আজিজুন নাহার আঁখি

পুনর্জন্ম পর্ব ৩

বাংলোর কাছেই বাগানের সামনে খোলা জায়গা ঠিক করা হলো।

প্লাবন বিকেলে অহনাকে নিয়ে কিছু বই খাতা কলম, চক,ডাস্টার,বোর্ড, পেন্সিল,ইরেজার এসব কিনে আনলো।

সকাল ৮ টায় ছোট্ট সোনামণিদের কলরবে মুখরিত।

প্রথম দিনেই অহনাকে সবাই খুব পছন্দ করেছে। আর অহনাও ওদেরকে পেয়ে প্রাণ ফিরে পেয়েছে।

প্লাবনের কথাবার্তা চালচলন অহনাকে মুগ্ধ করছে। মাঝে মাঝে প্লাবনের কাছে ইরার কথা জিজ্ঞেস করতে গিয়েও থেমে যায়।

নিজ থেকে প্লাবন বললে বলবে না বললে থাক। ইরার কথা বলায় যদি প্লাবন কষ্ট পায়। যেমন অভির নাম শুনলেই বুকের মধ্যে মোচড় দিয়ে উঠে। যে অভিকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করতাম সেই কিনা আমাকে রাস্তায় ফেলে দিলো।

অভি তো জানতোই যে আমার মা নাই সৎ মায়ের কাছ থেকে বের হলে আর ফেরার উপায় নাই। তবুও কেনো এমন করলো???

অনেক বার ভেবেছি অভির কথা ভাববো না তবুও মনে পড়ে।

অহনা তার ছোট্ট ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে বেশ আছে। এখন আর তেমন মন খারাপ হয়না। এভাবে ছয় মাস পার হয়ে গেলো।

প্লাবন অফিসে গিয়ে প্রতিদিনই ভাবে অহনাকে অভির বিষয়ে জিজ্ঞেস করবে কিন্তু যদি অহনা কষ্ট পায় তাই আর বলা হয়নি।

এই ছয় মাসে অহনাকে যতটা দেখেছে তাকে খুব শান্তশিষ্ট মনে হয়েছে। অহনাকে দেখে যে কেউ প্রেমে পড়বে আর অভি সাহেব কি না হেলায় হারালেন।

আচ্ছা ইরা কি আমায় ভুলে গেছে? আমি তো ভুলতে পারিনি। কেনো যে বড়ো লোকের মেয়েকে ভালোবেসেছিলাম ——

যে নাই তার কথা আর ভাববো না কিন্তু মনে আসবেই। মনটাকে এবার সার্ফ এক্সেল দিয়ে ধুয়ে পরিষ্কার করতে হবে।

হটাৎ রুস্তম আলীর ডাক স্যার একটা কথা বলতাম।

জরুরি থাকলে বলো নইলে পরে শুনব।

স্যার জরুরি কথাই তো।

ঠিক আছে বলো কি এতো জরুরি কথা

স্যার ইরা ভাবী তো আপনেরে ঠকাইছে তার কথা আর কোনোদিন বলুম না।

এইটা তোমার জরুরি?

না মানে স্যার আপনি অহনা মেডামরে বিয়া করেন।

এসব কথা মাথায় এলো কিভাবে?

অহনা আমার আশ্রিতা তাই তাকে সম্মান দিয়ে রাখা তোমার আমার জন্য কর্তব্য।

এসব কথা কিন্তু ভুলেও অহনা মেডামের কানে যেনো না যায়।

বাগানের সবাই তো বলাবলি করছে। সবাই অহনা মেডামকে পছন্দ করে তাই—-

আমি আপাতত বিয়ে নিয়ে ভাবছি না। আর অহনা মেডাম নিজ থেকে চলে যেতে চাইলে উনাকে গন্তব্যে পৌঁছে দেবার দায়িত্ব আমার।

অহনা আর প্লাবন দুজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে ওঠে। কিন্তু সেই বন্ধুত্ব কি পরিণয়ে রূপান্তর হবে কি না এখনো রহস্যের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে।
দেখতে দেখতে এক বছর হয়ে গেছে অহনা আর প্লাবনের পরিচয়। এরই মাঝে আপনি থেকে তুমি সম্বোধন করে একে অপরকে। দুজন দুজনের প্রতি যেমন আন্তরিক তেমন দায়িত্বশীল। বাগানের সবাই ওদেরকে অনেক পছন্দ করে ভালোবাসে।

গোধূলির আলোয় অহনা বেশিরভাগ সময় ছাদে থাকে আর প্লাবনও কাজ শেষে সন্ধ্যার চা নাস্তা ছাদেই করে।আজ ফেরার সময় গরম গরম সিঙ্গারা আর পেয়াজু নিয়ে আসছে। কিন্তু ছাদে গিয়ে তো অবাক। অহনাকে ছাদে দেখতে না পেয়ে রুস্তম আলীকে ডেকে জিজ্ঞেস করে।

স্যার অহনা মেডামের শরীরটা মনে হয় খারাপ তাই অবেলায় শুয়ে আছে।

আচ্ছা তুমি আমাকে জানাবে না?

হেনা আছে তাই আপনেরে বলি নাই।

কি রে হেনা আসব? আসেন ভাইজান। দেখেন আপামণি জ্বরে গা পুড়তেছে কিন্তু মাথায় পানি ঢালতে দিতেছে না।

যা তুই পানি নিয়ে আয়। থার্মোমিটার দিয়ে জ্বর মেপে দেখে ১০৩। অনেকক্ষণ মাথায় পানি ঢালার পর জ্বর একটু কমছে।

হেনা যা তো লেবু চা করে আন।

আমি খেতে পারব না।

কোনো না বলা যাবে না। এখানে ঝাল পেয়াজু আর সিঙ্গারা আছে একটু খেয়ে ঔষধ খেতে হবে। প্লাবনের কড়া শাসনে একটু খাবার খেয়ে ঔষধ খেয়ে নিলো।

সব খেয়েছি, খুশি হয়েছ এবার?

সুস্থ থাকলেই খুশি।

অহনার একটু অসুস্থতায় প্লাবন ভীষণ অস্থির হয়ে যায়।

২/৩ দিন বিশ্রাম নেয়ার পর অহনা সুস্থ হয়ে উঠে।

দুইজন মানুষ একে অপরের প্রতি যথেষ্ট আন্তরিক ও দায়িত্বশীল কিন্তু তারপরও যে কেনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিচ্ছে না। দেড়বছরের মতো সময় পাশাপাশি আছে কিন্তু কেউ কাউকে ভালোবাসিও বলছে না আবার ছেড়েও যাচ্ছে না। অদ্ভুত সম্পর্ক এদের।

Leave a Comment