আগামীকাল থেকে গ্রীষ্মকালীন অবকাশ তাই শিক্ষার্থীদের মধ্যে আনন্দের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। টিফিন পিরিয়ড শেষে শিক্ষকবৃন্দ যার যার শ্রেণিকক্ষে চলে গেছেন।
আজ সবার প্রিয় অনন্যা ম্যাম হাতে অনেকগুলো আর্ট পেপার নিয়ে ক্লাসে ঢোকা মাত্র শিক্ষার্থীদের চোখেমুখে খুশির রেখা দেখা যাচ্ছে। অনন্যা ম্যামের ক্লাস মানেই নতুন কিছু শেখা যাবে। তাই সব শিক্ষার্থী ম্যামকে অনেক পছন্দ করে।
কুশল বিনিময়ের পরই ম্যাম সবার উদ্দেশ্যে বললেন , আমি তো গতকাল ক্লাসে বলে দিয়েছিলাম রঙ পেন্সিল নিয়ে আসতে, কি তোমরা এনেছো তো?
জি ম্যাম ।
আচ্ছা আজ আমরা পড়াশোনা করার আগে ছবি আঁকলে কেমন হয়?
সবাই একসাথে বলে উঠে হ্যাঁ ভালো হবে, অনেক ভালো হবে।
মিস অনন্যা শিক্ষার্থীদের হাতে এক টুকরো করে আর্ট পেপার দিয়ে বললেন, এখানে সবাই যার যার নিজের ছবি আঁকবে এবং রঙ করবে। দ্বিতীয় বেঞ্চে বসা আবির হাত উঠিয়েছে দেখে ম্যাম জিজ্ঞেস করলেন কি হয়েছে আবির?
ম্যাম আমার রঙ পেন্সিল নাই।আমি শুধু পেন্সিল দিয়ে আঁকি?
দাঁড়াও বাবা আমি তোমাকে রঙ পেন্সিল এনে দিচ্ছি।
সবার হাতে আর্ট পেপার দেবার পরে ম্যাম বলেন,শোনো আমার সোনা মণিরা আর্ট পেপারে নিজেদের ছবি আঁকার সময় তোমার পছন্দের রঙের দিকে খেয়াল রাখবে। সবার ছবি যে সুন্দর হবে তা কিন্তু ঠিক না। যে যেমন পারো তেমন করে নিজেকে ফুটিয়ে তুলবে। তবে ছবি দেখে নিজেদের সম্পর্কে সবার উদ্দেশ্যে বলতে হবে।আজ কোনো চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা হচ্ছে না তাই তোমরা স্বাধীনভাবে ছবি এঁকে আমার কাছে জমা দাও। ছবি আঁকার জন্য দশ মিনিট সময় বরাদ্দ। ঠিক আছে সবাই প্রস্তুত? হ্যাঁ ম্যাম আমরা প্রস্তুত । ওকে আমার প্রিয় শিক্ষার্থীবৃন্দ এখন শুরু করো।
শিক্ষার্থীদের ছবি আঁকা শুরু হয়ে গেছে। ওরা অনেক আগ্রহ নিয়ে ও যত্ন সহকারে নিজেদের ছবি আঁকার চেষ্টা করছে। মিস অনন্যা ঘুরে ঘুরে শিক্ষার্থীদের ছবি আঁকা দেখছেন।
একটা উদ্দেশ্য নিয়ে আজ ছবি আঁকার আয়োজন করেছেন সেটা নিয়েই মনে মনে নিজেকে আরেকবার তৈরি করে নিচ্ছেন।সবাই মন দিয়ে ছবি আঁকতেছে দেখে মিস অনন্যা বেশ উৎফুল্ল। ছবি আঁকা প্রায় শেষের দিকে দেখে মিস অনন্যা বোর্ডে গিয়ে লিখলেন ছবির নিচে বা পাশে সবাই যার যার প্রিয় খাবার, প্রিয় পোশাক,প্রিয় রঙ,শখের কাজ,প্রিয় মানুষ সম্পর্কে একটি করে বাক্য লিখবে এই জন্য আরও পাঁচ মিনিট সময় দেওয়া হবে।
সবার ছবি আঁকা শেষ হলে ম্যাম বোর্ডের লেখার দিকে তাকাতে বললেন। তিনি বোর্ডের লেখা সবাইকে পড়ে শোনালেন এবং সেই অনুযায়ী লিখতে বললেন।
শিক্ষার্থীরা সবাই আগ্রহ নিয়ে নিজেদের ছবির পাশে প্রিয় জিনিস সম্পর্কে বাক্য লিখে সমস্বরে বলে উঠলো ম্যাম আমাদের লেখা শেষ হয়েছে। মিস অনন্যা শিক্ষার্থীদের চুপচাপ বসতে বললেন। নিজে বোর্ডের কাছে গিয়ে একজন করে শিক্ষার্থী ছবিসহ কাছে ডাকলেন।
ম্যাম আশাকে ডেকে বলেন ছবিটি তোমার বুকের কাছে ধরো তো। তুমি তোমার সম্পর্কে যা লিখেছ সবাইকে শোনাও। আশা খুশিতে বলতে থাকলো প্রিয় খাবার বিরিয়ানি, প্রিয় পোশাক লেহেঙ্গা,প্রিয় রঙ গোলাপী,শখের কাজ বেড়াতে যাওয়া,প্রিয় মানুষ তার বাবা। ম্যাম সহ সবাই করতালির মাধ্যমে অভিবাদন জানায়।ছবিটি ম্যামের কাছে জমা দিয়ে নিজের আসনে ফিরে গেলো।
এরপর সামনে এলো আলিফ, সেও একই মতো ছবি সামনে ধরে প্রিয় জিনিসের নাম বলতে লাগলো। আলিফের পছন্দের নাম শুনে সবাই করতালি দিয়ে অভিবাদন জানায়।
এভাবে করে বেশিরভাগ শিক্ষার্থী তাদের নিজের পছন্দ সম্পর্কে বলে। মিস অনিতা শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে খুশি হন। আজকের ক্লাসে সবাই অত্যন্ত আনন্দের সাথে অংশগ্রহণ করেছে।
এবার আবিরকে ম্যাম কাছে ডাকেন। আবির আসতে একটু ইতস্তত করতেছিলো দেখে ম্যাম কাছে গিয়ে ওকে নিয়ে আসেন। আবিরের আঁকা ছবি দেখে তো ম্যাম অবাক বিষ্ময়ে তাকিয়ে থাকেন। ছবির ছেলেটির গায়ে ছেঁড়া শার্ট-প্যান্ট ধুলোমাখা খালি পা আর বেশিরভাগ জায়গায় কালো রঙের ছাপ আর অল্প কিছু সবুজ রঙ আছে। ছবিটি দেখে জীবন্ত মনে হচ্ছে।আচ্ছা আবির তুমি কার কাছে ছবি আঁকা শিখেছ? এতো সুন্দর ছবি এঁকেছ যে দেখে বুঝা যাচ্ছে না এটা না শিখে আঁকা যায়?
ম্যাম আমি কারোর কাছে শিখিনি। ঐ যে চারু ও কারুকলা ক্লাসে আপনি যেটুকু শিখিয়েছেন ওটুকুই।
মাশাল্লাহ আবির তুমি অনেক বড় চিত্রশিল্পী হও সেই আশীর্বাদ করছি। আচ্ছা এবার তোমার ছবির পাশে যে বাক্যগুলো লিখেছ তা সবাইকে পড়ে শোনাও।
আবির প্রথমেই বললো, আমার প্রিয় খাবার পান্তাভাত ।আর এ কথা শুনে ক্লাসের সবাই জোরে হাসতে থাকলো। ম্যাম সবাইকে চুপ করিয়ে আবিরের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো আচ্ছা আবির আজ কি তুমি পান্তাভাত খেয়েছ?
ম্যাম আমি তো প্রতিদিনই পান্তাভাত খাই।আমার মা অন্যের বাড়িতে কাজ করে তারা মাকে যা খাইতে দেয় মা বাড়ি নিয়া আসে তাই আমি আর মা খাই।
ম্যাম এবার জিজ্ঞেস করেন আচ্ছা উনারা কি প্রতিদিন পান্তাভাত দেয়?
না ম্যাম উনারা তো মাকে গরম ভাতই দেয় কিন্তু মা বাটিতে ভইরা রাখে আর কাজ শেষ কইরা বাড়িতে আসতে ভাত নষ্ট হয়ে যায় তাই মা ভাতে পানি দেয়।উনারা মাকে বেশি করে ভাত দেয় কিন্তু তরকারি কোনো দিন দেয় কোনোদিন দেয় না।জানেন ম্যাম মায়ের অনেক কষ্ট হয় কাজ করতে। কিন্তু মা কাজ না করলে পান্তাভাতও খাইতে পারুম না।
আবির তোমার কি আর কোনো খাবার পছন্দ না?
হ্যাঁ ম্যাম গরম ভাত আর ডিম ভাজি খুব পছন্দ কিন্তু আমি তো আর প্রতিদিন গরম ভাত আর ডিম ভাজি পাই না তাই পান্তাভাতই প্রিয়।
ম্যাম আমার প্রিয় পোশাক রাজু ভাইয়ের পুরনো গেঞ্জি আর ছেড়া প্যান্ট।
কি বললে পুরনো গেঞ্জি আর ছেঁড়া প্যান্ট? রাজু ভাই কে?
ম্যাম মা যে বাড়ি কাজ করে সেই বাড়ির মালিকের ছেলে রাজু ভাই। উনার যে গেঞ্জি প্যান্ট পুরনো হয়ে গেলে বা ছিঁড়ে গেলে মা সেলাই করে পরতে দেয়।
নতুন পোশাক শুধু বছরে একবার রোজার ঈদে রাজু ভাইয়ের মা দেয়। সারাক্ষণ পুরনো পোশাক পরি তাই ওটাই প্রিয়। মা সব সময় বলে আল্লাহ পাক যার ভাগ্যে যেটা রেখেছেন সেটাকেই প্রিয় মনে করতে হয় তাই আমি পুরনো পোশাক পছন্দ করি।
আবিরের কথায় সারা ক্লাস নিরব হয়ে গেছে। মিস অনন্যার মনটাও ভারাক্রান্ত হয়ে গেছে।
আবির এবার বলতে শুরু করেছে প্রিয় রঙ সম্পর্কে। ম্যাম আমার প্রিয় রঙ কালো।
আবির এতো রঙ থাকতে তোমার প্রিয় রঙ কালো?
ম্যাম অন্ধকার তো কালোই হয় তাই না?
হ্যাঁ অন্ধকার কালো কিন্তু এর সাথে প্রিয় রঙের সম্পর্ক কি?
ম্যাম মা সব সময় বলে যাদের জীবনে অভাব আছে কষ্ট আছে তাদের জীবনে একটাই রঙ আর সেটা হলো কালো। আর শুনেন ম্যাম আমাগো ঘরে তো সব সময় বাত্তি থাকে না। সন্ধ্যার সময় খাওয়া হলেই মা বাত্তি নিভাইয়া দেয় তাই অন্ধকারের মধ্যেই থাকি। অন্ধকারে রঙ কালো আবার মা বলে কষ্টে মানুষের জীবনে অন্ধকার নামে যেমন আমার বাপ মারা যাবার পর অন্ধকার নামছে তাই আমার প্রিয় রঙ কালো।
আবিরের প্রতিটি কথায় মিস অনন্যার হৃদয় ছুঁয়ে যাচ্ছে। এ যেনো কোনো দার্শনিকের কথা শুনছে। আবিরের প্রতি ভালোবাসা আরও বেড়ে যায়।
আবিরকে কাছে টেনে নিয়ে ম্যাম বলেন তুমি অনেক বড়ো হবে বাবা।
ম্যাম আমার শখের কাজ কি শুনবেন না?
অনন্যা ম্যাম সহ শ্রেণির সকলের চোখ অশ্রুসজল হয়ে গেছে তাই তিনি বলেন থাক বাবা আর বলতে হবে না।
না ম্যাম আমি বলতে চাই।সবার শখের কথা শুনলেন আর আমারটা শুনবেন না?
ঠিক আছে আবির বলো।
ম্যাম আমার শখের কাজ হলো পড়াশোনা করে মায়ের মুখে হাসি ফোটানো। জানেন ম্যাম , মা রাতে লুকিয়ে লুকিয়ে কান্দে আর কান্দে। মা যে বলে আল্লাহ পাক যা দেয় তাতেই খুশি থাকতে হয় তাহলে মা কান্দে ক্যান? আমি মায়ের কান্দন সইতে পারিনা। আমি যে আমার মাকে অনেক ভালোবাসি।
আবিরের কথাগুলো শুনে যে কেউ ভাববে তাকে কেউ শিখিয়েছে। কিন্তু না আবির ওর জীবন থেকে সব বলেছে।
অনন্যা ম্যাম আবিরকে নিজের বুকে জড়িয়ে ধরলেন। এদিকে ক্লাসের সকলেই আবিরের কথায় কাঁদছে। ম্যাম আবিরের মাথায় হাত রেখে বলেন অনেক দোয়া করছি বাবা তুমি অনেক বড়ো হও আর তোমার চারিপাশ আলোকিত হোক।
ম্যাম আমি বড়ো হলে কি গরম ভাত আর ডিম ভাজি খেতে পারব? আমার খুব খিদা লাগে আমি বড়ো হয়ে পেট ভরে খাইতে চাই,মাকে আর খিদায় কষ্ট করতে দিমু না। নতুন শার্ট-প্যান্ট পরতে চাই , ঘরের বাত্তি জ্বালাইয়া রাখুম। সব অন্ধকার যেনো দূর হইয়া যায়।
ম্যাম আমার মতো কারোর যেনো সব দিন পান্তাভাত খাইতে না হয়,খিদার জ্বালা সহ্য করা যায় না। আমি কালো রঙের কিচ্ছু চাই না আমি চাই আমার চারপাশে আলো থাকে।
অনন্যা মিস সবার ছবি ক্লাস রুমের দেয়ালে টানিয়ে দিলেন আর আবিরের ছবিটি টানালেন বোর্ডের মাথার উপরে। আবিরকে তার আসনে বসতে বললেন। হটাৎ করে ক্লাসের নিস্তব্ধতা ভেঙে সকলে করতালি দিতে থাকল এবং মুখে মুখে বলতে থাকল আবির আবির আবির জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ।
সবার সাথে অনন্যা ম্যামও করতালির মাধ্যমে আবিরকে অভিবাদন জানায়।
অনন্যা ম্যাম সবার উদ্দেশ্যে বলেন, সুপ্রিয় শিক্ষার্থীবৃন্দ জীবনে যে কোনো পরিস্থিতি মেনে নেয়ার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। মন্দকে মন্দ ভেবে নিজেরা কখনো কষ্ট পাবে না। চেষ্টা করবে কর্ম দিয়ে ভালো কিছু অর্জন করতে। কথায় আছে “পরিশ্রম সৌভাগ্যের প্রসূতি” তাই বর্তমানের খারাপ সময়কে নিয়ে হতাশায় ভুগবে না। সৃষ্টি কর্তার প্রতি অগাধ বিশ্বাস রাখবে। আল্লাহ পাক মানবের কল্যাণে বদ্ধপরিকর। আজ আর নয় আবার অন্য কোনো বিষয় নিয়ে তোমাদের সাথে দেখা হবে ইনশাআল্লাহ সে পর্যন্ত সবাই ভালো থেকো।আল্লাহ হাফেজ।
*** এই গল্প থেকে এটা বুঝা গেলো যে আবির তার মায়ের কথাকে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতো এবং সব পরিস্থিতি মেনে নিতো।আল্লাহর প্রতি অগাধ বিশ্বাসের জন্যে আবির খারাপ পরিস্থিতিতে ভালো থেকেছে। তার জীবন থেকে আমরাও শিক্ষা নিতে পারি যে পরিস্থিতি যাই হোক না কেন তা হাসিমুখে মেনে উত্তম।






