হটাৎ করে যেনো অমানিশার আঁধারে চারিদিক কালো হয়ে গেলো। রাকিব সাহেবের সব ব্যবসায় ক্ষতি চরমে ওঠে গেলো।ব্যাংকের ঋণের জন্য সম্পত্তি হাতছাড়া হতে থাকলো। এই তো সেদিন কোর্ট থেকে যখন বাড়ি ছাড়ার নোটিশ আসলো তখন রাকিব সাহেব স্ট্রোক করেন। স্ট্রোকের পরে রাকিব সাহেব প্যারালাইজড হয়ে যায়। এমতাবস্থায় স্বাভাবিক খরচ মেটানো কষ্টকর হয়।
রাকিব সাহেব এখন কারোর সাহায্য ছাড়া দাঁড়াতে পারেন না। কথাও সব স্পষ্ট বুঝা যায় না।মেঘ তার বাবার করুণ পরিণতিতে নিজেও বিপর্যস্ত হয়ে পরে।
সেদিন দুপুরে রাকিব সাহেবকে খাবার খাইয়ে সীমা বেগম খেতে বসেছে। তখন অপরিচিত নাম্বার থেকে রাকিব সাহেবের ফোনে কল আসে। সীমা বেগম ফোন রিচিভ করাতে শাহেদ নামের কেউ রাকিব সাহেবকে চায়।
একসময় শাহেদ রাকিব সাহেবের অফিসে কাজ করতো। পরে চাকরি নিয়ে দেশের বাইরে যাওয়ায় যোগাযোগ বন্ধ ছিলো। হটাৎ করে শাহেদের স্ত্রী মারা যাওয়ায় বাচ্চাদের দিয়ে দেশে ফিরে আসে।
রাকিব সাহেবের সব বিপর্যয়ের কথা শুনে পরের দিনই চট্রগ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। যে মানুষটা অর্থ সম্পদ প্রতিপত্তিতে পরিপূর্ণ ছিলো আজ তার এ কি অবস্থা। এই রাকিব সাহেবের অফিসে শাহেদ চাকরি করতো আজ তিনি এমন করুণ অবস্থায় আছে যা দেখে শাহেদ খুব কষ্ট পায়।
শাহেদ এখন থেকে দেশেই থাকবে তাই রাকিব সাহেবের সাথে দেখা করতে এসেছে। শাহেদ রাকিব সাহেবের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দেয়।শাহেদের ছেলে মেয়ে বোনের বাসায় রেখে এসেছে তাই রাতের ফ্লাইটে ঢাকা ফিরে।
রাকিব সাহেবও শাহেদকে খুব আপন ভাবে।বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ভাবে শাহেদ রাকিব সাহেবের প্রয়োজনে পাশে এসে দাঁড়ায়। এভাবে দুই পরিবারের মধ্যে একটা নিবিড় সম্পর্ক তৈরি হয়।
শাহেদ একদিন তার ছেলে মেয়ে দীপ ও শিখাকে নিয়ে রাকিব সাহেবের বাড়ি বেড়াতে আসে। মা মরা দুটি ছেলে মেয়েকে সীমা বেগম মেঘের ঘরে নিয়ে যায়। রোদেলা মায়ের সাথে খেলছিলো। দীপ আর শিখাকে দেখে মেঘ খুব খুশি হয়। দীপের বয়স পাঁচ আর শিখার বয়স তিন বছর। অল্প সময়ের মধ্যে তিনজনের মধ্যে বেশ সখ্যতা।গড়ে উঠে। মেঘও বাচ্চা দুটিকে কাছে টেনে নিয়ে আদর করে। মেঘ নিজের মেয়ের মতোই দীপ শিখাকে কাছে টানে।
শাহেদ একটা হোটেলে উঠেছে। রাতে হোটেলে ফিরতে গেলে দীপ শিখা বাবার সাথে না গিয়ে এ বাড়িতে থাকার আবদার করে। সীমা বেগম আর রাকিব সাহেবের অনুরোধে বাচ্চাদের রেখেই একা হোটেলে ফিরে। দীপ,শিখা আর রোদেলার মধ্যে বেশ বন্ধুত্ব হয়েছে। দুই তিন দিন ওরা এই বাড়িতে থাকে। ঢাকায় ফেরার সময় বাচ্চা দুটো তো কেঁদেই দেয়। মা ছাড়া ওদের একটুও ভালো লাগেনা। তাইতো মেঘকে পেয়ে ওরা খুব আনন্দে থাকে।
শাহেদ ঢাকায় ফেরার পর ব্যবসা নিয়ে বেশি ব্যস্ত হয়ে পরে বলে বাচ্চারা আরো কষ্ট পায়। মাঝে মাঝেই শিখা মায়ের জন্য কান্নাকাটি করে না খেয়ে থাকে। এদিকে শাহেদ ব্যবসা নিয়ে এতো ব্যস্ত যে ছেলে মেয়েকে তেমন সময় দিতে পারেনা।
রাকিব সাহেব হটাৎ করে বেশি অসুস্থ হয়ে পরে। ভোর হতে না হতেই একটা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। মেঘ রোদেলাকে মায়ের কাছে রেখে হাসপাতালে বাবাকে নিয়ে আছে। ডাক্তার বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা করে বলেন যে রাকিব সাহেব আবার স্ট্রোক করেছে। সময়মতো হাসপাতালে আনা হয়েছে বলে বড়ো ধরনের ক্ষতি হয়নি।তবে উনার হার্টে রিং পরাতে হবে। যত দ্রুত সম্ভব আপনারা টাকার ব্যবস্থা করেন। ডাক্তার মেঘকে জানায় যে রাকিব সাহেব আবার স্ট্রোক করলে উনার বড়ো ধরনের ক্ষতি হবার সম্ভাবনা আছে।
মেঘ এখন কি করবে? কোথায় এতো টাকা পাবে? এই পরিস্থিতিতে মেঘ নিজেকে খুব অসহায় ভাবছে। মায়ের কাছে ফোন করে রোদেলার খবর নেয়। সীমা বেগম মেয়ের কাছে সব শুনে টেনশনে পরে যায়।
শাহেদ রাকিব সাহেবের খবর নেয়ার জন্য ফোন করলে মেঘ কল রিচিভ করে। আর মেঘের কাছে জানতে পারে রাকিব সাহেবের অসুস্থতার খবর।
মেঘ কিছু না বললেও শাহেদ বুঝে ফেলে যে রাকিব সাহেবের চিকিৎসার জন্য টাকার প্রয়োজন যা এখন উনাদের কাছে নাই। হাসপাতালের ম্যানেজারকে ফোন করে চিকিৎসার সব ব্যবস্থা করতে বলেন।
রাতে শাহেদ মেঘের মাকে ফোন করে চিন্তা করতে না করে এবং চিকিৎসার সব ব্যবস্থা শাহেদ করবে বলে জানায়।একথা শুনে সীমা বেগমের চোখে জল এসে যায়। নিজের ছেলে থাকতে আজ অপর মানুষ পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।পরের দিন সকালে রাকিব সাহেবের হার্টে রিং পরানোর জন্য যাবতীয় খরচ শাহেদ দেয়।
এক সপ্তাহের মধ্যে রাকিব সাহেব সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরে। শাহেদের এই ঋণ কিছু দিয়েই শোধ করা সম্ভব নয়। এদিকে শাহেদের বাচ্চা দুটোও রোদেলা আর মেঘের সাথে থাকতে বেশ পছন্দ করে। রাকিব সাহেব আজ অসহায়। ঋণের ভার যে আর বইতে পারছে না। আগামী মাসে ব্যাংকের দেনা শোধ না করলে এই বাড়ি ছেড়ে পথে দাঁড়াতে হবে। হটাৎ কোত্থেকে কি হয়ে গেলো। সৈকত যে এভাবে বাবা মাকে কষ্ট দিবে তা কখনো ভাবেনি।
মাঝে মাঝেই শাহেদ বাচ্চাদের নিয়ে চট্টগ্রাম চলে আসে। এভাবে আসতে আসতে সম্পর্ক আরও নিবিড় হয়। এইতো সেদিন দীপ আর শিখা রাতে থেকে গেলো। মা হারা সন্তান দুটোকে মেঘও খুব আদর করে।
রাকিব সাহেব মেঘকে বলে তার রুমে যেতে। মেঘ বাবার কাছে যাওয়া মাত্রই রাকিব সাহেব মেয়ের হাত ধরে কেঁদে দেয়। মা আজ আমার একটা কথা তোকে রাখতেই হবে। কথা দে মা আমাকে নিরাশ করবি না। আমি যখন তখন চলে যাবো তাই তোকে সাগরে ভাসিয়ে রেখে যাই কিভাবে?
বাবা কি বলছো এসব? আমি ভালো আছি।
মা আমরা তো ভালো নাই। তোকে কার কাছে রেখে যাবো? তোর মেয়েটার কি হবে?
আচ্ছা বাবা বলতো কি হয়েছে তোমার?
রাকিব সাহেব মেয়ের হাত শক্ত করে ধরে বলে মা তুই শাহেদকে বিয়ে কর।কোনো আপত্তি শুনবো না। শাহেদ রোদেলাকে নিজের মেয়ে হিসেবে মেনে নিবে। শাহেদের সাথে আমার কথা হয়েছে। ওর ছেলে মেয়ে দুটোও মা পাবে আর রোদেলা পাবে বাবার স্নেহ।
বাবার কথা শুনে মেঘ স্তব্ধ হয়ে যায়। মুখ দিয়ে একটি শব্দও বের হয়না।কিছু না বলেই নিজের রুমে চলে আসে।
কিছুক্ষণ পরে মেঘের মা এসে বলে বাবার কথায় রাজি হয়ে যা। দেখ তোর বাবা খুব অসুস্থ। আমারও শরীর ভালো থাকেনা। অর্থসম্পদ তো কিছুই নাই। রোদেলার জন্যে হলেও রাজি হয়ে যা। এ দুই বছরে তুই তো রোদ্দুরের খবর নেবার চেষ্টা করেছিস কিন্তু কোনো খবরই তো পেলি না। আল্লাহ পাক তোর জন্য শাহেদকে পাঠিয়েছে। তুই আর অমত করিস না।
মেঘ বিছানায় উপুড় হয়ে কেঁদে বালিশ ভিজিয়ে ফেলে। রোদেলা মাকে উপুড় থেকে উঠার জন্য টানাটানি করে। দুই তিন ধরে মেঘ চুপচাপ থাকে।
মেঘের হাজারো আপত্তি থাকা সত্বেও বাবা মায়ের কথায় এবং রোদেলার জন্য শাহেদের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়।
শাহেদের সংসারে মেঘ সন্তানদের আদর্শ মা। দীপ,শিখা আর রোদেলাকে নিয়ে মেঘ ব্যস্ত থাকে। মেঘের বাবা মায়ের সাথেই এক মাসের মতো ছিলো পরে শাহেদ ওদেরকে নিয়ে নিজের ফ্ল্যাটে উঠে। স্বামী স্ত্রীর যে মধুর সম্পর্ক থাকে সেটা ওদের মধ্যে নেই। শুধু সন্তানদের দায়িত্ব কর্তব্য পালনের জন্যে একসাথে আছে। মেঘ রোদেলাকে যেভাবে আদর করে দীপ শিখাকেও ওভাবে আগলে রাখে। বাচ্চাদের মধ্যেও দারুণ সখ্যতা গড়ে উঠেছে।
শাহেদ ব্যবসায়িক কাজ নিয়েই ব্যস্ত থাকে। বাচ্চাদের দেখভালের জন্য মেঘের উপর সব ছেড়ে দিয়েছে। ধীরে ধীরে শাহেদ মেঘের উপর নির্ভরশীল হয়ে পরে।
প্রায় দুই বছর হয়ে গেলো বিয়ে হয়েছে। কিন্তু ওদের মধ্যে সেরকম রোমান্টিকতা দেখা যায়নি।সেদিন রাতে হটাৎ শাহেদ ঘুম থেকে জেগে দেখে মেঘ বিছানায় নাই। রোদেলা আর শিখা আলাদা রুমে ঘুমায়। ওখানে গিয়েও মেঘকে পায় না।শাহেদ মেঘকে জোরে ডাকতেও পারছে না। যদি শব্দে বাচ্চারা জেগে যায়।






