আজিজুন নাহার আঁখি

আজ মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমে অনন্যা ম্যাম ক্লাস নিবেন তাই শিক্ষার্থীদের মাঝে প্রচুর আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। সকলে আগে থেকেই সুশৃঙ্খল ভাবে শ্রেণিকক্ষে বসে আছে।

ম্যাম রুমে প্রবেশ করার সাথে সাথে সবাই দাঁড়িয়ে ম্যামকে সালাম দিলো। ম্যাম সালামের জবাব দিয়ে সকলের সাথে কুশল বিনিময় করলেন।
ম্যাম ল্যাপটপ অন করে প্রজেক্টের কানেক্ট করে ভিডিও অন করে স্ক্রিনে
” নিজের হাতে কাজ করো কাজতো ঘৃণার নয়
কাজের মাঝে হয় মানুষের সত্য পরিচয়”
এই গানটি ডিসপ্লে করলেন। গানের সাথে অনন্যা ম্যাম ও শিক্ষার্থীরাও গাইতে থাকে।

গান শেষ হলে প্রজেক্টর অফ করে ম্যাম সবাইকে জিজ্ঞেস করেন, আচ্ছা সোনা মণিরা গানটা কেমন লেগেছে?

সবাই বলে উঠল ম্যাম খুব ভালো লেগেছে আর এই গান তো আপনিই শিখিয়েছিলেন।

রিমা দাঁড়িয়ে বলে ম্যাম আপনি একটা গান শোনান প্লিজ।

এখন না ক্লাসের শেষে সময় থাকলে শোনাব। এখন আমরা কাজে আসি কেমন?

সবাই বলে উঠলো জি ম্যাম।

মিস অনন্যা সবার উদ্দেশ্যে বললেন, আচ্ছা গত ক্লাসে তো আমরা আমাদের অভিভাবকদের পেশা সম্পর্কে জেনেছি তা কি মনে আছে?

জি ম্যাম।

আচ্ছা তোমরা কি স্ক্রিনে বিভিন্ন পেশার মানুষের ছবি দেখতে চাও?

জি ম্যাম তাড়াতাড়ি দেখান।

মিস অনন্যা স্ক্রিনে ছবি ডিসপ্লে করতে ল্যাপটপ ও প্রজেক্টের অন করলেন।

প্রথমেই স্ক্রিনে একজন বাঙালী কৃষকের ছবি দেখিয়ে সবাইকে জিজ্ঞেস করেন,আচ্ছা তোমরা কি যেনো ইনি কি কাজ করেন?

সব শিক্ষার্থী একসাথে বলে , কৃষি কাজ করেন।

তারপর স্ক্রিনে পর্যায়ক্রমে চিকিৎসক, নার্স, প্রকৌশলী, ঠিকাদার, সমাজপতি,জজ,

শিক্ষক,ইমাম,আইনজীবী,পুলিশ,রাজনীতিবিদ, জনপ্রতিনিধি ,ফুটবলার, ক্রিকেটার, দাবাড়ু,গায়ক,নায়ক,মডেল,সেনাকর্মকর্তা ,

পাইলট,নাবিক,গাড়িচালক,রিক্সাচালক,নৃত্যশিল্পী রাজমিস্ত্রী,কাঠমিস্ত্রি,জেলে,তাতী ,কামার,কুমার,সরকারি কর্মকর্তা , বৈজ্ঞানিক, এনজিও কর্মী,

সাধারণ চাকুরীজীবি ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের পেশার মানুষের ছবি দেখান এবং কোন পেশার কি কাজ সে সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের ধারণা স্পষ্ট করেন।

মাল্টিমিডিয়া ক্লাসে শিক্ষার্থীবৃন্দ মনোযোগ দিয়ে পাঠে সক্রিয় অংশগ্রহণ করে।

এবার ম্যাম বলেন, আচ্ছা এতোক্ষণ যে ছবিগুলো দেখলে তা কেমন লাগলো?

সবাই বলে উঠলো ম্যাম খুব ভালো।

আচ্ছা তোমরা এখন বলতে পারবে তোমাদের জীবনের লক্ষ্য কি? আসলে বড়ো হয়ে তোমরা কে কি হতে চাও?

সবার মুখে চিন্তার রেখা দেখা যাচ্ছে।

এবার ম্যাম বলেন, আচ্ছা ভাববার জন্য দুই মিনিট সময় দিচ্ছি।

ঠিক দুই মিনিট পরে ম্যাম একজন একজন করে সামনে ডেকে এনে জিজ্ঞেস করেন তাদের জীবনের লক্ষ্য কি?

জান্নাত বলে সে বড়ো হয়ে চিকিৎসক হবে। তার দাদু খুব অসুস্থ থাকে তাই সে নিজে চিকিৎসক হয়ে দাদুকে সুস্থ করতে চায়।

মিলন বলে সে ঠিকাদারি করে অনেক অর্থ উপার্জন করবে।

রিশাদ বলে সে পাইলট হয়ে আকাশে উড়ে বেড়াবে।

তানিয়া বলে সে অনন্যা ম্যামের মতো শিক্ষক হয়ে শিক্ষার্থীদের অনেক কিছু শেখাবে।

সবার কথাই ম্যাম মুগ্ধ হয়ে শুনে তাদেরকে করতালির মাধ্যমে অভিবাদন জানায়।

টুটুল বলে সে পুলিশ হতে চায়।

ম্যাম বলে পুলিশ হবে কেন?

পুলিশ হয়ে আমি খারাপ মানুষদের ধরে শাস্তির ব্যবস্থা করতে পারব।

কেউ কেউ জজ আবার কেউ আইনজীবী হতে চায় ন্যায়বিচারের জন্য।

ক্লাসের চঞ্চল যে ছেলেটি দুলাল নাম।ও বড়ো হয়ে নায়ক হতে চায়। এ কথা শুনে ক্লাসে হাসির ফোয়ারা ঝরে।

ম্যাম বলেন এতে হাসির কি আছে? দুলাল নায়ক হতেই পারে।

রিমা বলে ও নৃত্যশিল্পী হতে চায়।

আজকের ক্লাসটা সবাই আন্তরিকতার সাথে সক্রিয় অংশগ্রহণ করছে।

এখনো ২/৩ জন শিক্ষার্থী বাকী আছে।

ম্যাম এক এক করে সবার কথা শুনছেন। একেকজনের একেক ধরনের পেশা পছন্দ আর তাই ওরা পেশা দেখে জীবনের লক্ষ্য কি তা অনায়াসেই বলছে।

পিছনের দিকে বসা নিলয়কে ম্যাম এবার সামনে ডাকলেন।

নিলয় ধীরে ধীরে ম্যামের পাশে এসে দাঁড়ায়।

নিলয় বলো এবার তোমার জীবনের লক্ষ্য কি?

ম্যাম আমার লক্ষ্য একটাই, যে কাজই করিনা কেন পরিবারের সবাইকে যেনো পেট ভরে খাওয়াইতে পারি।

জানেন ম্যাম, আমার মা বাবা নিজেরা না খেয়ে শুধু আমাদের দুই ভাইবোনকে খাওয়ায়।

এইতো সেদিন বাবা বাজার থেকে মাছ নিয়ে এসে মায়ের হাতে দিচ্ছিল আর মা যখন ব্যাগ থেকে মাছ বের করছিলো তখন আমি গুনে দেখেছি ছয় টুকরো মাছ।

আমার বোনটা মাছ ভাত খাবার জন্য মায়ের পিছন পিছন ঘুরতেছিল।আর রান্না হবার পর মা আমাকে আর বোনকে দুই টুকরো মাছ খেতে দেয়।

আবার রাতে যখন খেতে বসি তখনও আমাদের দুইজনকে দুই টুকরো মাছ খেতে দেয়।

মা আর বাবা পরে খেতে বসে।

পরের দিন সকালেও আমাদের দুইজনকে দুই টুকরো মাছে খেতে দেয়।

তখন বুঝিইনি ছয় টুকরো মাছ আমরা খেয়েছি তাহলে বাবা মা কি দিয়ে ভাত খেলো?

ঐ দিন রাতের বেলা বোন যখন আবার মাছ দিয়ে ভাত খেতে চাইল তখন আমি হিসেব করে দেখলাম বাবা মা না খেয়ে আমাদের খাওয়ায়।

নিলয়ের কথাগুলো সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মতো সবাই শুনছে।

আচ্ছা নিলয় তোমার বাবা যেনো কি করেন?

ম্যাম আমার বাবা আগে একটা কারখানায় কাজ করতো আর তখন আমাদের কোনো অভাব ছিলো না। কিন্তু হটাৎ করে মেশিনে বাবার এক্সিডেন্ট হয়। বাবার দুটো পা ও একটা হাত কাটা পরে তখন থেকে বাবা তেমন কাজ করতে পারেনা। এখন বাবা গলির মোড়ে বাদাম বিক্রি করে তাই দিয়ে আমাদের সব কিছু চালাতে হয়।

আচ্ছা তোমার মা কিছু করেন না?

না ম্যাম মা বোবা।বাড়ির সব কাজ করে আর বাবাকে রাস্তার মোড়ে বসিয়ে দেন। আমিও মাকে কাজে সাহায্য করি।

ম্যাম খিদা না লাগলেই তো ভালো হতো। এতো খিদা লাগে কেন?

অনন্যা ম্যাম নিলয়কে মাথায় হাত বুলিয়ে দেন আর ম্যামের আদর পেয়ে নিলয় কেঁদে দেয়।

কেঁদো না বাবা, দেখো একদিন তুমি অনেক বড়ো হবে আর বাবা মায়ের কষ্ট দূর হবে।

ম্যাম আমি বড়ো হয়ে একটা সরকারি চাকরি করতে চাই। যে চাকরি হারাবে না, আমাদের সংসারের অভাব থাকবে না। সবাইকে নিয়ে মাছের তরকারি দিয়ে পেট ভরে ভাত খেতে পারব। আর কিচ্ছু চাইনা।

পেট ভরে খাবার চাই,মায়ের মুখের কথা শোনার জন্য চিকিৎসা করাতে চাই, বাবাকে একটা হুইলচেয়ার কিনে দিতে চাই, বোনকে খুশি রাখতে চাই, সুস্থ সুন্দর পরিবেশে যেনো বেঁচে থাকতে পারি এটাই আমার লক্ষ্য।

এতোক্ষণ নিলয়ের কথা সবাই মন দিয়ে শুনতেছিলো। ম্যামের করতালির সাথে সারা ক্লাসের সবাই করতালি দিয়ে অভিবাদন জানায়।

মিস অনন্যা বিভিন্ন পেশার কাল্পনিক ছবি সম্বলিত ক্যাপ যার যার যে কাজ পছন্দ তার মাথায় পরিয়ে দেন। শিক্ষার্থীরা নিজেদের পছন্দের পেশার ছবিসহ ক্যাপ পরে আনন্দে উদ্বেলিত হয়।

মিস অনন্যা সবাইকে দাঁড়াতে বললে সবাই দাঁড়িয়ে যায়। ম্যাম শিক্ষার্থীদের গ্রুপ ছবি তুলেন ও একক ছবিও তুলেন।

এবার সবাইকে বসতে দিয়ে তিনি বলেন, সুপ্রিয় শিক্ষার্থী, আজকের এই ঘটনা সব সময় স্মরণে রাখবে।আজ আমরা আমাদের জীবনের লক্ষ্য কি তা জানলাম। নিজেদের লক্ষ্যে স্থির থাকবে দেখবে একদিন ঠিকই লক্ষ্যে পৌঁছে গেছো। আজ মন থেকে যা হতে চাও তার জন্য পড়ালেখায় মনোযোগ দিবে। আজকে আমিও জেনে নিলাম তোমাদের এখান থেকে কতো ধরনের মানুষের পরিচয়। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি তোমাদের জীবনের লক্ষ্য অর্জন করে প্রকৃত মানুষ হও। ম্যামকেও সবাই করতালি দিয়ে শুভেচ্ছা জানায় ও ধন্যবাদ জানায়।

** যে কোনো কাজের আগে তার লক্ষ্য স্থির করতে হয়। ছোটোবেলা থেকে শিশুদের মনে ভবিষ্যতে সে কি হতে চায় তা বুঝানো গেলে তাদের জীবনের গতিপথ সুন্দর হয়। তবে লক্ষ্য পূরণে বাঁধা আসতেই পারে তাই বলে চলার গতি স্থির করা যাবেনা। সব বাঁধা বিপত্তি পেরিয়ে জীবনের লক্ষ্যে পৌঁছে যাবার ব্রত রাখতে হবে।

Leave a Comment