বাসর ঘরে মেঘ ফুল বিছানো খাটে বসে আছে। রনি রোদ্দুরকে সেরোয়ানী পরিয়ে বাসর ঘরে নিয়ে আসে। মেঘ লাজুক দৃষ্টিতে একবার তাকিয়ে চোখ নামিয়ে ফেলে। রনি রোদ্দুরকে রেখে চলে যায়।
মেঘ আর রোদ্দুর এক স্বর্গীয় অনুভূতি নিয়ে হাসি খুশিতে রাত কাটায়। মেঘের সৌন্দর্য যেনো আজ আরও বেড়ে গেছে। রোদ্দুরের মনে হচ্ছে এভাবেই যেনো সারাজীবন থাকতে পারি।মেঘ রোদ্দুরের এই প্রেমময় ভালোবাসা দেখে রনির মায়ের মন আনন্দে ভরে যায়।
রোদ্দুর ওর বাড়িতে শুধু মাকে ফোনে জানিয়েছে যে এক বন্ধুর বাড়িতে যাচ্ছে কয়েকদিন পরে বাসায় ফিরবে। মেঘের মাঝে মাঝে বাড়ির জন্য মন খারাপ হয়ে যায়। রোদ্দুর মেঘকে অনেক বার বলেছে চলো তোমার বাড়িতে যাই। আমাকে মেনে না নিলে আমি চলে আসব। তারপর আমি একটা ভালো কাজের ব্যবস্থা করে তোমাকে আনতে যাব। কিন্তু মেঘ রাজী হয় না।
মেঘ ধরে নিয়েছে বাড়ি গেলে মেঘকে আটকে রাখবে তাই সে ফিরবে না। এক মাস পরে ঢাকায় ফিরবে।
সিলেটে বৃষ্টি হয় যখন তখন। আর বৃষ্টিভেজা দুপুরে মেঘ রোদ্দুর স্বর্গীয় আনন্দে মাতোয়ারা। পনেরো দিন পার হয়ে গেছে ওদের বিয়ে হয়েছে। রোদ্দুর মাঝে মাঝে মায়ের সাথে ফোনে কথা বলে কিন্তু বিয়ের কথা বলতে গিয়েও বলতে পারেনি।
রাতে ঘুমানোর আগে রনি আর রোদ্দুর আগামীকাল সকালে ঢাকা ফেরার কথা বলে। রোদ্দুর চলে যাবে একথাটা শুনেই মেঘের চোখ অশ্রুসজল হয়ে উঠে। রাতে রোদ্দুরকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে। রোদ্দুরের আদর সোহাগে মেঘের জীবন আজ পরিপূর্ণ সে কিছুতেই রোদ্দুরকে যেতে দিতে চায় না। কিন্তু এভাবে আর কতোদিন? রেজাল্ট বের হবে অল্প কয়েক দিনের মধ্যে। সারারাত দুজনেই জেগে থাকে। শেষ রাতের দিকে ঘুমিয়েছে। রোদ্দুরের বুকে মাথা রেখেই মেঘ ঘুমিয়ে আছে।
ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতে রনিদের বাসায় কলিং বেলের শব্দে রনির মায়ের ঘুম ভেঙে যায়। মেইন গেট খুলেই এক অপরিচিত ভদ্রলোক আর তার সাথে পাশের বাড়ির মিজান ভাইকে দেখে অবাক হন। উনাদের ঘরে এসে বসতে বলেন। রনির মা মিজান সাহেবকে বলেন ভাই এতো সকালে আমার বাড়ি? আর উনি কে? উনাকে তো চিনলাম না।
রা্কিব সাহেব রনির মায়ের কাছে গিয়ে বলে আমি মেঘের বাবা। রনির মা এ কথা শুনে চমকে উঠে। মিজান সাহেব বলে উনি সব জেনেশুনে এসেছেন। একমাত্র মেয়েকে না পেয়ে উনারা পাগলের মতো খুঁজে বেড়াচ্ছে। রনির মা উনাদের বসতে দিয়ে রনিকে ডেকে সব বলে।
রনি মেঘ আর রোদ্দুরের রুমের বাইরে থেকে আস্তে আস্তে ডাকতে থাকে। সারারাত ওরা দুজনে গল্প করে ভোর রাতের দিকে ঘুমিয়েছে তাই উঠতে দেরি হচ্ছে। রোদ্দুর দরজা খোলা মাত্র রনি ভিতরে ঢুকেই বলে সর্বনাশ হয়ে গেছে দোস্তো। কেন কি হলো?
শোন মেঘের বাবা বসার ঘরে বসে আছেন। উনি মেঘকে নিতে এসেছেন।
কি বলছিস? মেঘের বাবা? উনি কিভাবে এখানে?
আমি কিছু জানিনা মা তোদের ডাকতে বললো। ওদের কথায় মেঘও বিছানায় উঠে বসেছে।
এই কি বলছো? কে এসেছে?
রোদ্দুর মেঘের কাছে গিয়ে বলে তোমার বাবা তোমাকে নিয়ে যেতে এসেছে।
কথাটি শুনে মেঘের মাথায় যেনো বাজ পরলো।অবাক বিষ্ময়ে রনির পানে তাকিয়ে আছে।
কিরে রনি ওরা উঠলো? ওরা ফ্রেস হলে এখানে নিয়ে আয়।
রোদ্দুরের মুখটা শুকনো দেখাচ্ছে। নিজেকে সামলে নিয়ে মেঘের সাথে হাসিখুশি থাকার চেষ্টা করে।
রোদ্দুর আমি যাই, তোরা তাড়াতাড়ি চলে আসিস।
মেঘকে বুকে জড়িয়ে ধরতেই মেঘ হুহু করে কান্না করতে থাকে।
আরে এই পাগলী কাঁদছো কেন? কতোদিন পরে বাবা মায়ের কাছে যাবে এখন তো হাসবে।
আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারব না। তুমিও যাবে না হলে আমি যাব না।
আরে কি বলছো? আমি এখন গেলে ভালো দেখাবে না। আগে একটা কাজ যোগাড় করি তারপর —-
রোদ্দুর আর মেঘ দুজনের তনুমন মিলে মিশে একাকার। চলো লক্ষীটি, ও ঘরে গিয়ে দেখি।
রোদ্দুরের হাতের মুঠোয় নিজের হাত গুজে দেয় মেঘ,আর এভাবে দুজনে হাতে-হাত রেখে বসার ঘরে পৌঁছে।
রাকিব সাহেব মেঘকে দেখেই চোখের জল রাখতে পারছে না। মা মেঘ কাছে আসো মা। এমন করলে কেন?
আমাকে বললেই তো হতো। আমি কি তোমাকে বাঁধা দিতাম? প্লিজ মা চলো বাড়ি চলো। তোমাকে না পেয়ে তোমার মা শয্যাশায়ী।
রোদ্দুরের হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে বাবার কাছে এসে দাঁড়ায়?
কি বললে বাবা? মা অসুস্থ—
হ্যাঁ রে মা সে খাওয়া দাওয়া সব ছেড়ে অসুস্থ হয়ে গেছে।
তোমাকে কাছে পেলে সে ঠিক সুস্থ হয়ে যাবে।
চলো মা তাড়াতাড়ি চলো।
বাবা আমি একা যাবো? রোদ্দুরকে নিবে না?
আরে পাগলী একমাত্র মেয়ের জামাইকে কি এভাবে বাড়ি নেয়া যায়? আগে আমরা বাড়ি ফিরি তারপর ওর বাবা মায়ের সাথে কথা বলে তোমাদের রিসেপশনের দিন ঠিক করব।
বাবার কথায় মেঘের চোখেমুখে আলো খেলে গেলো।
বাবা তুমি একটু বসো আমি আমার জামাকাপড় গুছিয়ে আনি।
আরে এসব জামা কাপড় নিতে হবে না। তোমার জামা কাপড় তো বাসায় আছে আর প্রয়োজনে কিনে দিব। চল তো মা এখন।
বাবা আমি এক্ষুনি আসছি।এই বলেই রুমের দিকে যেতে রোদ্দুরকেও ইশারায় ডাকে।
রোদ্দুরকে জড়িয়ে মেঘ কান্নায় ভেঙে পড়ে। তুমি আমাকে তাড়াতাড়ি নিয়ে আসবে কিন্তু।
রোদ্দুর কি বলবে বুঝতে পারছে না। শুধু আস্তে করে বলে ভালো থেকো, ভুলে যেওনা।
মেঘ ফুপিয়ে ফুপিয়ে কেঁদে দেয়। রোদ্দুর আদর সোহাগে মেঘকে স্বাভাবিক করে বাইরে নিয়ে আসে।
মা তাড়াতাড়ি চল তো।
এদিকে মেঘ রোদ্দুরের হাতের মুঠোয় হাত দিয়ে আছে।কিছুতেই রোদ্দুরকে ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করছে না।
কিন্তু মায়ের অসুস্থতার কথা শুনে শুধু মায়ের জন্য মেঘ বাবার সাথে এগোয়।
গাড়িতে উঠে বারবার পিছনে তাকিয়ে থাকে আর চোখের জলে বুক ভেসে যায়।
গাড়িতে বসে মেঘ আর তেমন কথা বলেনা। গাড়ি ওসমানী বিমানবন্দরে এসে থামে। বাবার সাথে গাড়ি থেকে নেমে বিমানবন্দরে প্রবেশ করে। মেঘ এতোক্ষণ বুঝেনি যে তারা ঢাকা ফিরছে না। বিমানে উঠার পর জানতে পারল ওরা চট্টগ্রাম যাচ্ছে। সারা রাস্তা মেঘ চুপচাপ ছিলো। চট্টগ্রাম পৌঁছে ওদের নতুন বাড়ির দিকে রওনা হয়।
বাবা আমরা এখানে কোথায় যাচ্ছি? এখানে একটা নতুন বাড়ি কিনেছি আর এখন থেকে আমরা এখানেই থাকব। কথাটা শুনে মেঘের বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠে। বাড়ি পৌঁছেই মাকে দেখে জড়িয়ে ধরে। মেয়েকে পেয়ে খুশিতে মায়ের চোখে জল এসে যায়।
এখন খুশি তো ? বলেছিলাম ,না আমি মেঘকে নিয়েই ফিরব। আর কাঁদতে হবেনা আমাদের মেয়ে আমাদের কাছে আছে। যাও যাও ওকে ওর ঘরে নিয়ে যাও।
এই নতুন বাড়ি, নতুন ঘর ,অচেনা জায়গা কোনোকিছুই মেঘের কাছে ভালো লাগছে না। মেঘ বিছানায় বসেই রোদ্দুরকে ফোন দেয় কিন্তু বারবার ফোনের সুইচ অফ শোনায়। মেঘের টেনশন বাড়তে থাকে। রনিকেও ফোনে পায়না তাই কাউকে জানাতে পারেনা যে ও ঢাকা নয় চট্টগ্রাম এসেছে। বিছানায় হেলান দিয়ে থাকতে থাকতে এক সময় ঘুমিয়ে পরে। আর এই সুযোগে মেঘের বাবা মেঘের ফোন নিয়ে যায়।
ঘুম থেকে জেগে মাথার কাছে নতুন ফোন দেখতে পায় কিন্তু ওর ফোন পায়না। মায়ের কাছে জিজ্ঞেস করে জেনে যায় ফোন ওর বাবা নিয়েছে।
মেঘ বাবার কাছে ফোন আনতে গেলে বাবা বলে পুরনো ফোন ফেলে দিয়েছি এখন থেকে নতুন ফোন চালাবে। মেঘ অনেক কষ্ট পেলেও চুপচাপ চলে আসে। রোদ্দুরের বারবার কল করেও না পেয়ে টেনশনে মেঘ মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে যায়।






