নিমতলা গ্রামের সহজ সরল আকবর ও তার পরিবারের বসবাস। আকবর ভ্যানগাড়ি চালিয়ে যা আয় রোজগার করে তা দিয়ে সংসার চালানো কষ্টকর। এখন সবাই ইঞ্জিন চালিত ভ্যানগাড়িতে মালামাল আনা নেওয়া করে তাই আকবরের তেমন আয় হয় না। সংসারে বৃদ্ধ মা, স্ত্রী ও দুই ছেলে । গ্রাম থেকে প্রায় ৫/৬ কিলো দূরে একটা তামাক কারখানা চালু হয়েছে। ২/৩ মাস হলো সেখানেই আকবরের স্ত্রী রেবেকা কাজে যায়। দৈনিক কাজ হিসেবে অল্প মজুরিতে কাজ করে। মাঝে মাঝে আবার ওভারটাইমও করে। ৫ জনের সংসারে দুজনের অল্প আয়ে কোনোমতে চলে।
ধান তোলার মৌসুমে আকবর গ্রামে ধান কাটার কাজ করে। এই এলাকায় বিভিন্ন কল কারখানা হওয়ায় এখন আর ধান কাটার লোক পাওয়া যায় না তাইতো অন্য জেলা থেকে ধান কাটার লোক আসে। শহরের বাস স্ট্যান্ড এলাকায় সন্ধ্যা হলেই শ্রমিক বেচাকেনার হাট বসে। আকবরদের গ্রামের হাসেম মিয়ার জমির ধান কাটার জন্য ৫ জন শ্রমিক নিয়ে আসে। তিনবেলা খাবার আর থাকার জায়গা জমির মালিকের বাড়িতে হয়।
আকবর আজ ভ্যান নিয়ে বের না হয়ে হাসেম মিয়ার জমিতে ধান কাটার কাজে লাগে। আকবরের সাথে অপরিচিত ঐ ৫ জনও কাজে লেগে যায়। আকবর যেহেতু মিশুক তাই সহজেই সবার সাথে ভাব জমায়। সারা গ্রামে ধান কাটতে বাইরের জেলা থেকে অনেক শ্রমিক এসেছে। এদের মধ্যে কেউ কেউ উত্তর বঙ্গের আবার কেউ এসেছে পশ্চিমের জেলা হতে। এরই মধ্যে মিজান নামের একজনের সাথে বেশ ভাব হয়েছে। কাজের শেষে মাঝে মাঝে বাড়িতেও নিয়ে আসে। মিজানও আকবরের ছেলে দুটোকে খুব আদর করে।
ধীরে ধীরে মিজান আকবরের কাছে বিশ্বাসী বন্ধু হয়ে গেলো। ধান কাটার মৌসুম শেষ হয়ে গেলেও ৩/৪ দিন মিজান আকবরের বাড়িতে থেকে যায়। আকবর ভ্যান নিয়ে বাইরে চলে গেলে মিজান আকবরের ছেলে রিপন ও শিপনকে নিয়ে খেলাধুলা করে। এভাবে ৪/৫ দিন কাটিয়ে মিজান বাড়ি ফিরে যায়। ফেরার সময় আকবরের কাছে বিদায় নিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পরে।আকবর তাকে আবারও এখানে ফিরে আসার কথা বলে।
মিজান চলে যাবার ৩ দিন পরেই ফোনে জানায় যে সে ৩/৪ দিনের মধ্যে ফিরবে। আকবর খুশি মনেই আসতে বলে আর এও বলে যে চিন্তা কইর না ভাই কাজ যেখানেই করো না কেন আমার বাড়িতেই থাকবা।কথাটা শুনে মিজান যেনো মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি পেল।
আকবরের বৃদ্ধা মায়ের অবশ্য আপত্তি আছে। অভাবের সংসার আর বাড়িতে থাকার জন্য আলাদা ঘরও নেই নিজেরা থাকার পরে বারান্দায় ছোট্ট একটা চৌকি আছে। মায়ের মত না থাকলেও পরোপকারী আকবর মিজানকে থাকার কথা বাড়িতে সবাইকে জানায়। মিজানের আসার খবরে সবচেয়ে খুশি হয়ে রিপন আর শিপন। রিপন গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। গ্রীষ্মের ছুটিতে স্কুল বন্ধ থাকবে তাই রিপন ভাবছে মিজানের সাথে খেলাধুলা ,গল্পে আনন্দেই কাটবে।
শুক্রবার সন্ধ্যায় মিজান আকবরের বাড়ি এসে উপস্থিত হয়। আকবরও মাত্র বাড়ি ফিরেছে অবশ্য রেবেকা এখনো ফিরেনি আজ সে ওভারটাইম করে ফিরবে। ছেলে দুটো মিজান কাকাকে পেয়ে বেশ আনন্দে আছে। আকবরের সাথে মিজান রেবেকাকে এগিয়ে আনতে যায়।রেবেকাও সৌজন্য কথা বলে।তিনজনে গল্প করতে করতে বাড়ি ফিরে।
পরের দিন সকালে আকবর ভ্যান নিয়ে যখন বাইরে যায় তখন মিজানও বের হয়ে যায়।
আরে মিজান তুমি কই যাইবা?
ভাই আমি কাজের জন্য আসছি তাই কাজ করতে যাই।
কার বাড়িতে কাজ পাইছ?
আমি গঞ্জে একটা বাড়িতে কয়দিনের জন্য আগাছা পরিষ্কারের কাজ পাইছি।
ও আচ্ছা ঠিক আছে যাও। রাইতে বাড়ি ফিরবা না কি?
দেখি থাকার জায়গা থাকলে আইতাম না।
দুইদিন পরে মিজান আবার আকবরের বাড়ি আসে আর রিপন শিপনের জন্য খাবার আর খেলনা নিয়ে আসে। আকবর মিজানকে এসবের জন্য নিষেধ করা সত্বেও এনেছে। তবে ছেলে দুটো খুব খুশি হয়েছে।এভাবেই মিজান সবার কাছে প্রিয় ও বিশ্বাসী হয়ে উঠে। যখন তখন বাচ্চাদের নিয়ে দোকানে চলে যায়, খেলার মাঠে যায় এমনকি ওদের বাস স্ট্যান্ডেও যায়।
মিজান যেহেতু বারান্দায় ঘুমায় তাই ঘরের ভিতর ওরা যা বলে ও সবই শুনতে পারে।
রেবেকা শুনছো কিস্তির ভাইজানের সাথে আজ কথা হইছে। পরশু দিন আমারে ইঞ্জিনওয়ালা ভ্যান কেনার অফিসে যাইতে কইছে।
আচ্ছা উনারা কতো টেকা দিব?
পঞ্চাশ হাজার দিব আর গরু বেচার যে চল্লিশ হাজার টেকা জমা রাখছিলাম তাই দিয়া ভ্যান হইয়া যাইব।
তুমি পরশু দিন কামে যাইও না। কিস্তি উঠাইয়াই গাড়ি নিয়া আসুম।
ছুটি নিলে তো রোজ কামাই যাইব। থাইক আমি ওভারটাইম করুম না তাই বেলা থাকতেই আইয়া যামু।
আইচ্ছা তাই কইরো।
মিজান ওদের সব কথাই মন দিয়ে শুনে।
স্কুল বন্ধ তাই মিজান বাড়ি থাকলেই রিপনকে নিয়ে এদিক সেদিক যায়।
আকবর বাড়ি থেকে যাবার সময় বলে যায় আজ দুপুরে ফিরবে না। ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হতে পারে। মিজান যেনো এটাই শুনতে চেয়েছিলো।
বিকেলে মিজান রিপনকে বলে চল ভাতিজা বাস স্ট্যান্ডে যাই।
কাক্কা বাসস্ট্যান্ডে কেন যামু?
আমাগো দেশের একজন আমার লগে দেখা করবার আইব। আরে চল যাই ।সন্ধ্যার আগেই আইয়া পরুম। মিজানের সাথে রিপন বাসস্ট্যান্ডের দিকে যায়। বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে মিজান রিপনকে সিঙ্গারা কিনে দেয়। রিপনকে একটা পেপসি কিনে দেয় আর নিজেও খায়। খেতে খেতে মোবাইলে কার সাথে যেনো আস্তে আস্তে কথা বলে যা রিপন খেয়ালই করে না।
আচমকা মিজান রিপনকে বলে কাক্কা চল যাই আমরা গঞ্জে থিক্যা ঘুইরা আসি। কেন গঞ্জে যামু কেন? ইট্টু পরেই তো সন্ধ্যা অইয়া যাইব। আমরা বাড়ি যামু কখন? আরে শোন বেটা আমার বন্ধু একটা কামে আটকা পরছে তাই এইখানে আইতে পারে নাই। তার লগে আমার জরুরি কাম আছে। কামডা সাইরা চইলা আমুনে। না কাক্কা আমু যামু না। মায় চিন্তা করব আব্বায় বকব। আরে তোর বাপ মার আইতে তো অনেক দেরী অয়। তারা ফেরার আগেই আমরা চইলা আমু । ইনিয়ে বিনিয়ে অনেক কথা বলে রিপনকে নিয়ে বাসে উঠে।
ওদের বাসস্ট্যান্ড থেকে গঞ্জ বেশি দূরে নাই কিন্তু বাস থেকে তো মিজান রিপনকে নিয়ে নামছে না। রিপন একবার বলে কাক্কা এতো দূর না তো গঞ্জ? কাক্কা তুমি আমারে নিয়া কই যাও? আরে বেটা তুই শুনলি না ফোনে আমার বন্ধু কইলো ও গঞ্জে আইতে পারছে না তাই তো ওগো বাড়ি যাইতাছি। কাক্কা উনাগো বাড়ি কোনখানে? এইতো আর একটু পরেই নামুম আমরা। তোর মিজান চাচা তর লগে আছে তুই কি ডরাস? না ডরামু কেন? আসলে রাইত অইয়া যাইতাছে বাড়ি যামু কখন? চিন্তা করিস না বাপজান। বন্ধুর লপগে কথা কইয়াই চইলা আমু।
এদিকে চারিদিকে অন্ধকার হয়ে গেছে। বাস থেকে নেমে রিপনের হাত ধরে গ্রামের দিকে হাঁটতে থাকল । এবার রিপনের ভয় করতেছে। কাক্কা আমি আর যামুনা। কই নিয়া যাও আমারে? আরে বেটা আমি আছি তো তুই এমন করতেছস কেন? হাঁটতে হাঁটতে মিজান কয়েকবার ফোনে কথা বলে। এতোই আস্তে কথা বলে যে ছোট্ট রিপন কিছুই বুঝে না। শুধু শেষে একটা কথা শুনে নৌকা আছে তো? রিপন এবার কান্না করতে থাকে। মিজান এটা সেটা বলে রিপনকে থামানোর চেষ্টা করে । বিভিন্ন মজার মজার কথা বলে রিপনকে শান্ত করে। রিপনকে কোলে করে কাঁধে করে গায়ের উঁচুনিচু পথে মিজান চলতে থাকে। রাত হয়ে গেছে তাই গায়ের পথ ঘাটে তেমন লোকের চলাচল নাই।
এদিকে আকবর আর রেবেকা বাড়ি ফিরে রিপন শিপনকে ডাকে । আকবরের মা ঘর থেকে বলে মিজানের সাথেই তো রিপন আছিলো। শিপন বাবার কাছে আইসা বলে বাবা মিজান কাক্কা ভাইরে নিয়া কই জানি গেছে। রাত হয়ে গেছে কিন্তু মিজান আর রিপনের খোঁজ নাই। আসে পাশের বাড়ির লোকজনরে জিজ্ঞেস করে কিন্তু কেউ কিছু বলতে পারে না। মিজানের মোবাইলে ফোন করেই চলেছে রিং হয় কিন্তু কেউ রিচিভ করে না। একটু পরে ফোনের সুইচ অফ শোনায়। আর আকবরের দুশ্চিন্তা বাড়তে থাকে। রেবেকা স্বামীকে বাসস্ট্যান্ডের দিকে যেতে বলে। আকবর বাসস্ট্যান্ড গিয়ে চায়ের দোকানদার বলে বিকাল বেলায় তো আমার দোকান থেইকা দুইজনে সিঙ্গারা খাইছে তারপর কই গেছে তা খেয়াল করি নাই।
এদিক সেদিক ঘুরে আকবর আবার বাড়ি ফিরা আসে। তখন রাত ১০ টা বেজে গেছে। রেবেকা ছেলের জন্য কান্নাকাটি শুরু করে দিছে। এমন সময় অপরিচিত নাম্বার থেকে অচেনা কণ্ঠে কেউ একজন বলে তোর ছেলেকে জীবিত ফেরত চাইলে আজ রাতের মধ্যে ফেরীঘাটের উত্তরে যে চর পরছে সেখানে পঞ্চাশ হাজার টাকা নিয়া চইলা আয় । আর শোন যদি তেওড়বেওড় করস তাইলে কিন্তু তোর পোলার লাশও খুঁইজা পাবি না। এপাশ থেকে আকবর ডাকতে থাকে কেডা কেডা আপনে? আমারে চিনন লাগব না তুই আমার কথামতো কাম কর আর পোলারে নিয়া যা। শোন সূর্য্য উঠার আগেই আইসা পৌঁছাবি নইলে কিন্তু তোর পোলারে কুমিরে খাইব না মাছে খাইব আমি জানিনা। এসব কথা শুনে আকবর হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে। ঘর থেকে আকবরের মা এবার ছেলেকে বলে আমি তো আগেই কইছিলাম ভিনদেশী মানষেরে এতো বিশ্বাস করিস না। যা এহন তুই আমার নাতিরে আইনা দে। আকবর দু চোখে সর্ষেফুল দেখতেছে দিশেহারা হয়ে ঘর বাহির করতে থাকে। একবার ভাবে মেম্বাররে কইব কিন্তু রেবেকা না করে।
কাউরে কওন লাগব না আইজ কিস্তির টেকা উঠাইছ ঐগুলা দিয়া মার পোলারে আইনা দেও। আকবর ফেরীঘাটে অনেক আগে গেছিলো কিন্তু চরেত যায় নাই। চল আগে ফেরীঘাটে যাই তারপরে চরে যাওয়ার পথ পামুনে। আল্লায় যেন ঐ নিমকহারাম আমার কইলজার টুকরার সাথে কি না কি করতাছে? টাকা নিয়া স্বামীস্ত্রী বাড়ি থেকে বের হয়। রাস্তায় এখন আর কোনো লোক নাই। টর্চের আলোতে দুজনে হাঁটতে থাকে। এর মাঝে মিজানের মোবাইলে অনেক বার চেষ্টা করে কিন্তু ফোন বন্ধ শোনায়।
রিপন কান্না করেই চলেছে। মিজান নানা কথা বললেও কান্না থামে না। রিপনও বুঝেতে পারছে মিজান ওকে দূরে কোথাও নিয়ে যাচ্ছে। একটু ফাঁকা জায়গায় গিয়ে মিজান কাকে যেনো ফোনে পঞ্চাশ হাজার টাকা দেবার কথা বলে। রিপন এতোক্ষণ বুঝেই নাই যে মিজান তাকে নিয়ে যাচ্ছে ওর বাবা মায়ের কাছ থেকে টাকা নেবার জন্য। হটাৎ করে রিপন খেয়াল করে দূরে আলো দেখা যাচ্ছে। তাই সে ভাবে লোকজন দেখলেই জোরে জোরে চিৎকার করব । মিজান রিপনের চুপচাপ থাকা দেখে বলে এই তো সব ঠিক হয়ে গেছে। কিছুক্ষণ পরে ওরা ফাঁকা জায়গা পেরিয়ে গায়ের পথে চলে আসে। এতো রাতে গায়ের পথে কেউ থাকার কথা না। কিন্তু ওদের থেকে একটু দূরেই টর্চের আলো দেখে রিপন কান্না জুড়ে দেয়। মিজান রিপনকে নানা ভাবে আদর করে আর রিপনের কান্নার আওয়াজ আরও বাড়তে থাকে। একজন জেলে মাছে ধরতে যাচ্ছে। রিপন ঐ লোকটাকে দেখে কান্নার আওয়াজ আরো বাড়িয়ে দেয়। লোকটাকে দেখে মিজান রিপনকে বলতে কান্না করিস না কাক্কা তোর মা কালকেই ফিরব। লোকটা জিজ্ঞেস করে কি হইছে ভাই বাচ্চাটাকে কান্না করাইতেছন কেন? আর এতো রাতে পোলাপান নিয়া কই জান? ওর নানী আইজ মারা গেছে তাই যাইতাছি। ও আমার ভাইয়ের পোলা ওর বাপ মায় দিন থাকতেই গেছে । রিপন বলে এইডা আমার কেউ না ,ও আমারে জোর কইরা ধইরা নিতাছে।লোকটা মিজানকে বলে এসব কি বলছে বাচ্চাটা? মিজান জেলেকে বলে আরে ভাই শোনেন আমার ভাইয়ের লগে কথা কই আপনে শোনেন তাইলেই বুঝবেন। অপপ্র প্রান্ত থেকে কেউ একজন বলে মিজান তোরা আর কতদূর? রিপনরে নিয়া তাড়াতাড়ি আয়। জেলে মিজানের মিথ্যে গল্প সত্য মনে করে চলে যায়।
মিজানের মনেও অস্থিরতা কাজ করছে। একটু পরপর ফোনে কার সাথে যেনো মেসেজিং করছে। কান্না করতে করতে রিপনও ক্লান্ত হয়ে গেছে। হটাৎ করে রিপন রাস্তায় বসে পরে। বলে আমি আর কোথাও যামু না। রিপন জিদ ধরাইস না উঠ বলছি। না আমি আর হাঁটতে পারুম না। এভাবে প্রায় পাঁচ মিনিট রাস্তায় বসে থাকল। পেছন থেকে ২/৩ জন লোক আসতেছে সে মিজান খেয়াল করে নাই কারণ মিজান তখন প্রস্রাব করতে গেছিল।কিন্তু রিপন দেখছে কারা যেনো আসছে। তারা একটু কাছে আসাতেই রিপন জোরে কান্না শুরু করে আর বলতে থাকে এইডা আমারে ধইরা নিয়া যাইতাছে ও আমার কেউ না আমার মায়ের কাছে নিয়া যান। লোকগুলো কাছে আসাতেই মিজান বলে কাক্কা এসব কি কইতাছ? নিজের কাক্কারে তুমি পর কইতে পারলা? তুই আমার কাক্কা না তুই আমার কেউ না। একটু আগে যে জেলে এখান দিয়া গেছে সেও আছে এদের সাথে। জেলেকে দেখে মিজান বলে এইউ যে ভাই আপনেরে তো আমার ভাইয়ের কথা শুনাইছি আপনেই কন পোলাডা কি লাগে আমার?
হ্যাঁ আমি আপনের ফোনে একজনের কথা শুনছি কিন্তু সে যে আপনের ভাই তার প্রমাণ পাই নাই।চলেন পাশেই মেম্বার বাড়ি ঐখানে চলেন যাই ।বাচ্চাটা সত্যিই আপনের ভাতিজা হইলে তো কোনো কথাই নাই। রিপন এবার আস্তে আস্তে কান্না করতেছে। আর মিজানও বুঝতে পারছে পঞ্চাশ হাজার টাকাতো পাওয়া যাইবই না অন্যদিকে জেল ফাঁস অইব। যেই সবাই মিজানকে মেম্বারের বাড়ির দিকে পথ চলতে বলে মিজান কিছুটা পথ গিয়ে পেছন থেকে দৌড়ে পালায়। একটু সময়ের মধ্যে মিজান যেনো হাওয়ায় মিশে গেলো। রিপনকে কোলে নিয়ে জেলেরা মেম্বার বাড়িতে আসে। রিপনের মুখে সব শুনে মেম্বার রিপনকে অভয় দেয়।আর কোনো চিন্তা করো না আমি তোমার বাবার কাছে এক্ষুণি ফোন করে আসতে বলছি।কোনো ভাবেই রিপনের বাবার সাথে যোগাযোগ করতে পারছে না। মেম্বারের মেয়ের জামাই প্রাইমারির শিক্ষক স্কুল ছুটি বলে সেও আজ বেড়াতে মেম্বারের বাড়িতে। রিপন বলে আমি নিমতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ি।মেম্বারের মেয়ের জামাই বলে আমি তোমার স্কুলের প্রধান শিক্ষককে চিনি। আমি এক্ষুণি তাকে ফোন দিচ্ছি। রিপনের স্কুলের প্রধান শিক্ষক এতো রাতে ফোন পেয়ে দ্রুত রিচিভ করে রিপনের সব ঘটনা জানতে পেয়ে রিপনদের গ্রামের ইউপি সদস্যকে জানায়। এদিকে রিপনের বাবা মা ফেরিঘাটে এসে গেছে। এতোক্ষণ বাসে ছিলো তাই ফোন ধরেনি। অপরিচিত নাম্বার থেকে অনেক বার কল আসায় ফোন ব্যাক করে জানতে পারে তার কলিজার টুকরা ছেলে ভালো আছে। ঐ নিমকহারাম ওর ক্ষতি করতে পারেনি। ফজরের আজানের সময় মেম্বারের বাড়ি গিয়ে আকবর ও রেবেকা পৌছায়। ততোক্ষণে রিপন ঘুমিয়ে পরেছে। ঘুমন্ত ছেলেকে কোলে নিয়ে বাবা মায়ের যে আহাজারি তা না দেখলে বুঝা যাবেনা হারানো সন্তান বুকে ফিরে পেলে বাবা মায়ের কি শান্তি লাগে।
আকবর মিয়া জীবনে এক চরম শিক্ষা পেয়েছে। বিশ্বাস করা ভালো তবে অন্ধ বিশ্বাস নয়। অন্ধ বিশ্বাস করলে জীবনে চরম মূল্য দিতে হয়। আল্লাহর অশেষ কৃপায় আজ তারা সন্তানকে ফিরে পেয়েছে। তাই আকবর মিয়া সব জায়গায় একটা কথাই বলে বিশ্বাস করো কিন্তু কাউকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করো না।






