আজিজুন নাহার আঁখি

পুনর্জন্ম পর্ব ২

অহনা কোথায় যাওয়া যায় বলুন তো?

আপনি কোথায় যাবেন আমি কি করে বলবো?

আমি তো আপনাকে নিয়েই যাবো। হয় আপনি বাড়ি যাবেন নয়তো আমার সাথে। আর যেখানেই যান না কেন এই অধম যে আপনাকে একা ছাড়বে না।

না আমি কিছুতেই বাড়ি ফিরব না।

শুনুন অহনা একটা সিদ্ধান্তে আসি , যে ট্রেনটা আগে ছাড়বে আমরা সেই ট্রেনেই উঠবো। ট্রেন যতদূর যায় আমরাও ততদূর——

ঠিক আছে।

প্লাবনের সাথে আলাপনে অভির প্রতি অভিমান কিছুটা হলেও ভুলেছে।

আচ্ছা অহনা বলুন তো আপনি কেন এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন? আপনাকে দেখে তো ভদ্র পরিবারের সুশিক্ষিত মনে হয়।

হ্যাঁ আমার পরিবার ভদ্র কিন্তু আমি নই।

একজন প্রতারকের উপর অভিমান করে মৃত্যকে আলিঙ্গন করতে চেয়েছি।

হুম বুঝতে পারছি।

অহনার অশ্রুসজল চোখে অনেক ব্যথা তা স্পষ্ট তাই আর কোনো কথা জিজ্ঞেস করলো না।

আপনি কেন এ হীন কাজ করতে চেয়েছেন?

সে অনেক কথা। যেহেতু কাজটা হলো না তাই এ বিষয়ে আর কথা নয়।আমি একজন ব্যর্থ মানুষ তাই আমার পাশে কেউ থাকতে চায় না। আর ব্যর্থতার গ্লানি থেকে নিজেকে মুক্তি দিতে চাই। জানিনা কতদিন জীবনযুদ্ধে টিকে থাকব?

আচ্ছা আপনার তো খিদে পেয়েছে চলুন ঐ রেস্টুরেন্টে গিয়ে কিছু খেয়ে নেই।

না আমি খাব না,আপনি খান।

ঠিক আছে মেডাম আমি বরং কিছু কিনে আনি।

প্লাবন রুটি কলা,ডিম সিদ্ধ আর পানি কিনে আনলো। অনেক অনুরোধ করায় অহনা একটু খেলো।

ট্রেন আসতে আসতে ওরা দুজনে নিজেদের মধ্যে অনেক কথার লেনদেন করলো।

এবার অহনাকে নিয়ে ট্রেনে গিয়ে বসলো।

ট্রেনের মধ্যে অহনা বেশ চুপচাপ ছিলো। তাই প্লাবনও অহনাকে কিছু জিজ্ঞেস করেনি।

বেলা ১২ টায় ওরা ট্রেন থেকে নেমে একটা অটোতে উঠলো।

অহনা যেনো আর নিজের মধ্যে নেই। একটা ঘোরের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না। কয়েক ঘণ্টার আলাপে প্লাবনের প্রতি অগাধ বিশ্বাস আর নির্ভরতা তৈরি হয়েছে।

পাহাড়ি রাস্তা তাই মাঝে ঝাকুনি দিচ্ছে। কিছুটা পথ যাবার পরই সামনে ফরেস্ট অফিসের সামনে এসে অটো থামলো।

একজন দৌড়ে এসে প্লাবনকে সালাম দিয়ে ব্যাগ কাঁধে তুলে নিলো।

স্যার ইরা ভাবী কই? একে তো চিনলাম না।

এই ইরা তোমার ভাবী হলো কবে?

ইরা ভাবীর সাথে আপনিই তো মোবাইলে কথা বলাতেন আর এবার তো ভাবীকে নিয়েই ফেরার কথা।

রুস্তম আলী শোনো তোমার ইরা ভাবী এখন অন্য কারোর বউ। সে আর কখনো আসবে না।

কি বলেন ভাই? সে হতেই পারে না।

ইরা এই বন জঙ্গলে থাকবে না তাই শহরের নামী দামী মানুষের সাথে নিজেকে জড়িয়েছে।

রুস্তম আলী তুমি কি বকবক করবে না কি ভেতরে নিয়ে যাবে?

আচ্ছা স্যার ইনি কি নতুন ভাবী।

কথাটায় অহনার ভেতরে নাড়া দিলো। সত্যিই তো কোন পরিচয়ে প্লাবনের সাথে থাকবে? এভাবে আসা একদমই ঠিক হয়নি।

ইনি তোমার অহনা মেডাম। আগে আমাদের বিশ্রামের ব্যবস্থা করো আর দ্রুত খাবার দাও।আর শোনো শোনো দোতলার পশ্চিম দিকের গেস্ট রুম মেডামের জন্য গুছিয়ে দাও।

অহনা খুব অস্বস্তি বোধ করছে। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে আর কোথাও যাবার জায়গা নাই। তাই প্লাবনকে ভরসা করে চলে এসেছে।

প্লাবন ফরেস্টে কাজ করছে প্রায় ৫ বছর। বাবা মা কেউ নাই। বড়ো ভাইয়ের সাথে বছরে ২/ ১ বার দেখা হয়। ইরাকে বিয়ে করার জন্য এবার সে বাড়িতে গিয়েছিলো। কিন্তু ইরা যে এভাবে বদলে যাবে তা সে কল্পনাও করেনি। ইরার প্রতি এতোই দুর্বলতা যার জন্য অভিমানে মরতে গিয়েছিলো।যে ইরা তার জন্য উদগ্রীব ছিলো আজ সেই ইরা বন্য পশু বলে তাকে প্রত্যাখান করলো।

নতুন জায়গা নতুন পরিবেশ তাই অহনার ভালো লাগছে না। সারারাত না ঘুমিয়েই পার করেছে।

ভোর বেলায় একটু ঘুম আসছিলো আর তখন রুস্তম আলীর ডাকে উঠে পড়ে।

প্লাবন নাস্তা নিয়ে অহনার জন্য ওয়েট করছিলো। অহনাকে নিয়ে সকালের নাস্তা খেয়ে বাইরে বেরুতে চায়। কিন্তু অহনার আপত্তিতে আর যাওয়া হয় না।

প্লাবন কাজে চলে যায়। যাবার সময় রুস্তম আলীকে বলে যায় ওর মেয়ে হেনা যেনো অহনাকে সময় দেয়।

হেনার সরলতা অহনার খুব ভালো লাগে। হেনা মাঝে মাঝে অহনাকে বাইরে ঘুরতে নিয়ে যায়। কিন্তু অহনার যেনো কোনো কিছুতেই প্রশান্তি আসে না।

প্লাবন রিসোর্টে ফিরে অহনাকে হেনার সাথে ছাদে দেখতে পেয়ে ওখানে চলে যায়।

এবার হেনা বিদায় নেয়। অহনার কাজ ছাড়া এভাবে বসে থাকতে আর ভালো লাগছে না।

খেতে বসে প্লাবনকে বলে শুনুন মি: প্লাবন আমাকে কোনো কাজের ব্যবস্থা করে দিতে পারবেন? এভাবে আর ভালো লাগছে না।

হ্যাঁ আমিও ভেবেছি আপনার জন্য কিছু ব্যবস্থা করতে হবে।

আপনি আমাদের বাগানের শ্রমিকদের বাচ্চাদের পড়াশোনা করাতে পারবেন?

হ্যাঁ অবশ্যই পারবো।

ঠিক আছে আমি আগামীকাল সবার সাথে কথা বলে সময় আর জায়গা ঠিক করি।

অহনা এখানে কোনো সমস্যা হচ্ছে না তো?

না, জীবনের পুনরুত্থান এতো সুন্দর হয় সে কি জানা ছিলো?

Leave a Comment