শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে সকল ছাত্র-ছাত্রীদের উদ্দেশ্যে বললেন আজ পড়াশোনা শুরুর আগে চলো আমরা একটা কাজ করি। সকল শিক্ষার্থী সম্মতিসূচক মাথা নাড়লো।
তখন শিক্ষক সকলের উদ্দেশ্যে বলেন, এখন বোর্ডে আমি কয়েকটি শব্দ লিখছি আর এই শব্দগুলো ব্যবহার করে তোমরা নিজের সাথে যে শব্দ মিলে যায় সেই শব্দ দিয়ে দশটি বাক্য লিখবে। তবে আমার অনুরোধ কেউ মিথ্যা কথা লিখবে না। আচ্ছা তোমরা কি সবাই প্রস্তুত? সকল শিক্ষার্থী স্যারের কথায় হাত উঠিয়ে সম্মতি জানালো।
স্যার বোর্ডে গিয়ে দুটো ছক এঁকে তার মধ্যে লিখতে থাকলেন, ১ নং ছকে লিখলেন সত্যবাদী, বিশ্বাসী,পরোপকারী, ধৈর্য্যশীল,সাহসী, নিরপেক্ষ, উদার,মিত্যবায়ী,নিয়মানুবর্তী , বিনয়ী।
২ নং ছকে লিখলেন মিথ্যাবাদী, ফাঁকিবাজ,লোভী, হিংসুটে ,প্রতারক, নীতিহীন, অত্যাচারী, ,অহংকারী, অপচয়কারী,উশৃংখল।
বোর্ডে লেখা শেষ করে শিক্ষার্থীদের বললেন কেউ কারোর লেখা নকল করবে না। কাগজের পিছনে সবার নাম লিখে জমা দিবে।আর আবারও বলছি মিথ্যে মিথ্যে নিজের সম্পর্কে লিখবে না। লেখার জন্য দশ মিনিট সময় পাবে। কি তোমরা রাজি তো?
জি স্যার আমরা রাজি।
শিক্ষক সবাইকে এক টুকরো করে কাগজ দিলেন।
শিক্ষক বললেন লেখা শুরু করো।।সবাই কাগজে লেখা শব্দ দিয়ে দশটি বাক্য লেখা শুরু করে দিলো। পিছনের বেঞ্চে বসা একজন শিক্ষার্থী বাদে আর সবাই পাঁচ মিনিটের মধ্যে লেখা জমা দেয়।ক্লাসের অন্য সবাই পিছন ফিরে মুচকি মুচকি হাসছে। সবাই এমন ভাব করছে যে পিছিয়ে পরে থাকা মেয়েটি খুব অন্যায় করেছে। ঠিক দশ মিনিটের মাথায় মেয়েটি শিক্ষকের কাছে লেখা কাগজ জমা দেয়।
শিক্ষক সবাইকে নিজ নিজ খাতায় নিজদের ছবি আঁকতে দিয়ে কাগজের লেখাগুলো পড়তে থাকেন।
লেখাগুলো পড়তে গিয়ে দেখেন সবাই ১ নং ছকে প্রদত্ত শব্দ দিয়ে নিজেদের সম্পর্কে দশটি করে বাক্য লিখেছে।শুধুমাত্র সব শেষে যে মেয়েটি কাগজ জমা দিলো সে তার সম্পর্কে ২ নং ছকের শব্দ দিয়ে বাক্য লিখেছে।
স্যার এবার সবার কাগজ ফিরিয়ে দিলেন কিন্তু ঐ মেয়েটির কাগজ নিজের কাছে রেখে মেয়েটিকে কাছে ডাকলেন।
পুরো ক্লাসের সবাই মেয়েটির দিকে তাকিয়ে উপহাসের হাসি হাসতে থাকলো। মেয়েটি ধীর গতিতে শিক্ষকের কাছে এসে দাঁড়ায়। তখন শিক্ষক সবার উদ্দেশ্যে মেয়েটির লেখাগুলো পড়ে শোনান।
সবাই মেয়েটির দিকে ঘৃণাভরে তাকায়।এবার শিক্ষক মেয়েটির কাছে জিজ্ঞেস করেন আচ্ছা তুমি কি যা লিখেছ তা বুঝে লিখেছ?
জি স্যার আমি বুঝেই লিখেছি।
এখানে সব সত্য লিখেছ?
জি স্যার, আপনি তো শুরুতেই বলেছেন যেনো আমরা নিজ সম্পর্কে সত্য কথা লিখি তাই আমি আমার সম্পর্কে সব সত্য বলেছি।
নিজেকে মিথ্যাবাদী বলেছ কেন? সত্যি কি তুমি মিথ্যাবাদী?
জি স্যার আমি মিথ্যাবাদী , আমার বাবা নাই,মা অনেক কষ্টে খাবারের ব্যবস্থা করেন।আমি মাকে দেখেছি নিজে না খেয়ে আমাকে খেতে দেয় আর জিজ্ঞেস করলে বলে খেয়েছি।তাই আমিও এখন মাকে খাওয়ানোর জন্য নিজে না খেয়ে মাকে বলি আমি খেয়েছি এটুকু তুমি খাও। আমার মা মিথ্যাবাদী তাই তাকে দেখে আমিও মিথ্যাবাদী হয়ে গেছি।
মিথ্যাবাদী না হয় বুঝলাম কিন্তু তুমি কি সত্যি ফাঁকিবাজ?
হ্যাঁ স্যার আমি ফাঁকিবাজ। মায়ের কাজে সাহায্য করতে গেলে স্কুলের পড়া তৈরি করতে পারিনা তাই মাকে বলি সব পড়া হয়ে গেছে আর পড়া দেয়নি, এটা কি ফাঁকি দেয়া না?
মেয়েটার কথা সবাই শুনছে আর একজন আরেকজনের দিকে তাকাচ্ছে।
এবার শিক্ষক মেয়েটির মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করলেন ঠিক আছে বুঝলাম তুমি ফাঁকিবাজ কিন্তু লোভী লিখেছো কেন?
স্যার আমার অনেক লোভ। মায়ের হাসিমাখা মুখ দেখার লোভ, পেট ভরে খাবার খাওয়ার লোভ,পড়াশোনা করার লোভ,ভালো পোশাক পরার লোভ,সুন্দর বাড়িতে থাকার লোভ। মেয়েটির কণ্ঠস্বর ধরে আসছে ,চোখের কোণে জল এসে গেছে। ক্লাসের সবাই চুপচাপ মেয়েটির কথা মন দিয়ে শুনছে।
আচ্ছা তুমি হিংসুটে লিখেছ কেন?
স্যার আমি অনেক হিংসুটে। আমি আমার মাকে খুব হিংসে করি।মা যখন নিজের জন্য কিছু না করে আমার জন্য করে তখন আমার খুব হিংসে হয়। মনে হয় কেনো মায়ের জন্য আমি কিছু করতে পারিনা। মা-ই কি শুধু মহান হবে আমি কি পারি না ? পড়াশোনায় যাদের থেকে পিছিয়ে আমি তাদের হিংসে করি তাই আমি হিংসুটে।
আচ্ছা বুঝলাম তুমি হিংসুটে কিন্তু প্রতারক হলে কিভাবে?
স্যার আমি তো মস্ত বড় প্রতারক।খাতা কেনার টাকা নাই তাই একটা খাতায় প্রথমে পেন্সিল দিয়ে লিখি,আর সেই খাতা শেষ হলে আবার তার উপর কলম দিয়ে লিখি। এভাবেই আমি প্রতিনিয়ত প্রতারণা করে যাচ্ছি। মাকে বলি খাতা লাগবে না আমার খাতা কলম আছে আমার নিরক্ষর মা আমাকে বিশ্বাস করে আর আমি তাকে এভাবেই ঠকাচ্ছি প্রতারণা করছি। আসলেই আমি মস্ত বড় প্রতারক।
এবার সারা ক্লাস স্তব্ধ হয়ে গেছে। আচ্ছা নীতিহীন কেন লিখলে?
স্যার আমি যেহেতু মিথ্যাবাদী তাই আমি নীতিহীন। যে মিথ্যা কথা বলে সে নীতিবান হয় কিভাবে? যেদিন সত্য কথা বলব সেদিন নীতিবান হবার চেষ্টা করব।
শিক্ষক মেয়েটির কথা যতই শুনছে ততই মুগ্ধ হচ্ছেন। এমন কিছু শোনার জন্যেই আজ তিনি এমন আয়োজন করেছিলেন।
তোমার সাথে এতোক্ষণ কথা বলে তোমাকে তো অত্যাচারী মনে হয়নি, তাহলে নিজেকে অত্যাচারী বললে কেন?
স্যার আমি আমার মায়ের উপর অত্যাচার করি।আগে খাবারের জন্য, পোশাকের জন্য ,খেলনার জন্য অত্যাচার করতাম। যেদিন থেকে আমি বুঝেছি মা নিজে না খেয়ে আমাকে খাওয়ায় সেদিন থেকে আমি মাকে জোর করে খাওয়াই । আর নিজে না খেয়ে থেকে নিজের উপর অত্যাচার করি তাই আমি অত্যাচারী।
এবারের শিক্ষকের চোখও অশ্রুসজল হয়ে গেছে। তিনি আর কিছু জিজ্ঞেস করতে চাইলেন না। তিনি চুপ হয়ে গেলেন।
মেয়েটি স্যারের দিকে তাকিয়ে বলে স্যার আরও তিনটি বাক্য লিখেছি। সেগুলো সম্পর্কে শুনবেন না?
না আর শুনতে হবে না। ক্লাসের সকল শিক্ষার্থী চোখের জল ধরে রাখতে পারেনি। সবাই বলে উঠে না আর শুনব না ।স্যার এবার ওকে থামান।
স্যার মেয়েটির মাথায় হাত রেখে বললেন মা আজ আমার শিক্ষকতা জীবন সার্থক ।আমি যা চেয়েছি তা-ই পেলাম। তোমার জন্য অনেক আশীর্বাদ রইলো।
স্যার আমি তো মিথ্যাবাদী,লোভী,প্রতারক,অত্যাচারী । আমি কিভাবে ভালো মানুষ হবো? আমি যেনো সততা ও ন্যায়ের পথে চলতে পারি সে দোয়া করবেন। মেয়েটি কথাগুলো বলতে গিয়ে কাঁদছে আর কাঁদছে।
এবার শিক্ষক ক্লাসের নিরব পরিবেশ সরব করতে সবাইকে কড়তালি দিতে বললেন। সবাই কড়তালি দিচ্ছে আর বলছে মারহাবা “সূর্য্যভানু”।
এবার স্যার বললেন সূর্য্যের আলোয় ভরিয়ে দাও চারিপাশ,ঘুচিয়ে দাও ক্লান্তি অবষাদ।সূর্য্যভানু তার আসনে গিয়ে বসলো।
শিক্ষক এবার বললেন আজ তোমাদের আত্ম মূল্যায়ন সম্পর্কে আলোচনা করতে এই আয়োজন করেছিলাম। আমার বিশ্বাস সূর্য্যভানুর মতো সবাই নিজদের মূল্যায়ন নিজেরা করবে। পরের সমালোচনা নয় নিজের সম্পর্কে নিজে মূল্যায়ন করো দেখবে জীবনের অনেক মন্দকে উপেক্ষা করে সুস্থ সুন্দর জীবন গঠন করতে পারবে। এক সূর্য্যভানু থেকে লক্ষকোটি সূর্য্যভানুর জন্ম হোক।






