আজিজুন নাহার আঁখি

মুখোশের আড়ালে ভদ্রবেশী পিশাচ পর্ব- ১০

মনের আনন্দে জহির গভীর রাত পর্যন্ত বাঁশি বাজালো। জয়মালাকে নিশ্চিত নিজের করে কাছে পাবে এটা ভেবেই তার তনুমনে শিহরণ জাগে ভালো লাগায় আচ্ছন্ন হয়ে যায়। সুখের স্বপ্নে বিভোর হয়ে একসময় ঘুমিয়ে পরে।
সকাল হতে না হতেই নজর আলী ছেলেদের নিয়ে ঘর তৈরির কাজে লাগলেন। ছোটো একটা ছাপরা ঘর দিবে তাই নিজেরাই কাজ করছে। হেলেনা বেগম তার ছেলের বউদের নিয়ে রান্নার আয়োজন করছে। জয়মালা ঘুম থেকে উঠেই ডাকছে মা ও মা। বাইরে বেরিয়ে ভাইদের ঘরের কাজ দেখে জিজ্ঞেস করে এই ভাই এইডা আবার কার ঘর?
আরে বুবু এইডা তো তোর আর দুলাভাইয়ের জন্য বানাইতাছি। জহির ভাইয়ের সাথে তোর বিয়া অইব তখন তো আর মার লগে ঘুমাইতে পারবি না। তাই তোর জন্য এই ঘর।

জয়মালার অবুঝ মনে এসব কিছুই বুঝে না তাইতো বলে মা ও মা আমি তোমার লগেই থাকুম তোমার লগেই ঘুমামু। আমি বাঁশিওয়ালার কাছে খালি বাঁশি শনুম।
হেলেনা বেগম রান্না ঘর থেকেই বলে জয় মা আগে বিয়া হোক তারপর দেখা যাইব নে। এখন তুমি হাতমুখ ধোয়।
এই ভাই বাঁশিওয়ালা কয়দিন ধইরা আমাগো বাড়ি আসেনা কেন? কি অইছে?
বুবু কয়দিন পরেই তো তোমাগো বিয়া তখন তো আমাগো বাড়িতেই থাকব তাই এ কয়দিন আর আইব না।
এ কথা শুনে জয়মালার মনটা যে খারাপ হয়েছে তা মুখের দিকে তাকালেই বুঝা যায়। জহিরের অনুপস্থিতি জয়মালাকে কষ্ট দিচ্ছে। তার মানে ওর শিশুসুলভ মনে ভালোবাসার সঞ্চার হয়েছে।
বিয়া তো কয়দিন পরে অইব তয় এখন আইতে না করছে কেডা? রাইতে আইলেই তো পারে। আমি বাঁশি শুনবার চাই।
ঘর থেকে হেলেনা ডাকে জয় মা এখন আর জহিররে ডাইক না। এইতো ঘরের কাম শেষ অইলে তোমার বাপজান গিয়া দিন পাকা কইরা আইব।
মানিক রতন বোনের সাথে নানান ধরনের হাসির গল্প করতে করতে ঘরের কাজ করতে থাকে।

বরাবরের মতো জহির ভোর বেলায় মাঠে যায়। আজ তার মনে খুশির জোয়ার বইছে। মনে মনে ভাবছে নদীর ঘাটে গিয়া বইসা থাকব জয়মালাকে দেখার জন্য কিন্তু আবার ভাবে যদি ওর মা কিছু মনে করে। ফুরফুরে মেজাজ নিয়ে সকালের খাবার খেতে বাড়ি ফিরে।
জহির খেতে বসেছে এমন সময় কালাম মিয়া ঘর থেকে ডাকে জহির ও জহির খাওয়া শেষ কইরা একবার আমার লগে দেখা কইরা যাইও।
ঠিক আছে চাচা জান আমি আইতাছি।
সব তো ঠিকঠাক কইরা দিলাম এখন খুশি আছো তো?
মাথা নীচু করে জবাব দেয় হ চাচা খুশি আছি। সব আপনের জন্যে অইছে আর আল্লাহর ইচ্ছা। আমি সারাজীবন আপনার খেদমত করুম।
শোনো জহির আমার কথার উপর ভরসা কইরাই নজর আলী মাইয়া বিয়া দিতে রাজি অইছে। তুমি এমন কিছু কইরো না যাতে আমার মান সম্মান যায়।
চাচা জান যে কি কন? আমার তিন কূলে কেউ নাই আপনে আমার বাবার মতন আপনের মুখ নষ্ট হয় এমন কিছু কি আমি করবার পারি?
যাকগে তোমরা ভালো থাকলেই আমরা খুশি। তয় তোমার তো ঐ বাড়িতে থাকন লাগব তাতে তুমি রাজি আছো তো?

হ চাচা জান আমি রাজি। আর এইহানে তো আমার বাড়িঘর নাই, দেশেও কিছু নাই। আমি বউ লইয়া কই যামু? আপনের বাড়ি কাম কইরা অন্যগো লগে বাংলা ঘরে ঘুমাই। বউ নিয়া কি তাই করন যাইব?
না জহির আমি কইতাছি তুমি যদি চাও তাইলে আমাগো বাড়িতেই থাকবার পারবা। আমাগো কাছারিঘরের পাশে একখান দোচালা ঘর খালি পইরা আছে। তুমি চাইলে বউ নিয়া ঐ ঘরে থাকবার পার।
আইচ্ছা চাচা জান আপনে যেমনে কন। তয় জয়ামালার বাপ মায় যদি রাজি থাকে আমার আপত্তি নাই। কিন্তু তারা তো তাগো মাইয়ারে চোখের আড়াল করে না।
শোনো জহির আমি তো শুনলাম ওরা ঘর তুলতাছে। হয়তো সপ্তাহ খানেক পরে বিয়ার দিন ঠিক করব। বিয়া করবা বউয়ের লাইগা জিনিসপত্র কিনবা না? আমি তোমারে কিছু টেকা দেই তুমি কেনাকাটা কইরা ফেল।
নানা চাচা জান আপনেই করেন। আমি এসব করি নাই।
ঠিক আছে আমি কাইল গঞ্জে গেলে সব কিনা আনুমনি। তুমি তাহলে কামে যাও।
আইচ্ছা চাচা জান আমি তাইলে মাঠে যাই।

জহির ফসলের মাঠে কাজ করতে গেল।
এদিকে দুপুর হয়ে গেছে মানিক রতনের কাজ প্রায় শেষের দিকে। মা বললো বাজানেরা যাও নদীতে যাইয়া ডুব দিয়া আসো। কাম যেটুক বাকী আছে তা কাইল কইরো ।
জয়মালাও ভাইদের বলে হ হ রে ভাই তোরা ডুব দিয়া আয়। এই ভাই তোগো লগে আমিও নদীতে যামু।
মা ও মা আমারে ভাইগো লগে যাইতে দেও।
না মা তুমি আমার লগে যাইও।
না মা আমি ভাইগো লগেই যামু।
মানিক মাকে বলে মা ও মা বুবু আমাগো লগে যাইক, কিচ্ছু অইব না। আমরা একজন ডুব দিমু আরেকজন ওর খেয়াল রাখুম।
ঠিক আছে বাবা তোমাগো বইনরে নিয়া যাও কিন্তু কোনো অঘটন ঘটাইও না।
এই কথা শুনেই জয়মালা খুব খুশি হলো। দৌড়ে গিয়ে মায়ের দুই গালে চুমু খায়, আমার মা অনেক ভালা, অনেক লক্ষী।
জহিরের কাজও শেষ তাই গোসল করতে নদীর দিকে গেল।

মানিক রতন বোনকে নিয়ে নদীর পাড়ে পৌঁছে গেছে। মানিক রতনকে বলে তুই আগে ডুব দিয়া উপরে আয় আমি আর বুবু এক লগে পানিতে নামি।
মানিক জয়মালাকে নিয়ে পানিতে নামে। জয়মালা একের পর এক ডুব দিচ্ছে। আজ সে খুব খুশি। বুদ্ধি কম কিন্তু নদীতে সে ভয় পায় না। দুই ভাইবোনে অনেক ক্ষণ গোসল করে উপরে উঠে আসে।
ভেজা কাপড় গায়ের সাথে লেপ্টে আছে দেখে বড় একটা গামছা বোনের গায়ে জরিয়ে দেয়।
জহির গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে নদীর কাছে গিয়েই থমকে যায়।
মানিক রতন কেউ জহিরকে না দেখলেও জহির ঠিকই ওদের দেখে ফেলে।

ভেজা গায়ে জয়মালাকে অপরূপ সুন্দরী দেখাচ্ছে। জহিরের মনে জয়মালাকে পাবার ইচ্ছা আরও তীব্র আকার ধারণ করে।
ভেজা চুলের পানি গরিয়ে নাকের ডগায় যেনো মুক্তোদানার মতো চকচক করছে। এই রূপ দেখলে যে কারোর মাথা ঘুরে যাবে।
ইচ্ছে করছে আরও কাছে গিয়ে ভালো করে দেখতে কিন্তু জয়মালার তো বুদ্ধি কম সে হয়তো জোরে জোরে সবাইকে ডাকবে বলবে এই দেখ বাঁশিওয়ালা আসছে।
ভাইদের সাথে জয়মালা বাড়ির দিকে হাঁটছে আর পিছন থেকে জহির ওকে এমন ভাবে দেখছে যেন শরীরের কাপড় ভেদ করে তার দৃষ্টি আরও গভীরে —–

Leave a Comment