আজিজুন নাহার আঁখি

পুনর্জন্ম পর্ব-১

ষ্টেশনের অদূরে অহনা সেই সকাল ১১ টা থেকে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে কিন্তু অভির কোনো খবর নেই। ভোরবেলা বাড়ি থেকে বের হয়ে সোজা এখানে চলে এসেছে। অভি বলেছিলো যে সে অহনার আগেই উপস্থিত হবে কিন্তু অহনা অভিকে খুঁজে পায়নি।
মুঠোফোনে বারবার কল করার পর শুধু সুইচ অফ বলছে। অহনা এখানে আগে কখনো আসেনি তাই সন্ধ্যা হতে চলেছে দেখে ভয় পাচ্ছে।
ছোটো স্টেশন তা লোকজনের ভীর কম। তবু্ও হটাৎ করে কেউ যদি চিনে ফেলে তাই একটু দূরেই আছে। অহনা অভিকে নিজের থেকেও বিশ্বাস করে তাই সকাল থেকে কোত্থাও যায়নি।

সন্ধ্যা পেরিয়ে রাতের আঁধারে চারিপাশ ঢাকা পরছে। একা নির্জনে অহনার এখন ভয়ভয় করতেছে। একবার ভাবছে ষ্টেশনে গিয়ে ওয়েট করবে আবার ভাবছে যদি কেউ দেখে ফেলে , যদি বাবাকে বলে দেয় তখন কি হবে? অভির সাথে ৫ বছরের রিলেশন। আর এই ৫ বছরে অভি কখনো অহনাকে মিথ্যে বলেনি। কিন্তু আজ কেন অভি এমন করছে।
অভির জন্য অহনার দুশ্চিন্তা হচ্ছে।আবার একা একা ভয়ও করছে। বারবার মোবাইলে অভিকে কল করছে কিন্তু অভির ফোন সুইচ অফ বলছে। অহনা তার হাতের ব্যাগটি মাটিতে রেখে নিজেও মাটিতে বসে পড়ল। আর এমন সময় মোবাইলে মেসেজ টোন বেজে উঠলো। অভি মেসেজ দিয়েছে সরি অহনা আমাকে ক্ষমা করে দিও প্লিজ। আমি তোমাকে দেয়া কথা রাখতে পারলাম না। তুমি বাড়ি চলে যাও হয়তো আর কোনদিন তোমার সাথে দেখা হবে না। ক্ষমা করে দিও প্লিজ। অহনা অভির মেসেজ পড়ে অবাক হচ্ছে। অভি তুমি এমন করলে কেন? এখন আমি কি করব? বাড়িতে ফিরে যাবার মুখ নেই।

অহনা আপন মনে বলছে পরিবারের সম্মান নষ্ট করে শুধু তোমাকে ভালোবেসে আজ এখানে অপেক্ষা করছি আর তুমি কিনা আমাকে ফিরে যেতে বলছো।
হ্যাঁ অভি আমি ফিরে যাবো তবে বাড়িতে নয়।আমি মৃত্যুকে আলিঙ্গন করব। এই জীবন আমি রাখব না। এসব ভাবতে ভাবতে অহনা রেললাইন ধরে হাঁটতে থাকলো। অহনার জীবনের প্রতি আর কোনো মায়া কাজ করছে না। হাঁটতে হাঁটতে ষ্টেশন থেকে অনেকটা দূরে চলে এসেছে।

অহনার অন্ধকারেও ভয় করছে না আজ ও সব ভয়ভীতির উর্ধ্বে। অভির সাথে অভিমান করে অহনা আত্মহত্যার জন্য রেললাইনের উপর দিয়ে হেঁটে চলছে।অনেক দূর থেকে রেল গাড়ির হুইসেল শোনা যাচ্ছে। হ্যাঁ অহনা ঠিকই শুনেছে। এইতো রেলগাড়ির লাইট দেখা যাচ্ছে। অহনা রেললাইনের পাতের উপর শুয়ে পরলো। দুচোখের পাতা বন্ধ করে শুধু বললো অভি তুমি এমন করলে কেন?

রেলগাড়ি খুব কাছে চলে এসেছে তাই অহনা মৃতের মতোই শুয়ে আছে। আর এমন সময় হটাৎ করে কে যেনো অহনা টান দিয়ে রেললাইনের বাইরে নিয়ে আসে। দ্রুতগামী ট্রেন চলে যাচ্ছে আর অহনাকে শক্ত করে কেউ একজন বুকে জড়িয়ে ধরে আছে।

কে আপনি? আমাকে বাঁচালেন কেন? আমি বাঁচতে চাই না। প্লিজ আমাকে ছেড়ে দিন।
এখন আর মরতে পারবেন না ট্রেন চলে গেছে। এবার চোখ খুলুন।
অহনা চোখ খুলে অন্ধকারে কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। আচ্ছা আপনি আমাকে বাঁচালেন কেন?
চোখের সামনে এভাবে কেউ মরতে চাইলে আপনি কি করতেন?

ঘন বনজঙ্গল দিয়ে ঘেরা চারিপাশ। এতোক্ষণ অহনা হয়তো ঘোরের মধ্যে ছিলো তাই ভয় পায়নি। অহনার বারবার অভির দেয়া মেসেজ মনে পড়ছে। নিজের জীবনের প্রতি আর কোনো।মায়া নেই।
অহনা কি করবে বুঝতে পারছে না। এই ছেলেটির উপর ভীষণ রাগ হচ্ছে , কি দরকার ছিলো আমাকে বাঁচানোর?
আচ্ছা মেডাম আপনি মরবেন ভালো কথা তো আমার চোখের সামনে আসলেন কেন?
আজকে আপনার জন্যে আমার অনেক বড়ো ক্ষতি হয়ে গেলো।
আমি ক্ষতি করেছি? আমি কি বলেছিলাম আমাকে বাঁচান।
না তা বলেননি কিন্তু কাউকে মরতে দেখলে তাকে কি মরতে দেয়া যায়?
আচ্ছা আমি না হয় মরতে এসেছিলাম কিন্তু এই অন্ধকারে আপনি কি করছিলেন?
ধরে নিন আমিও আপনার মতোই মরতে—-

কি বলছেন এসব?

আমার তো জীবনের প্রতি মায়া নেই কিন্তু আপনি কেন?

সে অনেক কথা—

আচ্ছা আপনার বাড়ির ঠিকানা বলেন আপনাকে পৌঁছে দেই।

আমার বাড়ি ফেরার উপায় বা ইচ্ছা নেই।

কেন? ঝগড়া করে এসেছেন?

না, তবে আর ফিরব না সেটা বলে এসেছি।

তাহলে কোথায় যাবেন?যেহেতু আপাতত মরতে পারছেন না সেহেতু থাকার জায়গা খুঁজে বের করতে হবে।

আমাকে নিয়ে ভাববেন না। আমি কোত্থাও যাব না। আপনি চলে যান। আবার ট্রেন এলে—-

কি মরবেন? সেটা তো হবে না মেডাম।

আমি যেহেতু মরতে পারিনি তাই আর কাউকে মরতে দিব না।

এতোক্ষণ কথা হচ্ছে কিন্তু কেউ কারোর নাম পর্যন্ত জানেনি।

আমি প্লাবন আপনি?

আমি অহনা

আচ্ছা অহনা চলুন আমরা ষ্টেশনের ভেতর যাই।

ওখানে ওয়েটিং রুমে বসে ঠিক করা যাবে কোথায় যাবেন।

না মি: প্লাবন আমি ওখানে যাব না। আপনি যান।এই যে অহনা আপনি চাইলেও আজ আর আত্মহত্যা করতে পারবেন না। অযথা সময় নষ্ট না করে চলুন।

অহনা প্লাবনের কথায় বিরক্ত হলেও অগত্যা উঠে দাঁড়ালো। ঠিক আছে চলুন।

স্টেশনের পাশে ছোট্ট চায়ের দোকানে দুজন চা পান করলো।

রাত ২টা বাজে আর সাড়ে তিন টার আগে কোনো ট্রেন নাই তাই অপেক্ষা করতে হবে।

ওরা ওয়েটিং রুমে না গিয়ে বাইরে বসলো।

Leave a Comment