বাড়িতে এর আগেই রনি খবর পৌঁছে দেয়।প্রথমে ওর বাবা রেগে গেলেও পরে জামিনের জন্য অনেক চেষ্টা করে। প্রায় দুই মাস পরে রোদ্দুর জেল থেকে ছাড়া পায়।
এদিকে রোদ্দুরের রেজাল্ট বের হয়েছে। রেজাল্ট ফার্স্টক্লাস পেয়েছে এবং ডিপার্ট্মেন্টের মধ্যে ৫ম হয়েছে।
রোদ্দুরের ভালো ফলাফলে পরিবারের সবাই ওকে দেশের বাইরে পাঠানোর চিন্তা করে। রোদ্দুর মেঘকে অনেক ভাবে খোঁজ করে কিন্তু ঢাকায় কোত্থাও মেঘের হদিস পায়না। এভাবে তিন মাস পার হয়ে যায়।
একসময় রোদ্দুর ভাবে মেঘকে হয়তো ওর বাবা দেশের বাইরে পাঠিয়েছে। মেঘের জন্য রোদ্দুরের বুকের ভিতর কষ্টের পাহাড় জমা হতে থাকে। সারাদিন চুপচাপ ঘরে বসে থাকে।
রোদ্দুর কানাডা যাওয়ার জন্য স্কলারশিপ পায় কিন্তু ওদের অর্থনৈতিক অবস্থা তেমন ভালো না। ওর বাবা আত্মীয় স্বজনদের কাছ থেকে ধার করে ছেলেকে উচ্চ শিক্ষার জন্য কানাডা পাঠানোর সব ব্যবস্থা করে ফেলে।
কানাডা যাবার আগে রনিদের বাড়ি রনি ও ওর মায়ের সাথে দেখা করতে যায়। সেখানে গিয়ে মেঘের সব স্মৃতি মনে পড়ে বারবার। রনির মাও রোদ্দুরের কষ্ট বুঝে। ভারাক্রান্ত হৃদয় আর অশ্রুসজল চোখে রনিদের কাছ থেকে বিদায় নেয়।
আগামীকাল রাতে রোদ্দুরের ফ্লাইট তাই আজ বন্ধুদের সাথে ভার্সিটিতে কিছুটা সময় কাটায়।রাতে মাকে জড়িয়ে ধরে অনেক কান্না করে। মাকে বলে , মা আমি যদি না ফিরি তাহলে আমায় ক্ষমা করে দিও।
কেন ফিরবি না বাবা? আমি যে তোর ফেরার অপেক্ষায় থাকব। তুই আমার ছোটো ছেলে তোকে ছাড়া আমি করে থাকব?
মা আমি যে একজনকে হারিয়ে ফেলেছি তাকে সারা দুনিয়ায় খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করব।যদি খুঁজে পাই তাহলে ওকে নিয়েই ফিরবো।
বাবা আল্লাহর উপর ভরসা রাখো। পড়াশোনা শেষ করে মায়ের ছেলে মায়ের বুকে ফিরে আসবে ইনশাআল্লাহ।
রাত ১২ টার ফ্লাইটে রোদ্দুর কানাডা চলে গেলো।যে রোদ্দুর কি না বিদেশে যাবার কথা শুনতেই পারতো না সে আজ দূর প্রবাসে চলে গেলো। এক বুক কষ্ট আর প্রিয়জন হারানোর বেদনা নিয়ে আজ দূরে বহুদূরে।
এদিকে মেঘ এই দুই মাসে খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে শারীরিক ও মানসিক ভাবে ভীষণ বিপর্যস্ত হয়ে গেছে।
বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে আর এসময়ে মেঘ বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। হটাৎ করে বেসিনের কাছে এসে বমি করে। আজ সকাল থেকেই গা গোলাচ্ছে আর বমি বমি ভাব ছিলো। আর এখন বমি হয়ে গেলো। মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করছে। হাতমুখে পানি দিয়ে মেঘ আবার বারান্দায় আসে। ইস আবারও বমি হয়ে গেলো।
মেঘের মা রুম থেকে মেঘকে বারবার বেসিনে যেতে দেখে চলে আসে।
কিরে মা কি হয়েছে?
না মা কিছু হয়নি। বমি হলো আর মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করছে। একটু পরে ঠিক হয়ে যাবে। এ কথা বলার পর আবারও বমি এলো কিন্তু এখন আর পেটে কিছু নাই তাই কষ্ট হচ্ছে।
সীমা তাড়াতাড়ি মেয়েকে বিছানায় শুইয়ে দিলো।
ডা: ইলাকে ফোন দিয়ে বাসায় আসতে বললো।
ডা: ইলা এসে মেঘকে দেখেই সীমাকে বলে আপা মেয়ের মনে হয় সুখবর আছে। ও সম্ভবত মা হতে চলেছে।
আমি কিছু টেস্ট দিচ্ছি এগুলো করিয়ে রিপোর্ট দেখে ঔষধ দিবো। আপাতত বমির ঔষধ দিচ্ছি।
ডাক্তারের কথায় মেঘের ভিতরে এক ভালোলাগা কাজ করছে কিন্তু মেঘের মায়ের মুখটা কালো হয়ে গেছে।
মেঘের ইউরিন সহ অন্যান্য টেস্ট করে ডাক্তার নিশ্চিত করলেন যে মেঘ অন্ত:সত্তা।
মেঘ মা হবার খবরে আলহামদুলিল্লাহ বলে আল্লাহর কাছে শোকর আদায়। আজ এই খবরটা যদি রোদ্দুর জানতো তাহলে কি ও খুশি হতো?
বাসায় ফিরে মেঘ রোদ্দুরের জন্য হাউমাউ করে কাঁদে।
এদিকে সীমা বেগম দুশ্চিন্তায় চুপ হয়ে গেছে। কিভাবে রাকিব সাহেবকে ফোন করবে বুঝতে পারছে না। যেখানে মেঘকে বিয়ে দেবার জন্য পাত্র খুঁজছে আর সেখানে মেয়ে প্রেগন্যান্ট। সোসাইটিতে কিভাবে মুখ দেখাবে সে নিয়েই ভাবনায় ডুব দেয় সীমা বেগম।
রাতে রাকিব সাহেব ফেরার পর সব খুলে বলে।
রাকিব সাহেব স্ত্রীকে বলেন, এ বাচ্চা রাখা যাবেনা। যতো তাড়াতাড়ি পারো এবরশন করার ব্যবস্থা করো। আগামীকালই ওকে কোনো ক্লিনিকে নিয়ে এবরশন করিয়ে আনো।
এটা কি বলছো? খুন করবে? জীব হত্যা মহাপাপ।
খুন বলছো কেন? এ বাচ্চার বাবাকে কি মেনে নেয়া যাবে? সমাজে মুখ দেখাবো কি করে?
বরং বাচ্চাটা নষ্ট করলে ওকে আবার বিয়ে দিতে পারব
তুমি আমি বললে তো হবে না। মেঘ রাজি না থাকলে এবরশন করা যাবে না। ও কিছুতেই রাজি হবে না।
পরের দিন সকাল বেলায় সীমা বেগম চেক আপের কথা বলে মেঘকে একটা ক্লিনিকে নিয়ে যায়।
ক্লিনিকের ডাক্তারের সাথে রাকিব সাহেব ফোনে আগেই কথা বলেছে। ডাক্তার অবশ্য রাকিব সাহেবকে বলেছে এমন পাপের কাজ তিনি করতে পারবেন না। তাই ঐ ক্লিনিকের এক নার্সকে টাকার লোভ দেখিয়ে রাজি করিয়েছে। এখন মেঘ রাজি থাকলেই ভালোভাবে জঞ্জাল পরিষ্কার করা যাবে।
ক্লিনিকে ঢুকে ডাক্তারের চেম্বারে না গিয়ে যখন ওর মা ওকে নার্সদের রুমের দিকে যায় তখনই মেঘ মাকে বলে মা ওটা তো নার্সেস রুম।
হ্যাঁ মা আমি জানি, চল আগে ওখানে যাই পরে ডাক্তারের কাছে যাব। এখানকার এক নার্স তোর বাবার পরিচিত তাই উনাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাবো। মেয়ের কাছে মিথ্যে বলতে একটুও ভালো লাগছে না কিন্তু স্বামীর হুকুম তাই বলতে হচ্ছে।
নার্স নীলা ওদের দেখেই রুম থেকে বেরিয়ে আসে। ও আপনারা চলে এসেছেন। চলেন জায়গামতো যাই। এই কথা বলে উনি উনার বাসায় নিয়ে যায়। এটা ক্লিনিকের কোয়ার্টার আর আমি এখানেই থাকি।
কোনো ভয় নাই আমি খুব সাবধানে ও গোপনে কাজ করব। ২/৩ ঘণ্টা বিশ্রাম নিয়েই যেতে পারবেন। মেঘের বাবা নার্সকে বলেনি যে তার মেয়ে জানেনা। কারণ একথা জানলে নার্স মেঘের এবরশন করবে না।
নীলার কথায় মেঘ ওর মাকে বলে মা উনি কাজ করবেন যা সাবধানে ও গোপনে। আর আমাকে।কেন ২/৩ ঘণ্টা এখানে বিশ্রাম নিতে হবে? পাশের রুমা থেকে নীলা সব যন্ত্রপাতি নিয়ে মেঘের কাছে বসে বলে আপনি কি আমার কাছে এবরশন করতে ভয় পাচ্ছেন?
এবরশন?আমি এবরশন করাবো কেন? আমি তো অন্যায় করিনি।আমার হাসবেন্ড এখন এখানে নাই কিন্তু সেতো একদিন ফিরবে। আমি আমার ভালোবাসার চিহ্ন মুছবো কেন?
মা উনি এসব কি বলছেন? তোমরা আমার সন্তানকে খুন করতে চাইছো? এরকম যদি করো তাহলে আমি কিন্তু বাসা থেকে চলে যাবো। আমি আর এক সেকেণ্ডও এখানে থাকবো না। এ কথা বলেই মেঘ রুম থেকে বাইরে আসে। ওর মা ওকে বলে যে ওর বাবা সব করেছে।
সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে মেঘ মাথা ঘুরে পরে যাবার সময় ওর মা ধরে ফেলে। এবং তাড়াতাড়ি ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায়। ডাক্তার মেঘকে দেখে কিছু ঔষধ লিখে দেয়। ওর মাকে বলে আপনার মেয়ে অনেক দুর্বল তাই ওকে খুব যত্নে রাখতে হবে। বেশি বেশি শাকসবজি ফলমূল খাওয়াতে হবে।
মেঘ বাড়িতে এসেই নিজের রুমে চুপচাপ শুয়ে আছে। কোনো কথা বলছে না। বারবার মনে হচ্ছে আমার বাবা মা খুনি? নিজেকে খুব অসহায় লাগছে। বাবা আমার সাথে এমন করতে পারলো? আর মা সে কিভাবে বাবার কথায় এতো বড়ো অন্যায় করতে যাচ্ছিল।
এমন সময় মেঘের মা মেয়ের জন্য স্যুপ নিয়ে আসে। এখন স্যুপ খেয়ে নে।
আমি কিচ্ছু খাবো না। তুমি যাও আমাকে একা থাকতে দাও।
আজ থেকে তোকে আর তোর সন্তানকে রক্ষা করার দায়িত্ব আমার। আমি আর কারোর কথায় কোনো অন্যায় করবো না করতেও দিবো না। এখন লক্ষী মেয়ের মতো খেয়ে নে। ডাক্তার বলেছে না প্রচুর খেতে হবে।আমার মেয়ে সুস্থ সন্তান জন্ম দিবে। আমি সারাক্ষণ তোকে আগলে রাখবো মা।
মায়ের কথায় মেঘ মায়ের বুকে মুখ লুকোয় আর মাও মেয়ে কে জড়িয়ে চোখের জল ফেলে।
রাতে রাকিব সাহেব ফিরে স্ত্রীর সাথে তর্কে জড়ালেও মেঘের জন্য ওর মা শক্ত অবস্থান নেয়।
ধীরে ধীরে মেঘের ডেলিভারি হওয়ায় সময় ঘনিয়ে আসে। রোদ্দুরের বাড়ির ঠিকানায় মেঘ অনেক চিঠি দিয়েও কোনো উত্তর পায়নি।যতই সময় গড়াচ্ছে মেঘ ততই টেনশনের মধ্যে দিন পার করছে। মেঘের পড়াশোনা বন্ধুবান্ধব কিছুর সাথেই আর সম্পর্ক নেই। রোদ্দুরের সাথে যোগাযোগ করার আর কোনো পথ খুঁজে পায়না।
শুধু রোদ্দুরদের সায়েদাবাদের বাসার নাম্বার জানা ছিলো আর সেই ঠিকানায় বারবার চিঠি পোস্ট করেও কোনো উত্তর আসেনি। মেঘ এখন শুধু তার অনাগত সন্তানের কথা ভাবে।
ভোর হতেই মেঘকে বাসার কাছেই একটা ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়। সকাল ১০ টায় মেঘের ফুটফুটে এক কন্যা সন্তানের জন্ম হয়। মেঘের মা নাতনিকে পেয়ে খুব খুশি।মেঘের বাবাকে ফোনে নাতনি হবার খবর দিলে তিনি রেগে যান। এদিকে মেঘ এখনো ওটিতে। দুপুরে মেঘকে কেবিনে দেয় আর তখন সীমা বেগম মেঘের কোলে মেয়েকে দেয়।
মেয়েকে স্পর্শ করে মেঘের দুচোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পরে। আজ রোদ্দুরের কথা আরও বেশি মনে পড়ছে। মেয়েটা দেখতে ঠিক রোদ্দুরের মতো হয়েছে। এক সপ্তাহ পর বাড়ি ফিরে সীমা বেগম নাতনিকে কোলে নিয়ে নিজের ঘরে গেলে রাকিব সাহেব এটাসেটা বলে। একবারের জন্যেও নাতনির দিকে ফিরে তাকায়নি। তাই মেঘের রুমে নিয়ে আসে। মেঘ মেয়ের নাম রাখে রোদেলা।
দেখতে দেখতে রোদেলার দুই বছর হয়ে গেছে। এর মধ্যে রোদ্দুরের আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। মেঘ তার মেয়েকে নিয়ে সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকলেও মনের ভিতরে এক শূন্যতায় মনমরা হয়ে থাকে। ধীরে ধীরে রাকিব সাহেবও নাতনির সাথে সখ্যতা গড়ে তুলেন। ভালোই কাটছিলো ওদের জীবন।






