জয়ামালা যৌবনে পা দিলেও মনের দিক দিয়ে সেই শিশুই আছে। চম্পার বিয়েতে সারা গ্রামের মানুষের দাওয়াত দিয়েছে। জয়মালার পরিবারও বাদ যায়নি।
শুক্রবার চম্পার বিয়ে তাই হেলেনা সকাল সকাল বাড়ির সব কাজ সেরে নিয়েছে। জয়মালা তার পোষা ছাগলের বাচ্চাকে নিয়ে খেলছে। হেলেনা ডাকছে জয় মা গেলি কনে? আয় তোর চুল বাইন্ধা দেই। একটু ছুনু পাউডার মাখাইয়া দেই। আইজ তো চম্পার বিয়া।
এ কথা শুনেই জয়মালা বলছে মা ও মা তাড়াতাড়ি সাজাও আমারে। আমি চম্পার বিয়ার দাওয়াতে যামু। মা ও মা মা গো চম্পার বিয়া অইবো কি মজা কি মজা চম্পা কত্তো সুন্দর কইরা সাজব। হেলেনা মেয়েকে সাজিয়ে ঘরে তোলা একখান জামা এনে পরিয়ে দিলো।
আইজ মানিক রতন রিকশা চালাইতে যায় নাই। নজর আলী চায়ের দোকান বন্ধ করেই বাড়ি এসে সবাইকে নিয়ে বিয়ে বাড়ি গেল। চম্পাদের বাড়ি ভর্তি মানুষ। মাইকে বিয়ার গীত বাজতেছে। সবাই মিলে অনেক মজা করছে। চম্পার বাবা বিয়ের পর যখন বরের হাতে মেয়েকে তুলে দিচ্ছে তখন চম্পাও কাঁদছে ওর বাবাও। জয়মালা মায়ের হাত ধরে দাঁড়িয়ে সব দেখছে। চম্পাকে যখন বরপক্ষ নিয়ে যাচ্ছে তখন চম্পা আর ওর পরিবারের সবার কান্না দেখে জয়মালাও জোরে জোরে কান্না শুরু করে দিলো।
সন্ধ্যা হয়ে আসছে তাই ওরা সবাই বাড়ি ফিরল। রাতে জয়মালা মায়ের গলা জড়িয়ে কান্না করে বলছে মা ও মা আমারে বিয়া দিও না। আমি তোমাগো ছাইড়া কোত্থাও থাকা পারুম না। জয়মালার সমবয়সী প্রায় সবার বিয়ে হয়ে ছেলেপেলে হইছে কিন্তু জয়মালা ঠিক শিশুই আছে। দেখতে দেখতে আরও কয়েক বছর পার হয়ে গেলো।
১৯৯৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। জয়মালার বিয়ে না হলেও মানিক রতনের বিয়ে হইছে। নজর আলীও আগের মতো চলতে পারে না। কালাম মিয়া নজর আলীর খুব কাছের মানুষ তাই একদিন নজর আলীকে ডেকে বলে তোমার পোলাগো রিক্সা চালান লাগব না আমার জমি চাষ কইরা খাও। আল্লাহ পাক আমারে অনেক দিছে। ফসলের দুই ভাগ তোমাগো আর এক ভাগ আমারে দিও। নজর আলীও তার কথায় সায় দেয়। কালাম মিয়ার দুই ছেলের মধ্যে একজন ঢাকা ভার্সিটিতে পড়ে আরেক জন ঢাকা মেডিকেলে পড়ে। এ নিয়ে কালাম মিয়ার গর্বের শেষ নাই। মানিক রতন দুজনেই কালাম মিয়ার জমি বর্গা চাষে রাজি হয়ে যায়। এভাবে ভালোই চলছিলো ওদের দিনকাল।
কালাম মিয়ার বাড়িতে ফসল কাটার সময় সেই গাইবান্ধা, রংপর, লালমনিরহাট সহ বিভিন্ন জেলা থেকে শ্রমিক আসে। এবারও ১০/১২ জন এসেছে। ওরা দুই মাসের মতো থাকে। কাজ শেষ হলেই এলাকায় চলে যায়। যদিও মানিক রতন বর্গাচাষি তবুও কালাম মিয়ার বাড়িতে আসা যাওয়া নিয়মিত। সন্ধ্যার পরে দুই ভাই মিলে শ্রমিকদের সাথে আড্ডা দেয়। আড্ডা দিতে ওদের মধ্য থেকে জহির নামের এক যুবকের সাথে বেশ ভাব হয়।
জহিরও মানিক রতনের সাথে ওদের বাড়ি আসে। জহির খুব সুন্দর বাঁশি বাজায় যা সবাইকে মুগ্ধ করে।
জহির এলেই জয়মালা ঘরের বাইরে আসে। আর বলে বাঁশি শোনাও। হেলেনার শঙ্কিত হয় তার মেয়ে অস্বাভাবিক হলে কি হবে দেখতে মোটামুটি ভালোই। আর কাছের মানুষ ছাড়া বাইরের কেউ হটাৎ করে বুঝতে পারবে না জয়মালার অস্বাভাবিক আচরণ।
হেলেনা মেয়েকে সব সময় উপদেশ দেয় বলে জয় মা আমার কোনো বেডা মানষের কাছে যাবি না, কথা বলবি না। কেউ কিছু দিলে খাবি না আরও অনেক কিছু। মেয়ে মায়ের কথায় হাসতে হাসতে বলে মা ও মা বাবাও তো বেডা মানুষ আমিতো বাবারে কত্তো আদর করি বাবাও আমারে কত্তো আদর করে। মেয়ের এ ধরনের কথায় হেলেনা মাঝে মাঝে রেগে যায় বেশিরভাগ সময় আড়ালে চোখের জল ফেলে।
জহিরের বাঁশির সুর শুনে জয়মালা কেমন যেনো উতলা হয়ে যায়। মেয়ের এই রূপ হেলেনা আগে কখনো দেখেনি। এতোদিন তো শিশুসুলভ ভাব দেখেছে। হেলেনা মনে মনে খুশি হয় ভাবে দেরিতে হলেও তার মেয়ে বড় হচ্ছে।
৩/৪ দিন পরে একদিন সন্ধ্যায় জহির মানিক রতনের সাথে ওদের বাড়ি আসে। কথায় কথায় হেলেনাকে জহির বলে খালা জানেন আমার মা সেই ছোটো বেলায় মইরা গেছে আপনেরে আমার মায়ের মতন লাগে। মায়ের স্মৃতিচারণ করতে করতে কান্না করতে থাকে। হেলেনা মায়ের রূপে জহিরকে কাছে টেনে নেয় সান্ত্বনা দেয়। এভাবে কয়েক দিনের মধ্যেই জহিরের সাথে খুব সখ্যতা গড়ে ওঠে। জয়মালার সাথে জহির কখনো আলাদা করে কথা বলেনি তাই সে বোঝেনি জয়মালা মানসিক ভাবে অপরিণত। কিন্তু চোখের দেখায় ভালো লেগে যায়।
সেদিন পূর্ণিমা ছিলো আর জহির জয়মালাদের বাড়ির উঠোনে বসে সবাইকে বাঁশি বাজিয়ে শোনায়। আড়চোখে জয়মালাকে দেখে উৎফুল্ল হয়ে যায়। গভীর রাতে কালাম মিয়ার বাড়িতে ঢোকার পরই তার ডাক পরে, জহির তোরে মালিক ডাকে। জহির ভেতরে ঢুকতেই কালাম মিয়ার দরাজগলায় বলে জহির তোমারে তো পাওয়াই যায় না। আজ্ঞে চাচা কি কইবেন? আমি কি কাজ ফাঁকি দিছি?
আরে নাহ বাপু তোমার তো সন্ধ্যার পরে দেখাই যায় না।
জহির বলে চাচা আমি তো মানিক রতনগো বাড়ি গেছিলাম। কেন কোনো সমস্যা আছে? আরে নাহ বাপু সমস্যা নাই। আইচ্ছা আর তো ৭/৮ দিন আছে তারপরে তো দেশে যাইবা। তোমার কাম কাইজ আমার পছন্দ হইছে। তুমি চাইলে আবার আইতে পারো।
জহির মুচকি হেসে বলে চাচা আমি আর কই যামু? আমার তো বাপ মা কেউ নাই। আপনে কাম দিলে থাইকা যাইতাম।
কালাম মিয়ার কাছ থেকে ঘরে আইসা জয়মালার কথা ভাবতে থাকে। একবার ভাবে হেলেনার কাছে সরাসরি বলব খালা আপনের মেয়ারে আমায় দিবেন? আবার ভাবছে মানিক রতনরে বলব। এসব ভাবতে ভাবতে জহির ঘুমের রাজ্যে———-






