আজিজুন নাহার আঁখি

মুখোশের আড়ালে ভদ্রবেশী পিশাচ পর্ব – ৮

জয়মালার মনে কি তাহলে সত্যিই প্রেম জেগেছে? জহিরের বাঁশির সুরেই বুঝি জয়মালার হৃদয়ে ভালোবাসার সঞ্চার হয়েছে? যখনই জহিরের সাথে বিয়ের কথা শুনেছে তখন থেকেই জয়মালার লাজুক হাসি সবার চোখে ধরা পরেছে।
হেলেনা বেগম ডাকছে কইরে কই গেলি জয় মা আমার। ঘরে ঢুকেই জয়মালা বলে মা ও মা এই তো আমি।

শোনো মা তোমার বিয়ে ঠিক অইছে তাতে শুধু খুশি অইলে চলব না। তোমার কিন্তু অনেক কিছু শিখন লাগব বুঝন লাগব।
তুমি তো আছোই তুমি আমারে যা কইবা আমি তাই করুম। কিন্তু ঐ বাঁশিওয়ালা খালি আমারে বাঁশি শুনাইব।
হেলেনা বেগম মেয়ের কথায় মুখ টিপে হাসছে। আসলেই আমার মাইয়াডা সেই ছোটোই থাকল।
জয়মালার সাথে কথা বলতে বলতে হেলেনা দেখে মেয়ে ঘুমিয়ে গেছে।

নজর আলী দরজার সামনে জল চৌকিতে বসে কি যেনো ভাবছে, হেলেনা বেগম স্বামীর মুখের তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে কি গো কি চিন্তা করো?
আল্লাহ পাকের অশেষ রহমতে এতো ভালো ছেলে আমাগো মাইয়াডারে বিয়া করবার চায়। তুমি আর চিন্তা কইর না।
মাইয়া তো আমাগো বিছানায় ঘুমায় কিন্তু বিয়ার পর তো আর এইহানে থাক্য পারব না। হেইডা নিয়া ভাবো।
আমি ভাবছি ভিন জেলার মানুষ, বাড়িঘর কিচ্ছু চিনি না, পরে যদি কোনো খারাপ অয় তহন তো কিছুই করবার পারুম না।
খারাপ মানুষ অইবো না। আমার তো তারে ভালা স্বভাবের মনে অয়।

দেখি কাইলকা কালাম মিয়ার সাথে কথা কমু নি, আর এইডাও কমু একখান ছাপরা ঘর দিয়া বিয়ার তারিখ ঠিক করবার।
ঘর দিবার টেকা পয়সা তো কিছু নাই দেখি কারো কাছ থেইকা কর্য করন লাগব।
মানিক রতনের কামাই দিয়া আর আমি চা পান বেইচা যা পাই তা দিয়া কোনোমতে সংসার চালাই।
যুদ্ধের সময় পায়ে গুলি লাগার জন্যই তো আমি সব কাম করবার পারি না। আমার পা হারাইয়া আমি অকর্মা অইয়া গেছি
ছিঃ কি কথা কও তুমি। তুমি অইলা আমাগো জান। আল্লাহ পাক তোমারে আমাগো কাছে ফিরাইয়া দিছে তাতেই খুশি।

এই দেশের মানুষ তোমারে কদর করে নাই তাতে কি অইছে আমি তো অহংকার করি তোমার লাইগা। আইজ তোমার একখান কাগজ থাকলে তুমি কতো সুবিধা পাইতা।
নজর আলী বলে আরে বউ এসব বাদ দেও। আমি সাধারণ মানষের আছি তাই ভালা।
আমার কাগজ লাগব না। আমি আমার দেশের জন্য যুদ্ধ করছিলাম দেশকে ভালোবাসি এই জন্য।
হেলেনা বেগম স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে দেখে, মানুষটার সামনে যুদ্ধের কথা কইলে সে কেমন যেনো অচেনা হইয়া যায়।
আহ এখন ঘুমাও। বিহানে আবার চম্পা গো বাড়ি যাওন লাগব।

নজর আলীর মাথায় অনেক চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। কেনো যেনো মেয়ের বিয়েতে তার মন সায় দিচ্ছে না কিন্তু আবার ভাবছে যেখানে সবাই ভালো বলতাছে সেইখানে খারাপ হইব না।
হেলেনার সাথে আর কোনো কথা না বলে পাশ ফিরে ঘুমানোর চেষ্টা করতে করতে একসময় ঘুমিয়ে পরে।

ঐদিকে জহিরের ভেতরে প্রেমের গান বেজেই চলছে। জয়মালাকে কাছে পাবার জন্য সে ব্যকুল হয়ে গেছে। চোখে ঘুম নেই, অনেক চেষ্টা করেও ঘুম আসছে না তাই বাঁশিতে প্রেমের সুর তুলে। জহির কাজ করুক বা রাতে শুয়ে থাকুক বাঁশি তার সঙ্গের সাথী। আর জয়মালা তার বাঁশির সুর অনেক পছন্দ করে।
রাত্রি দ্বিপ্রহর পার হয়ে গেছে তাই জহিরের বিছানায় গা এলিয়ে দিলো।
সারাদিন অনেক কায়িক পরিশ্রম করে তাই কিছুক্ষণের মধ্যে ক্লান্ত দেহে ঘুমিয়ে পরে।

জহিরের বাঁশির সুরে কালাম মিয়ার ঘুম ভেঙে যায়। কালাম মনে মনে ভাবছে জহিরের জায়গায় যদি আমি থাকতাম। তাহলে আমিও কি এমন ব্যকুল হতাম। হ্যাঁ অবশ্যই ব্যকুল হতাম, যে রূপ মেয়েটার যে কোনো পুরুষ মানুষের হৃদয়ে দোলা দিবে হোক সে প্রতিবন্ধী কিংবা পাগলী।
কালাম মিয়া এসব ভাবছে আর মনে মনে হাসছে। ছিঃ এসব কি ভাবছি আমি? ও তো আমার মাইয়ার মতো। তবুও তার মনে এক ধরনের ভালো লাগা কাজ করে।
কালাম মিয়া ভাবছে যদি নজর আলী মেয়ের বিয়েতে রাজি হয় তাহলে তাকে প্রস্তাব দিবে যে, জহির আমার বাড়িতে কাজকর্ম করব আর আমার বাড়িতেই বউ নিয়া সংসার করব।
কিছু না করতে পারি মাইয়াডা তো চোখের সামনে ঘুইরা বেড়াইব। এসব এসব ভাবতে ভাবতে কালাম মিয়া ঘুমিয়ে পরে।

ভোরে খুব ফুরফুরে মেজাজ নিয়ে জহির কাজের জন্য মাঠে যায়। তার বারবার মনে হচ্ছে নজর আলী চাচা বিয়েতে রাজি হবে। কালাম চাচার কথায় তো সে রকমই মনে হলো। মাঠে যাওয়ার পথেই মানিক রতনের সাথে দেখা। ওরা বিয়ের কথা কিছুই বললো না। মা বলেছে জহিরের সাথে বিয়ে নিয়ে কোনো কথা না বলতে।

নজর আলী আগে পাকা কথা দিয়ে বিয়ের দিন তারিখ ঠিক করে আসুক তারপর বলতে। অন্যান্য দিনের মতোই মানিক রতন জহিরের সাথে স্বাভাবিক কথাবার্তা বলছে দেখে জহিরের মনে দুশ্চিন্তা বাড়ছে। জহির ভাবছে তাহলে কি জয়মালাকে সে পাবে না? নিশ্চয়ই চাচা রাজি হয়নি। হবেই বা কেন ভীনদেশী যুবককে বিশ্বাস করতে পারছে না।
যদি ওদের বাড়িতে বিয়ের কথাবার্তা হতো তাহলে তো মানিক রতন জানার কথা। আর ওরা দুই ভাই আমাকে খুব পছন্দ করে এটা আমি বুঝি। মানিক রতন নানা ধরনের কাজের কথা তুলছে কিন্তু ভুলেও বোনের বিয়ে নিয়ে একটা কথাও বলছে না। জহিরের কপালে চিন্তার রেখা স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে। হৃদয়ের ভিতরে কষ্টের বীণ বাজার শব্দ হচ্ছে। সারারাত কতো সুখের স্বপ্ন দেখলো সব বুঝি মিছে হয়ে যাবে?

চলবে——–

Leave a Comment