জয়মালা বাড়িতে ঢুকেই ডাকছে মা ও মা এই দেখ আমি ভাইগো লগে গোসল কইরা আইছি।
খুব ভালা করছ মা। এহন কাপড় বদলাইয়া ভাইবোনেরা ভাত খাও।
হেলেনা বেগম বারান্দায় খেজুর পাতার পাটি বিছিয়ে সবাইকে খেতে দেয়।
মানিক বলে মা ঘরের কাজ তো আর একটু বাকী। আর তুমি বউগো লইয়া ঘরের মাইজা আর ডোয়া মাটি দিয়া লেইপা দিলেই আমাগো বুবুর থাকনের ঘরের কাজ সারা অইব।
বাবা বাড়ি ফিরুক তারে কমুনে যে সামনে শুক্কুরবার বিয়ার দিন ঠিক করতে।
আইচ্ছা বাজান তোমার বাবা আসুক তার সাথে কথা কইয়া দিন ঠিক করন যাইব।
জহিরের দৃষ্টিতে জয়মালার ভেজা দেহের সৌন্দর্য স্থির হয়ে আছে। বারবার শুধু জয়মালাকে দেখতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু এখন সম্ভব নয়৷ বিয়ার পাকা কথা অইয়া গেছে এহন কোনো ভুল করন যাইব না। আর তো অল্প সময় অপেক্ষা করন লাগব তারপরেই তো জয়মালা নিজের অইয়া যাইব।
নজর আলী বাড়ি ঢুকেই ডাকছে মা জয় কই আছ মা? হাসিমুখে ঘর থেকে বাইরে বের হয়েই বাবা ও বাবা আমার লাইগা কি আনছ? কি বেহাতি আনছ?
মা গো তোমার লাইগা বাদাম টানা আর পিঁয়াজি আনছি।
বাবা খুব খুব ভালো করছ কবে থেইকা টানা খাই না।
নজর আলী হাতমুখ ধুয়ে বারান্দায় জল চৌকিতে বসল। হেলেনা বেগম স্বামীর জন্য খাবার রেডি করতেছে।
ইদানীং নজর আলীর শরীর মাঝে মাঝেই অসুস্থ হয়ে যায়। আজও কেমন জ্বরজ্বর লাগছে। খাবারেও তেমন রুচি নাই।
হেলেনা বেগমকে স্বামীকে খাবার দিল। খাবার খেয়ে নজর আলী ঘরে গিয়ে বিছানায় এলো। একটু পরে হেলেনা বেগম এসে বলল এই যে জয়ের বাপ আপনে কাইল মিয়া ভাইয়ের কাছে গিয়া বিয়ার দিন ঠিক কইরা আইয়েন।
আগে ঘরের কাম শেষ হোক।
ঘরের কাম ২ দিনের মধ্যেই শেষ অইবো। মানিক কইলো যে সামনে শুক্কুরবার দিন করতে। এহন তোমার যেডা ভালো মনে হয় হেইডাই করো।
পরদিন সকালে উঠেই নজর আলী কালাম মিয়ার বাড়ি গিয়ে বিয়ের পাকা কথা দিয়ে আসলো।
নজর আলীর মনের মধ্যে নানান কথা ঘুরপাক খাচ্ছে। দুশ্চিন্তা হচ্ছে কিন্তু কাউকে কিছু বলতে পারছে না। আল্লাহর কাছে সারাক্ষণ মেয়ের জন্য প্রার্থনা করছে।
নজর আলী কালাম মিয়ার বাড়ি থেকে বের হবার পরই কালাম মিয়া ডাকছে জহির ও জহির এদিক আসো তো বাপ।
হুম চাচাজান আইতাছি। কি কন? আপবার লগে কোথাও যাওন লাগব?
নারে বাপ, নজর আলী আজ পাকা দিন কইরা গেল। আগামী শুক্কুরবার তোমাগো বিয়া।
কথাটা শুনে জহির লজ্জায় মাথানিচু করে রইলো।
শোনো বাপ সময় বেশি নাই তাই বিয়ার জন্য কেনাকাটা সারতে অইবো।
চাচাজান আমি টেকা দেই আপনে যা যা লাগব কিনা দিয়েন না হয় আমার লগে গিয়া যা যা কিনন লাগবো তা কিনা দিয়েন। আমি তো এখানে সব চিনি না আর বিয়ার দিন কি কি লাগে তা-ও জানিনা।
আইচ্ছা কালকে তো আমি ব্যস্ত থাকুম তাই বুধবার গঞ্জে যামু ঐ দিন কিনা দিমু নে। তুমি জমির কাম শেষ কইরা গঞ্জে চইলা আইসো।
চাচা আমার যাওন লাগব না আপনে কিনা আইনেন।
আরে বাপ তুমি বিয়া করবা তাই নিজের বউয়ের জন্য পছন্দ করবা তুমি আমি তোমার লগে থাকুমনে।
আইচ্ছা চাচাজান আমি কাজ কাম সাইরা চইলা আসুমনে।
জহিরের মনে খুশির বন্যা বইছে। চোখে মুখে আনন্দের ঝিলিক দেখা যাচ্ছে। জহির কাজের উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হলো।
হেলেনা বেগম বউমাদের নিয়ে ঘর লেপার কাজে আছে। মানিক রতন ঘরের কাজ শেষ করেই বোনকে ডাকছে বুবু ও বুবু দেখ তোমার জন্য ঘর বানাইয়া দিলাম। বিয়ার পর থেকে তুমি তোমার জামাইয়ের লগে এই ঘরে থাকবা।
ঘর থেকে জয়মালা বাইরে এসেই মাকে বলে, মা আমি তোমার লগে থাকুম এইঘরে বাঁশিওয়ালা একাই থাকবনে।
হেলেনা বেগম মেয়ের কথায় মুচকি হেসে বলে ঠিক আছে মা, বিয়া হোক তারপর দেখা যাইব।
নজর আলী সন্ধ্যার পরপরই বাড়ি ফিরা আসল। বাড়ি আইসা টর্চ লাইটের আলোয় ঘর দেইখা তো অবাক। তার ছেলেরা কত যত্ন কইরা বোনের জন্য ঘর বানাইয়া দিল। আইজ নজর আলীর মনের ভিতর শান্তি লাগছে।
তার অবর্তমানে ভাইয়েরা এই অবুঝ বোনকে কদর করবে।
রাতে ঘুমাতে গিয়ে হেলেনাকে বলে এই যে জয়ের মা শোনো একখান কথা।
কি কথা কও দেহি।
আমি তো আইজ অনেক অবাক হইছি কত বছর আগে দেশ স্বাধীন হইছে আমার মতো কতো মানুষ জীবন বাজি রাইখা যুদ্ধ কইরা দেশ স্বাধীন করছে,কতো মানুষ শহীদ হইছে। এতো বছর পর তাগো নাম লিখতাছে। তাগো নাকি সরকার টেকা দিব। কথাডা শুইনা আমি হাসুম না কান্দুম তা বুঝবার পারি নাই। কতো মুক্তিযোদ্ধা রোগে শোকে অভাবে মইরা গেল,কতজনে এহনো কত কষ্ট করতাছে এতো বছর আইজ মনে অইছে আমাগো কথা।
আমার একখান কাগজ আছিল ঐ ট্রাংকে ভইরা থুইছিলাম। আছে কি নাই আল্লাহ পাক জানে। কতো কষ্ট কইরা চলতাছি হেই যে যুদ্ধের সময় পায়ে গুলি লাইগা পাও নষ্ট অইলো তহন থেইকা এক পায়ে ভর দিয়া লাঠি নিয়া চলি কেউ খবর নেয় নাই আইজ কইলো আমাগো সম্মান দিব। যুদ্ধের পরে স্কুলের মাঠে লাইন ধরাইয়া আমাগো নাম লেখছিল ঐ কাগজ না কি লাগব।
হেলেনা বেগম স্বামীর কথা মনযোগ দিয়ে শুনতেছে।
জানো জয়ের মা আরো একখান কষ্টের কথা যে আয়নাল বেপারী আমাগো দেশের বিপক্ষে ছিলো, যে আমাগো বাড়ি পাক মিলিটারি আনছিল তার নাম না কি পয়লা কাতারে। একজন বেঈমান একজন দেশের শত্রুর সাথে আমি কখনো নাম লেখামু না। লাগব না আমার সম্মান লাগব না আমার অর্থ। আমি গরীব আছি গরীবই থাকুম তাও ঐ বেঈমানের কাতারে আমি নাই।
নজর আলীর আজ অন্য রূপ দেখে হেলেনাও স্তম্ভিত। লোকটা রাগে জিদে কেমন করছে।
হেলেনা বেগম স্বামীকে বলে ওসব বাদ দেও সামনে শুক্কুরবার যে মেয়ার বিয়ার দিন করলা সেইডা ভাব।
নিজেকে সামলে নিয়া নজর আলী বলে ঠিক আছে। সকাল হোক মানিক রতনের সাথে কথা কইয়া কেনাকাটা করুমনে। আর পাড়ার দুই চারজনরে তো কওন লাগব তাও কমুনে।
নজর আলী একটু নরম স্বরে কথা বললেও তার ভেতরে সেই যুদ্ধের সময়ের শিহরণ জেগে উঠছে। তার কেবলি মনে হচ্ছে——-






