স্নিগ্ধা কানাডা থেকে আজই ফিরেছে। এয়ারপোর্ট থেকে গাড়ি করে যাবার সময় ট্রাফিক জ্যামে গাড়ি দাঁড়াতেই রাস্তায় ট্রাফিক পুলিশের দিকে চোখ যায়। এ কি সৈকত ট্রাফিকের কাজ করে। এই সৈকতের পরিবার একদিন স্নিগ্ধার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে ছিলো।
সৈকত আর স্নিগ্ধা একই গ্রামে বড়ো হয়েছে। সেই প্রাইমারি থেকেই ওদের মধ্যে ভাব। সৈকতের বাবা সম্পদশালী ছিলেন আর স্নিগ্ধার বাবা ছিলেন একজন স্কুল শিক্ষক। সৈকত আর স্নিগ্ধা একই কলেজে পড়াশোনা করতো। সময়ে অসময়ে দু’জনে একসাথে থাকতো।ধীরে ধীরে দু’জনের মধ্যে বন্ধুত্ব থেকে ভালোবাসার রূপ নেয়।
পড়াশোনায় বরাবরই স্নিগ্ধা ভালো ছিলো। সৈকত ছিলো মধ্যমানের ছাত্র। ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে স্নিগ্ধা ঢাকা ভার্সিটিতে ভর্তি হয় আর সৈকত গ্রামের কলেজে স্নাতকে ভর্তি হয়। দু’জন দু’দিকে চলে গেলেও হৃদয়ের টান একটুও কমেনি। প্রতি সপ্তাহে রঙিন খামে চিঠির আদান প্রদান চলতে থাকে। আর সৈকত সুযোগ পেলেই ঢাকায় গিয়ে স্নিগ্ধার সাথে সময় কাটায়।এভাবে ভালোই কাটছিলো ওদের ভালোবাসাময় সময়।
ভার্সিটিতে স্নিগ্ধা ভালো ফলাফল করতে থাকে। অনার্সে সর্বোচ্চ মার্ক্স নিয়ে স্নিগ্ধা ফার্স্টক্লাস পায়।
পাঁচ দিনের ছুটিতে স্নিগ্ধা বাড়ি ফিরে আসে। প্রতিবার ষ্টেশনে গিয়ে সৈকত এগিয়ে নিয়ে আসে কিন্তু এবার সৈকতের দেখা না পেয়ে স্নিগ্ধা মানসিকভাবে অনেক কষ্ট পায়। বিকেলে পুকুরপাড়ে স্নিগ্ধা ওর ছোটো বোনের সাথে বসে গল্প করছিলো তখনই জানতে পারে সৈকতের বাবা সৈকতের বিয়ের জন্য পাত্রী দেখছে। কথাটা শুনে নিজের কানকে বিশ্বাস করছিলো না। কি করে সৈকত অন্য কাউকে আপন করবে? তাহলে এতোদিন যে এতো ভালোবাসার কথা বলছিলো তা কি সব মিথ্যা?মনের অজান্তেই চোখের জল গড়িয়ে পড়ে।
জানিস আপু সৈকত ভাইয়া বিয়েতে রাজি না। ভাইয়া তো বলেছিলো বেকার অবস্থায় বিয়ে করবে না। শুনলাম এটাও বলেছে যে সে তোকেই বিয়ে করতে চায়।কিন্তু উনার বাবা বলেছে স্কুল শিক্ষকের মেয়েকে ঘরের বউ বানাবে না। উনি যার সম্পদ আছে তার মেয়েকে বউ বানাবে।
স্নিগ্ধা পরের দিন সকালেই ঢাকা ফিরে আসে। আর আসার সময় দূর থেকে সৈকতকে দেখতে পায়। ইশারায় ডাকলেও সৈকত সাড়া দেয়না। স্নিগ্ধা যখন ষ্টেশনে অপেক্ষা করছিলো তখন হটাৎ করে সৈকত স্নিগ্ধার সামনে এসে দাঁড়ায়।
তুমি কাল এসে আজই চলে যাচ্ছ? তোমার সাথে আমার কথা আছে।
শুনলাম তোমার বাবা তোমার জন্য ধনীর দুলালী আনবে। খুব ভালো থেকো।
প্লিজ স্নিগ্ধা আমায় ভুল বোঝো না। আমি তোমার কথা বলেছি কিন্তু বাবা আমার কোনো কথাই শুনছে না। আমি কি করব বলো? বাড়ি ছেড়ে চলে গেলে আমি কিভাবে চলব? বাবার কাছে লেখাপড়ার কোনো মূল্য নাই। টাকা পয়সা ছাড়া বাবা কিছুই বুঝেনা। স্নিগ্ধার হাত ধরে সৈকত কেঁদে ফেলে। আমি তোমাকে ছেড়ে কোনোদিন ভালো থাকবো না।
প্লিজ সৈকত হাতটা সরিয়ে নাও। মানুষ দেখলে খারাপ ভাববে। বাবার কথা মেনে নাও।দোয়া করো আমি যেন দরিদ্র স্কুল শিক্ষক বাবার মুখে হাসি ফুটাতে তার স্বপ্ন পূরণে মন দিয়ে লেখাপড়া চালিয়ে যেতে পারি।
ভার্সিটিতে ফিরে জানতে পারে যে কানাডা যাবার জন্য স্কলারশিপ পেয়েছে।স্নিগ্ধা কখনো দেশের বাইরে যেতে চায়নি কিন্তু আজ মনে হচ্ছে দেশ ছেড়ে যেতে পারলে বাঁচা যাবে। খুব তাড়াতাড়ি সব কাগজপত্র জমা দিয়ে দেয়।স্নিগ্ধা বাবার স্বপ্ন পূরণে কানাডায় চলে যায়।একবুক কষ্ট নিয়ে বিদেশের মাটিতে পারি জমায়।
সাত বছর পর উচ্চতর ডিগ্রি আজই কানাডা থেকে দেশে ফিরে আসে। এই পাঁচ একবারের জন্যেও সৈকতের সাথে যোগাযোগ হয়নি।যে টাকার জন্য সৈকতের বাবা তাকে অবহেলা করেছে আজ স্নিগ্ধার কাছে সম্পদ প্রতিপত্তি কোনো কিছুর অভাব নাই।দেশে ফিরে ভার্সিটিতে শিক্ষকতা করবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।বিদেশে অনেকে প্রেমের প্রস্তাব দিলেও স্নিগ্ধা সায় দেয়নি।
স্নিগ্ধা মনে মনে ঠিক করেছে সে কোনোদিন বিয়ে করবে না। কারোর সাথে প্রেম ভালোবাসায় জড়াবে না। সমাজের জন্য কিছু করতে চায়।
এর মাঝেই ছোটো বোনটার বিয়ে হয়েছে। বাবাও শিক্ষকতা থেকে অবসর নিয়েছেন। মা বাবাকে নিয়েই স্নিগ্ধা আজীবন থাকবে।সবাইকে সারপ্রাইজ দিবে বলে আগে থেকে কিছুই জানায়নি।
এয়ারপোর্ট থেকে বাড়ি ফেরার পথে সৈকতকে এভাবে দেখবে কল্পনাও করেনি। এই গরমে রাস্তায় সৈকতকে ট্রাফিকের বেশে দেখে মনে মনে অনেক কষ্ট পেলেও সৈকতের বাবার কথা মনে করে মুখ টিপে হাসে।






