জহিরের কানে শুধু একটা কথা বেজেই চলছে ও বাঁশিওয়ালা সবারে কইলেন আমারে তো কইলেন না। জয়মালার মিষ্টি মুখের হাসি আজ ভুলতেই পারছে না। সারারাত এপাশ ও পাশ করে কাটিয়ে দিল। ভোর হতেই যথারীতি কাজে বেরিয়ে পরলো কিন্তু মনে মনে শুধু জয়মালাকেই ভাবছে।জয়মালার সারল্য তাকে মুগ্ধ করেছে। দিনের বেলায় মনে মনে স্থির করেছে মালিককে আজ জয়মালার কথা বলবে।
রাতের খাবার খেয়ে কালাম মিয়া বারান্দায় বসে আছে ঠিক তখন জহির এসে বলে চাচা ও চাচা, কালাম মিয়া হাসিমুখে বলে ও কেডা জহির না কি?
কি হইছে বাবা কিছু বলবা? তোমাগো তো বাড়ি যাওনের সময় হইছে, টাকা পয়সা তো কিছু পাইবা, আগামীকাল সব শোধ কইরা দিমু নে।
না চাচা টাকা পয়সার কথা কইতে আসি নাই আর আমার তো বাড়িতে কেউ নাই তাই বাড়ি যাওয়ার তাড়া নাই।আমি অন্য একটা কথা কইবার চাই চাচা আপনি অভয় দিলে কইতাম।
আরে কি কও বাবা তুমি হইলা আমার ছেলের মতো নির্ভয়ে কও।
চাচা আমি আপনে গো এলাকায় থাকবার চাই। আপনি যদি ব্যবস্থ কইরা দিতেন।
বাবা জহির আমার জমিতে কাজ করলে তো আমারই ভালো কিন্তু তুমি কি কইতাছ একটু বুঝাইয়া কওতো,
চাচা আমি আর দেশে যাইবার চাই না। ঐখানে আমার কেউ নাই আর আমাগো দেশে তেমন কাজকর্ম নাই। তাই এইখানেই থাকবার চাই।
তুমি আমার বাড়ি থাকলে আমার আপত্তি নাই। কিন্তু তোমার তো এখন বিয়া করার সময় হইছে। একলা একলা আর কতো দিন থাকবা?
চাচা আমি আপনাগো পাড়ার মেয়া বিয়া কইরা সংসার করবার চাই।
জহির কি কইলা বাবা আমাগো পাড়ার কোনো মাইয়া তোমার পছন্দ হইছে? আমারে খুইলা কও দেহি আমি ব্যবস্থা কইরা দিমুনি।
হ চাচা ঐ যে নজর আলী চাচার মাইয়া জয়মালারে আমার বউ বানাইবার চাই। আপনি যদি ঐ বাড়িতে কথা কইতেন আর তারা রাজি আছে কি না তা জানলে উপকার অইতো।
জহির হেসে বলে ও তুমি নজর আলীর ঐ প্রতিবন্ধী মেয়ারে পছন্দ করছ? ও তো আর দশটা মাইয়াগো মতন না তুমি সংসার করবা কেমনে? ওর মা ওরে দেইখা রাখে কোনো কাজকর্ম পারে না। ভাইবা দেখ বাবা, সংসার তো একদিনের জন্য না।
জহির মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে কালাম মিয়ার সব কথা শুনতেছে। এবার জহির বললো চাচা মেয়াটারে আমার ভালো লাগছে আর ঐ বাড়ির সব মানুষের সাথে আমার একটা ভালো সম্পর্ক অইছে। উনারা রাজি থাকলে আমার সমস্যা নাই। জয়মালার যা সমস্যা আছে তা আমি মাইনা নিয়াই তো বিয়া করবার চাই। আপনে উনাদের লগে কথা কইয়া আমারে জানান।
আচ্ছা জহির ধর ওরা রাজি অইলো তখন তুমি ঐ মাইয়ারে নিয়া কই থাকবা? নজর আলীর বউ মাইয়ারে দূরে যাইতে দিব না।
চাচা উনারা যদি উনাদের বাড়িতে আমারে থাকবার দিবার চায় তাইলেও আমি রাজি।
ঠিক আছে বাবা জহির আমি কাইল হাঁজের সময় নজর আলীর বাড়িতে যামুনি।
জহিরের চোখে-মুখে তখন খুশির ঝিলিক। হাসিমুখে কালাম মিয়ার কাছে বিদায় নিয়া চলে আসলো।
জহির বিছানায় শুয়ে শুধু এপাশ ওপাশ করছে। তার নানান উত্তেজনা খেলা করছে। ভাবছে যদি রাজি না হয় তাহলে কি করব? জয়মালার সহজ সরল ব্যবহার তাকে বারবার হৃদয়ে দোলা দিয়ে যাচ্ছে। আচ্ছা চাচা বললো জয়মালা প্রতিবন্ধী। এটা কতটা? যাকগে যাই থাকুক আমার জয়মালাকে চাই। জয়মালার মুখচ্ছবি চোখে ভেসে বেড়াচ্ছে নাহ আর তর সইছে না। এসব ভাবতে ভাবতেই জহির ঘুমিয়ে পরলো।
সারাদিন নানান কাজে জহির ব্যস্ত থাকলেও বারবার মনে পরছে জয়মালার কথা।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে গেছে। জহির ভাবছে কালাম চাচার কি মনে আছে গতরাতের কথা? আমি মনে করিয়ে দিব? আবার লজ্জাও পাচ্ছে। উঠোনের কোণে হাস্নাহেনা গাছের ফুলগুলোর সৌরভে চারিদিক মৌ মৌ করছে। জহির ওখানে দাঁড়িয়ে জয়মালার কথা ভেবে চলেছে। হটাৎ পিছনে কার যেন পায়ের শব্দ শুনে চমকে পিছনে তাকায়।
কালাম মিয়ার ডাক , ও জহির কি অইছে বাবা? নানা চাচা কিছু অয় নাই।
আমি নজর আলীর বাড়ি যাইতাছি, তোমার বিয়ার প্রস্তাব দিয়া দেখি কি কয়।
ঠিক আছে চাচা আপনি যান।
কালাম মিয়া হাসিমুখে চলে গেল।
আজ নজর আলী দোকান থেকে তাড়াতাড়ি বাড়ি আসছে।কয়দিন যাবত শরীর ভালো যাইতেছে না।
রাস্তা থেকেই কালাম মিয়া জোরে জোরে ডাকছে নজর আলী ও নজর আলী বাড়ি আছো না কি?
ঘর থেকে ডাক শুনে হেলেনা বেগম কে বলে, ও জয়মালার মা দেখতো কেডায় ডাকে?
হেলেনা বেগম উঠোনে বের হয়ে দেখে কালাম মিয়া দাঁড়িয়ে আছে।
একটু এগিয়ে গিয়ে বলে ও ভাইজান আইছেন? চলেন ঘরে চলেন জয়মালার বাপের শরীরটা ভালো না তাই শুইয়া আছে।
কালাম মিয়া ঘরে ঢুকেই জিজ্ঞেস করে কি নজর ভাই কি অইছে?
না ভাই কিছু হয় নাই। তোমার সাথে জরুরি কথা আছে।
নজর আলী একটু ভরকে যায়। কি কথা ভাই আমারে ডাক দিতেন আমিই যাইতাম। আপনি অইলো কতো ব্যস্ত থাকেন।
আরে সব কথা সব জায়গায় কওয়া যায় না। তোমার বউরেও ডাক দেও।
এবার নজর আলী রীতিমতো ভয় পাচ্ছে। না জানি তার ছেলেরা কি করছে?
ও জয়মালার মা এখানে আইসো ভাই কথা কইবো।
পাত্রস্থ করতে পারেন নাই। আমি ওর জন্য একটা সম্মন্ধ আনছি।
আমি ভাইজানরে কিছু খাইতে দেই।
না ভাবী কিছু খাইতাম না। আপনে বসেন, জরুরি কথা কওনের লাইগা আইছি। আমারে একখান পান দেন আর কিছু লাগত না।
আচ্ছা নজর ভাই তোমার মেয়া কই? ওরে যে দেখতাছি না।
ও ঐ যে ভাইয়ের বউ গো সাথে আছে। কেন ভাই ডাক দিমু?
না না ডাক দেওন লাগব না। যাওনের সময় দেইখা যামুনি।
ভাবী মেয়ার তো বিয়ার বয়স কবেই অইছে। কিন্তু এখনো তোহেলেনা বেগম বলে, ভাইজান আপনে তো জানেন আমার মাইয়া আর দশ জনের মতো না। কেডা ওরে নিয়া সংসার করব?
আরে ভাবী আছে পাত্র আমার হাতেই আছে। আপনারাও তারে চেনেন, ছেলে ভালো, কর্মঠ,দেখতেও সুন্দর। সবার পছন্দ অইবো এডা আমি হলফ কইরা কইতে পারি।
নজর আলীর দুশ্চিন্তা কমছে। ভাই কন দেহি কোন পোলায় আমার মাইয়া বিয়া করবার চায়?
কালাম মিয়া বলে, আমার বাড়িতে যে কাজ করে জহির,, সেই জহির তোমার মাইয়ারে বিয়া করবার চায়। ও আমারে পাঠাইছে। তোমার মাইয়ার সব সমস্যা মাইনা নিয়াই সে বিয়া করবার প্রস্তাব পাঠাইছে। এখন তোমরা ভাইবা দেখ। পোলাডার দেশে বাপ মা কিছু নাই বিয়া কইরা এহানেই থাকব। তোমরা ভাইবা চিন্তা আমারে জানাইও।
হেলেনা বেগম কি বলবে বুঝতে পারছে না সে তার স্বামীর দিকে চেয়ে আছে।
নজর আলী বলে ঠিক আছে ভাই। আমি আপনেরে ২/১ দিনের মধ্যে কমুনি।
কালাম মিয়া ঘর থেকে বের হচ্ছে ঠিক তখন জয়মালা এসে পরে। কালাম মিয়া কয়েক বছর পর ওকে দেখে বিস্মিত হয়। জয়মালার সৌন্দর্য দেখে তার ভিতরে কেমন যেনো করতে থাকে——
চলবে—-






