আজিজুন নাহার আঁখি

মুখোশের আড়ালে ভদ্রবেশী পিশাচ পর্ব – ৯

সকালে নাস্তা করেই নজর আলী কালাম মিয়ার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। যেতে যেতে অনেক কিছু ভাবতে থাকে। আচ্ছা পাকা কথা যে দিতে যাচ্ছি যদি বিয়ের পর ছেলেটার কোনো বড় ধরনের দোষ ধরা পরে তখন কি হবে? কেন জানি নজর আলীর এই বিয়েতে মন সায় দিচ্ছে না কিন্তু বাড়ির সবার কথায় আজ মিয়া বাড়ি যাচ্ছে। এসব ভাবতে ভাবতেই কালাম মিয়ার বাড়ির কাছে পৌঁছে।
একটু গলা খাকান দিয়ে বাড়ির বাইরে থেকে জিজ্ঞেস করে ও কালাম ভাই বাড়ি আছেন না কি?
ঘর থেকে কালাম মিয়ার দরাজ কন্ঠের জবাবা কেডায় বাইরে?
ভাইজান আমি নজর আলী।
ও নজর আলী আরে তুমি আইছো? তুমি বারিন্দার চকিতে বসো আমি আইতাছি।

কালাম মিয়া পান চিবুতে চিবুতে বারান্দায় হেলনা চেয়ারে আয়েস করে বসেন। কও দেহি নজর আলী। কি রাজি আছো তো?
হু মিয়া ভাই আমার মত আছে কিন্তু আমারে কয়েক দিন সময় দেওন লাগব আর আরও একখান কথা কইবার আছে?
আলহামদুলিল্লাহ সকাল সকাল ভালো খবর শুনলাম দিনডা আইজ ভালোই যাইব। কও কি কথা আছে?
আপনে তো জানেন আমার মাইয়া অন্য মাইয়াগো লাগান সুস্থ স্বাভাবিক না, অর মা ছাড়া ওরে একা কোত্থাও থাকা পারেনা। তাই বিয়া অইবার পরেও মাইয়া জামাই দুইজনে আমার বাড়িতেই থাকব। আমি ছোটো একটা ছাপরা ঘর দিয়া বিয়ার কামে আওগাইবার চাই। আর আপনে তো সবই জানেন আমি গরীব মানুষ তাই জামাইরে টেকা পয়সা কিছু দিবার পারুম না।
কালাম মিয়ে হাসিমুখে বলেন আরে এই কথা! আমি মনে করছি কি না কি কইবা? আইচ্ছা তুমি তোমার মাইয়ারে তোমার বাড়িতেই রাইখো। জহির আমাগো বাড়িতে যেমনে কাম করে তেমনিই করব। আর মাইয়া যদি জামাইয়ের লগে আমাগো বাড়ি থাকবার পারে তয় থাকব।

দুজনের কথার মাঝখানে চম্পার মা গুড় মুড়ি দিয়ে আসলো। নেন ভাই খান।
নজর আলী লাজুক ভঙ্গিতে বললো নাহ ভাবীসাব আমি এহন খাইতে পারুম না মাত্রই বাড়ি থেইকা খাইয়া আইছি।
চম্পার মায়ের জোরাজুরিতে গুড়-মুড়ি খেলেন । একখান পান মুখে দিয়ে নজর আলী বিদায় নিলো যাবার সময় শুধু বললো আমি একটা ঘরের ব্যবস্থা কইরা আপনারে জানামু।
নজর আলী পাকা কথা দিলেও তার মনটা খচখচ করতে থাকে। দুশ্চিন্তা দূর হয় না। কিছুদিন যাবত তার শরীর ভালো যাচ্ছে না। মাঝে মাঝেই জ্বর আসে সাথে কাশিও হয়। মনে মনে বলে মেয়ের বিয়ের কাজ শেষ করে ডাক্তার দেখাতে হবে। নানান কথা ভাবতে ভাবতে নজর আলী তার চায়ের দোকানে চলে আসে।

জহিরের মাথায় আজ নানান চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। মানিক রতনের স্বাভাবিক ব্যবহার দেখে সে বুঝতে পারছে না, জয়মালাকে বিয়ে দিতে ওরা রাজি কি না। আজ রোদের তাপ অনেক বেশি , তাই দুপুর হবার আগেই মাঠ থেকে বাড়ির দিকে রওনা দেয়। ঘর্মাক্ত শরীরে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট ফুটে উঠেছে।
টিউবওয়েল থেকে হাতমুখ ধুয়ে বাংলা ঘরের বারান্দায় বিশ্রাম নিতে বসে। এখনো দুপুরের খাবার সময় হয়নি তাই এখানে অপেক্ষা করতে হবে। কালাম মিয়া গঞ্জে গেছে তাই বিয়ের খবর জানতে পারল না। জহিরের মনটা অস্থির হয়ে আছে।
ভিতর থেকে চম্পার মা ডাকছে জহির ও জহির আসো বাজান ভাত খাইয়া যাও। যে গরম পরছে খাইয়া দাইয়া বইসা বিশ্রাম লও। আমি খাওন দিছি, তারাতাড়ি চইলা আসো।
জহির ধীরপায়ে বাড়ির ভিতরে খাবার খেতে যায়। কালাম মিয়া গঞ্জে যাবার সময় চম্পার মাকে বলে গেছে জহিরকে কিছু না বলতে।
জহির চুপচাপ ভাত খেয়ে চলে গেল। বাংলা ঘরে একটু খানি বিশ্রাম নিয়ে আবার মাঠে চলে গেল। এবেলায় মানিক রতন কাজে আসে নাই দেখে জহিরের মনে দুশ্চিন্তা আরো বেড়ে গেল। জয়মালাদের কারোর বিপদ হলো কি না কে জানে?

নজর আলী দুই ছেলেকে ডেকে বললো শোনো বাজানেরা তোমাগো একটাই বইন তাই তার থাকার জন্য একটা ঘর দরকার। এতোদিন তো আমাগো লগে ঘুমাইছে কিন্তু এখন তার বিয়া অইব, স্বামীর সাথে কি আমাগো লগে থাকব?
আমাগো যে লাল ঘাড় গরু আছে ঐ টা বেইচা দিয়া ঘর দেও। মানিক রতনের খুব সখের গরু। ভাবছিল সামনে কুরবানির ঈদের সময় বেইচা দিব। কিন্তু বইনের বিয়া অইবো তাই তারা কিছু বললো না। আইজ তো হাট আছে। যাও তোমরা হাটে গিয়া গরু বেইচা আসো। ছেলেরা বাবার কথামতো গরু নিয়া হাটে গেল। গরু দেখতে সুন্দর তাই ভালো দামেই বিক্রি করতে পারছে।
বাড়ি ফেরার পথে জহিরের সাথে দেখা হয়ে যায়। আরে জহির ভাই কি খবর?
আমার খবর ভালো তোমরা কই গেছিলা?
আমরা হাটে গেছিলাম গরু বেচতে।
গরু বেচতে? কেন কি সমস্যা অইছে যে পছন্দের জিনিস বেইচা দিলা?
বাবার দরকার আছে তাই বেচলাম। জহির ওদের কথায় বিচলিত হয়ে যায়। ভাবতে থাকে কি দরকার হলো যে গোয়ালের গরু বেচতে হলো।

সন্ধ্যার পরে মানিক রতন দুই ভাই বাড়ি ফিরে বাবার কাছে টাকা দিয়ে যার যার ঘরে চলে গেল।
নজর আলী একটু নিশ্চিন্ত হলো। আগামীকাল ঘরের কাজে হাত দিতে হবে।
এদিকে সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হয়ে গেছে কিন্তু কালাম মিয়া বাড়ি ফিরেনি। জহিরের মনের ভিতর ছটফট করছে। রাতের খাবার খাচ্ছে এমন সময় কালাম মিয়া বাড়িতে প্রবেশ করেই ডাকছে চম্পার মা কই আছ?
এই যে আমি, তুমি হাতমুখ ধুয়ে আসো আমি খাওন দেই। আজ যে গরম পরছে খাইয়া দাইয়া বিশ্রাম লও।
জহিরের খাওয়া প্রায় শেষের দিকে তখন কালাম মিয়ার ডাক জহির ও জহির খাওয়া শেষ অইলে বারান্দায় বইস আমি হাতমুখ ধুইয়া আইতাছি।
আচ্ছা চাচাজান আমি আছি আপনে আসেন।

কালাম মিয়া বাইরে এসে জহিরকে বললো বাপজান তোমারে তো সকালে খবরটা দিবার পারি নাই। নজর আলী সকাল বেলা আইছিল। সে তো তার মেয়াডারে বিয়া দিতে রাজি আছে। কিন্তু তার কিছু শর্ত আছে।
জহিরের চোখে-মুখে খুশির ঝিলিক ফুটে উঠছে। লাজুক হাসি দিয়ে বলে চাচা জান কন তো দেহি তেনার শর্ত কী?
তার মেয়া বিয়া কইরা তাগো বাড়িতেই থাকন লাগব। অবুঝ মাইয়ারে দূরে যাইতে দিব না।
শর্তের কথা শুইনা জহির মনে মনে খুশি হয়েছে। ভাবছে এ দেখি মেঘ না চাইতেই জল।
শোনো জহির নজর আলী তার মাইয়ার লাইগা একখান ছাপরা ঘর দিয়া বিয়ার দিন ঠিক করব।
ঠিক আছে চাচা জান আপনেরা যে দিন ঠিক করবেন হেই দিনই ঠিক। আমি অহন যাই আপনে বিশ্রাম নেন।
প্রফুল্ল চিত্তে জহির ভিতর বাড়ি থেকে নিজের ঘরে এলো। আজ তার মনটা খুব ভালো। বাঁশিতে প্রেমের সুর তুলছে। আজ জহিরের বাঁশিতে শুধু প্রেমের সুর বেজেই চলছে—-

Leave a Comment