ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠেই জহির অন্য সবার সাথে জমিতে ধান কাটতে যায়। তবে সারাক্ষণ জয়মালার মুখচ্ছবি চোখে ভেসে বেড়াচ্ছে। কি আছে ঐ মেয়েটার মধ্যে? এই অল্প কয় দিনের দেখায় অনেক মায়া জন্মাইছে। কাজ করছে আর ভাবছে আজও ওদের বাড়ি যাবে।
ফসল কেটে বাড়ি ফিরে নদীতে গোসল করার জন্য সবাই মিলে রওনা হলো। জহিরও সবার সাথে গল্প করতে করতে যাচ্ছে। হটাৎ পথিমধ্যে জয়মালা আর ওর মাকে দেখতে পেলো। জয়মালাও গোসল করে বাড়ি ফিরছে। ভেজা গায়ে জয়মালাকে দেখে জহিরের মনে এক অসীম ভালোলাগার শিহরণ জাগে। ভেজা চুলের পানি ওর গা বেয়ে নিচে নামছে ঠোঁটের উপর বিন্দু বিন্দু পানির ফোঁটায় অপূর্ব লাগছে। একপলকের দেখায় জহির আজ বিমোহিত। সবার সাথে গোসল করে বাড়ি ফিরে খাওয়া দাওয়া শেষ করে আবার মাঠে গেলো।
আজ জহিরের কাজে মন নেই কেমন যেনো উদাসীন হয়ে আছে। মনে মনে জয়মালার কথা ভাবছে। আজ সন্ধ্যার পরে মানিক রতনের সাথে ওদের বাড়ি যাওয়ার পরিকল্পনা করছে।
সন্ধ্যা না হতেই আকাশে কালো মেঘের ঘনঘটা। এখনই বৃষ্টি নামবে। আর মানিক রতনের সাথে আজ দেখাও হয়নি। জহিরের মনটা বিষাদে ভরে গেলো। হটাৎ করে জহির নাম ধরে কে যেনো ডাকছে
জহির ভাই ও জহির ভাই।পেছন ফিরেই দেখে মানিক দাঁড়িয়ে। জহির ভাই চলো যাই আমাগো বাড়িতে, আইজ রাইতে মা খিচুড়ি রানবো। তুমিও আমাগো লগে খাইবা। জহিরের মনের ইচ্ছে তো ওদের বাড়ি যাওয়া কিন্তু খাওয়ার কথা শুনে ইতস্তত করছে। না মানিক ভাই আইজ না কাইল যামু নে।
মানিক তো নাছোড়বান্দা প্রায় জোর করেই জহিরকে নিয়ে যাচ্ছে। অগত্যা জহিরও মানিকের সাথে খোশগল্প করতে করতে ওদের বাড়ি এসে পৌঁছলো।
সন্ধ্যা গড়িয়েছে হেলেনা বেগম উঠোনের এক কোণে মাটির উনুনে খিচুড়ি রান্নার আয়োজন করছে। মানিক রতনের বউরাও শাশুড়িকে রান্নায় সাহায্য করছে। আর জয়মালা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মায়ের রান্না করা দেখছে। মানিক তার মাকে ডাকছে মা ও মা দেখ কারে নিয়া আইছি? ওহ বাবা জহির তুমি আইছ খুব ভালা হইছে। হ্যাঁ চাচী মানিক ভাই আমারে জোর কইরা নিয়া আইলো তাই আমিও চইলা আইলাম। দাঁড়িয়ে মায়ের রান্না করা দেখছে। মানিক তার মাকে ডাকছে মা ও মা দেখ কারে নিয়া আইছি? ওহ বাবা জহির তুমি আইছ খুব ভালা হইছে। হ্যাঁ চাচী মানিক ভাই আমারে জোর কইরা নিয়া আইলো তাই আমিও চইলা আইলাম।
সেদিন জহির তার মা মারা গেছে বলছে সেদিন থেকেই হেলেনা বেগমের ছেলেটার জন্য অনেক মায়া তৈরি হইছে।
জয়মালা জহিরকে দেখে খুব খুশি হলো। দেখামাত্র দৌড়ে কাছে এসে বলছে আপনি আইছেন ভালা হইছে।আইজকাও কিন্তু আমাগো বাঁশি শোনান লাগব। হ্যাঁ এইটা বইলা দিলাম কিন্তু।
জয়মালা আজ লাল রঙের জামা পরেছে, দেখতে বেশ লাগছে। জয়মালার দিকে নজর পরতেই জহিরের চোখে মুখে খুশির রোশনাই ঝরে পরে। সারা শরীরে সুখের তরঙ্গ খেলে যায়। জহিরের চোখ যেন আর সরতেই চায় না।
ঘর থেকে রতন বের হয়ে বলে জহির ভাই বাঁশি বাজান। জহির আর দেরি করে না। উঠোনে বসে বাঁশিতে মধুর সুর তোলে। বাঁশির সুরের মাদকতায় আজ সবাই মোহিত। জয়মালার মুখে কোনো কথা নেই যে কি না চঞ্চল সে আজ চুপচাপ হয়ে আছে। জয়মালার মনেও এক অন্যরকম সুখের বাতাস বইছে। বারবার জহিরকে দেখছে আর হাসছে। এ যেনো এক স্বর্গীয় অনুভূতি।
নজর আলীর ডাকে সবাই ফিরে তাকালো। সে হেলেনাকে খাবার দিতে বলছে এই যে বাবারা চল চল খাইতে চল। মেলা রাইত অইয়া গেছে। খাওন দাওন শেষ কইরা ফেল। আকাশে মেঘ করছে যে কোনো সময় ঢল নামবো।
সবাই একসাথে বসে খুব মজা করে খেলো। হটাৎ করে জহির কান্না করছে। সে তার মাকে দেখেনি এই দুনিয়ায় তার কেউ নাই তাই এতো আনন্দ দেইখা তার খারাপ লাগছে।হেলেনা বেগম জহিরের মাথায় হাত দিয়ে আদর করছে বাবা জহির তুমি আমাগো বাড়ি যখন খুশি আইসো। জহির কোনো কথা বলছে না সে শুধু মাথা কাত করে সম্মতি জানায়। জয়মালা জহিরের দিকে নিবিড় ভাবে তাকিয়ে আছে।
জহিরও মনে মনে ভাবছে আর দেরি করা যাবে না। আইজই মালিকরে বলতে হবে আমি জয়মালাকে বিয়া করুম আপনি ব্যবস্থা কইরা দেন। সবার কাছে থেকে বিদায় নিয়ে বাড়ি থেকে বেরুতে যাচ্ছে তখন জয়মালার ডাক এই যে বাঁশিওয়ালা সবাইরে কইলেন আমারে তো কইলেন না? কাইল আবার আইবেন কিন্তু। জহিরের হৃদয়ে ভালোবাসার আলো জ্বলছে আর—–






