আজিজুন নাহার আঁখি

সভ্যতা-এই যে ভাই দাঁড়াও একটা কথা শোনো–
সময়- আমি দাঁড়াতে পারব না, আমার কাজই অবিরাম ছুটে চলা।
সভ্যতা- ভাই সময় তাই বলে একটা কথা শুনবে না?আমাকে চিনতে পারছ না? আমি সেই সভ্যতা যা তোমার আবর্তে বিবর্ণ হয়ে গেছে। এখন আমাকে না চেনার ভান করে চলে যাচ্ছ।
সময়- বললাম তো আমি দাঁড়াতে পারব না।তুমি আমার পিছু নিও না তো।দেখো অন্য কাউকে জিজ্ঞেস করে জেনে নাও কি জানতে চাও। আমি চললাম।
সভ্যতা- যাক বাবা ঐ যে একজনকে পাওয়া গেছে। যাই তার সাথেই কথা বলি। এই যে ভাই –শোনো শোনো
পরিবেশ- আমাকে ডাকছ? আমি এমনিতেই বিপর্যস্ত এখন আবার কে এলো?
সভ্যতা- আরে তুমি তো পরিবেশ তাই না? এমন দেখাচ্ছে কেন? কি হয়েছে তোমার?
পরিবেশ- আরে কে? তুমি সেই সভ্যতা না? যাকে ঘিরে কতো আয়োজন ছিলো? কতো সুন্দর ছিলে তুমি? তা এতোদিন পরে?
সভ্যতা-আমি তো হারিয়ে যাইনি ভাই,সময়ের আবর্তে বিবর্ণ হয়ে গেছি। কিন্তু তোমার এই হাল।কেন?
পরিবেশ- সময়ের আবর্তনে সব কেমন যেনো প্রানহীন হয়ে গেছে। তাইতো আমিও বিষাদগ্রস্ত।
সভ্যতা- আচ্ছা ভাই ঐখানে যে শান্তি পাড়া ছিলো সেটার কি হাল দেখছি। শুধু চাকচিক্যময় কিন্তু শান্তি গেলো কই?
পরিবেশ- কি আর বলব — শান্তি পাড়ার সত্যদের বাড়িই তো আজ দুর্জনদের দখলে। সত্যদের ব্যবসা বানিজ্যে চোরাকারবারি আর লুটেরাদের জন্য সুনাম ধরে রাখতে পারেনি। সত্যদের বাড়ি দেখলেই মনটা ভালো লাগতো কিন্তু এখন সব ভালো হারিয়ে মন্দের বসবাস।
সভ্যতা- আচ্ছা সত্যদের না হয় সব নষ্ট হয়েছে কিন্তু ঐ যে ন্যায়নীতির খবর কি? তারা নিশ্চয়ই আগের মতো আছে।
পরিবেশ- কি বলব, ন্যায়নীতির দুই ছেলের লোভ লালসা এতোই বেড়ে ছিলো যে তারা গোপনে অবৈধ সব জিনিস কেনা-বেচা শুরু করে দিলো। অর্থের লোভে দেশের ভালো জিনিস সব পাচার করছিল। এভাবে করতে করতে একদিন অনেক ধন সম্পত্তির মালিক হলো ঠিকই কিন্তু শান্তি হারিয়ে গেলো।
সভ্যতা – চারিদিকে শুধু খারাপ খবর। কোথাও কি ভালো কিছু নেই? আচ্ছা বলতো শৃঙ্খলার খবর কি? কি গোছানো পরিপাটি ছিলো সব। এখন নিশ্চয়ই আরও ভালো আছে?
পরিবেশ- হা হা হা তোমার যে কথা? ওরা তো আরও বদলে গেছে। দুর্নীতি যেনো ওদের নিত্যকার সঙ্গী। মানুষের সাথে প্রতারণা জালিয়াতি করে অর্থের সাম্রাজ্য করেছে ঠিকই কিন্তু ওদের একতা নষ্ট হয়ে গেছে। দেখো ঐ যে বড় বড় আবাসন দেখতে পাচ্ছ এগুলো ওদের। আর এখানে বাস করে বর্তমান সমাজের সুদখোর ঘুসখোর,কালোবাজারি,দুর্নীতিবাজ। তাইতো চাকচিক্যময় অট্রালিকায় সুখ নাই।
সভ্যতা- ভাই আমার যে আর এসব শুনতে ভালো লাগছে না। সময়ের পরিক্রমায় এতো বদলে গেছে সব? আমি চাকচিক্য দেখে ভাবলাম আরও ভালো আছে সব এখন তো তোমার কথা শুনে মনটা বিষাদময় হয়ে গেলো।
পরিবেশ- শোনো শোনো সময়ে সব বদলে যাবে এটাই ঠিক কিন্তু কেন যে খারাপ হলো সেটা মেনে নিতে কষ্ট হয়। আমি তো কালের সাক্ষী হয়ে আছি জানিনা আরও কতো কি দেখব?
সভ্যতা- অনেকের কথাই তো জানলাম কিন্তু এখানে যে খরস্রোতা নদী ছিলো সেটা তো দেখতে পাচ্ছি না। নদীর বুকে কতো পালতোলা নৌকা ভেসে বেড়াতো।মাঝির ভাটিয়ালি গানে প্রাণ জুড়াতো। বাচ্চাছেলেমেয়েরা দলবেঁধে নদীতে গোসল করতো। গাঁয়ের বঁধু কলসিতে জল ভরতো। সেসব কি আর নাই?আর চারিদিকের সবুজের সমারোহ তো তেমন দেখছি না।
পরিবেশ- সেই সব কবেই শেষ হয়ে গেছে। নদীর দুই ধার ভরাট করে সুউচ্চ ভবন নির্মাণ হয়েছে।সরু একটু পানি প্রবাহ দেখা যায় তা শুধু দুই এক মাসের জন্য। আধুনিক সমাজ ব্যবস্থায় কি আর এসব মানায়? দেখছ না চাষের জমি বিরান হয়ে গেছে। ভূমিদস্যুদের জন্য সব আজ নগরে পরিণত হয়েছে। নাগরিক সুবিধা কিছুটা বৃদ্ধি পেলেও আমি আমার ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছি।
সভ্যতা- তোমার এই বিধ্বস্ত রূপ দেখতে ভালো লাগছে না। চারিদিকে চাকচিক্যের বাহার কিন্তু কেমন যেনো প্রাণহীন লাগছে।
পরিবেশ- আমাকে কে রক্ষা করবে? যে বৃক্ষলতা অক্সিজেন দেয় তাদেরকেই তো অকারণে নিধন করছে।সবুজ শ্যামল ছায়া দিব কোত্থেকে? এভাবে চলতে থাকলে আমি আর নিজেকে রক্ষা করতে পারব না। প্রাণীকুলের অবাধ বিচরণ কবেই বন্ধ হয়ে গেছে।ডিজিটাল যুগ তাই তো এসবের কি দরকার? রঙিন নিয়ন আলোর ঝলকানি আর এয়ারক্নডিশনার যেনো তাদের শান্তির জিনিস। তাই তো আমি বিষন্ন ভগ্নহৃদয় নিয়ে বসে থাকি।
সভ্যতা- আচ্ছা রাস্তা ঘাটে তো কাউকে গল্প করতে দেখলাম না।ওখানে খেলার মাঠও দেখলাম সুনসান নীরব।
পরিবেশ- এখন সবাই ব্যস্ত তাই গল্প করার সময় নাই। খেলাধূলা তো এখন ঘরে বসেই করে। সবার ঘরে স্মার্ট ফোন আছে যার মাধ্যমে খেলাধুলা করা যায়। এখন আর পরিবারের সবাই মিলে আড্ডা দেয় না। যান্ত্রিক জীবনে মানুষও আজ যন্ত্রে পরিণত।
সভ্যতা- ভাই তোমাকে কি বলে সান্ত্বনা দিব? বরং এই সমাজের বিবেকবান মানুষের কাছে অনুরোধ করছি চলুন সবাই লোভের আগুনে না পুড়ে সুখী সুন্দর পরিবেশ রক্ষা করি।এই সুন্দর ধরনী সুন্দর রাখতে সবাই মিলে মিশে কাজ করি। ভবিষ্যত প্রজন্মের বসবাসের জন্য নির্মল পরিবেশ রেখে যাই।

Leave a Comment