আজিজুন নাহার আঁখি

মুখোশের আড়ালে ভদ্রবেশী পিশাচ – পর্ব ৩

হেলেনার প্রচুর রক্তক্ষরণ হওয়ার সে মাঝে মাঝেই অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছে। আর জ্ঞান ফিরলেই সে স্বামীর খোঁজ করছে। আম্বিয়া বেগম নাতনিকে কোলে নিয়ে বসে আছে। কিন্তু তার চোখে মুখে শঙ্কার ছাপ। একমাত্র ছেলে নজর আলীকে যেনো আল্লাহ পাক সুস্থ অবস্থায় ফিরিয়ে আনে এজন্য সারাক্ষণ দোয়া করছে। চারিদিকে জয়বাংলা ধ্বনিতে মুখরিত। বেলা গড়িয়ে যখন পশ্চিম আকাশে ঢলে পরছে ঠিক তখন গ্রামের অধিকাংশ মানুষ নদীর দিকে ছুটছে।এতোক্ষণ সারা গায়ে জানাজানি হয়ে গেছে সোহেল ও তার দলের আরো দুই জনের শহীদ হবার খবর। সোহেলদের বাড়িতে লোকে লোকারণ্য পা ফেলার জায়গা নাই। সোহেলের মা অজ্ঞান হয়ে গেছে। সোহেলের খবর নিশ্চিত জানলেও অন্য দুজনের নাম কেউ বলতে পারছে না।

সন্ধ্যার আগেই দুইটি ডিঙ্গি নৌকা পাড়ে এসে ভিরলো। একটা নৌকায় সোহেলের লাশ পতাকায় আবৃত ও সাথে ৪/৫ জন মুক্তিযোদ্ধা। আরেকটি নৌকায় কে যেনো চাদর মুড়িয়ে শুয়ে আছে বাইরে থেকে ঠিক চেনা যাচ্ছে না। গায়ের লোকজন দৌড়ে এসে নৌকা থেকে সোহেলের লাশ নামালো। অন্য মুক্তিযোদ্ধারা এক এক করে নামলো কিন্তু একজন নামতে পারছে না।
পাড়ে দাঁড়ানো মানুষের কৌতূহল বেড়েই চলছে। তাদের মধ্য থেকে একজন নৌকায় ওঠে চাদর সরিয়েই জোরে বলে এই দেখ এটা তো নজর আলী।

নিজের পায়ে হেটে বাড়ি যাবার মতো অবস্থা তার নাই। দুই তিনজন কোলে করে নৌকা থেকে নামিয়ে আনলো। নজর আলী শুধুই কেঁদেই চলছে। একদিকে পায়ে গুলি লাগায় প্রচুর ব্যথা করছে আর অন্যদিকে প্রাণপ্রিয় সোহেলের মৃত্যু। যার ডাকে দেশ স্বাধীন করার জন্য যুদ্ধে করলাম সে আজ নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে।

নজর আলীকে দুই তিনজন ধরাধরি করে ওদের বাড়িতে নিয়ে গেল।
আম্বিয়া বেগম কূপি জ্বালিয়ে নাতনি কোলে বসে আছে আর ব্যথা কাতর হেলেনা শুয়ে শুয়ে কাঁদছে।
নজর আলীকে নিয়ে যারা বাড়ি পৌঁছলো তাদের মধ্য থেকে একজন বলছে চাচী ও চাচী। কেডায় ডাকে?

একটা খবর দিবার আইছি। চাচী ও চাচী তোমরা শুনছ যুদ্ধে সোহেল ভাই শহীদ হইছে আর নজর ভাইও
কথা শেষ হতে না হতেই আম্বিয়া বেগম কান্না করতে করতে নাতনী কোলে নিয়ে বাইরে চলে আসে। আম্বিয়া বেগম ভাবছিল তার নজরও শহীদ হইছে কিন্তু চোখের সামনে ছেলেকে দেখে আঁচলে মুখ মুছে নিলো।
নজর বাপ আমার দেখ দেখ আইজকা তোর মাইয়া হইছে। দেশও স্বাধীন হইলো তুইও ফিরলি আর আমাগো নাতনী আইলো।

নজর পায়ের ব্যথার যন্ত্রণা সহ্য করতে না পারলেও মেয়েকে দেখে সব কষ্ট যেন দূর হলো। ঘরে গিয়ে হেলেনার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলল আমার মেয়ের নাম রাখলাম জয়মালা।
জয়মালার বয়স ৪ বছর পার হলেও সে অন্য বাচ্চাদের মতো না। কথা শিখেছে অনেক দেরিতে। কেমন যেনো ভোলা ভালা স্বভাবের। এর মধ্যে জয়মালার দুইটা ভাই হইছে। একজনের নাম মানিক আরেক জনের রতন।

সুখে দুখে হেলেনা আর নজরের সংসারে অভাব থাকলেও সুখের কমতি নাই। গেলো বছর কার্তিক মাসে আম্বিয়া বেগম ইহলোক ত্যাগ করেছে।

জয়মালা, মানিক,রতনকে নিয়ে সুখেই কাটছে নজর আলীর সংসার। কিন্তু জয়মালা অন্যদের চেয়ে একটু আলাদা তাই তাকে নিয়ে বাবা মায়ের চিন্তার অন্ত নাই। ধীরে ধীরে অনেক সময় পার হয়ে গেলো। হেলেনা মেয়েকে সবসময় আগলে রাখে। খেলার সাথী বলতে দুই ভাই মানিক রতন। আর মাঝে মাঝে কালাম মিয়ার মেয়ে চম্পার সাথে গল্প করে। কালাম মিয়া অনেক জমিজমার মালিক । কৃষি কাজ করলেও টাকা পয়সার তেমন সমস্যা নাই। নিজে পড়াশোনা জানে না বলে ছেলে মেয়েদের পড়াশোনার ব্যাপারে অবহেলা করেনি। দুই ছেলেই মেধাবী ছাত্র আর চম্পাও লেখাপড়ায় ভালো। চম্পা মাঝে মাঝে জয়মালাকে ওদের বাড়ি নিয়ে যেয়ে চায়। তবে হেলেনা মেয়েকে একা ছাড়তে ভয় পায়।

এইতো সেদিন চম্পাদের টিভি কিনে আনছে আর সেটা দেখার জন্য পাড়ার সব লোক ওদের উঠোনে জড়ো হয়েছে। মানিক রতন মাঝে মধ্যে টিভি দেখতে যায় কিন্তু জয়মালা কখনো যায়নি। কালাম মিয়ার বাড়িতে বিভিন্ন ধরনের মানুষ আসা যাওয়া করে তাই হেলেনা মেয়েকে যেতে দেয় না।

১৯৯০ সালের এপ্রিল মাস। জয়মালা কিশোরী থেকে এখন যুবতী। পড়াশোনা করা বলতে মক্তবে গিয়ে আমপারা পরেছে। ওর তো স্মরণ শক্তি কম তাই সে পড়াশোনা করতে পারেনি। ওর ভাই দুটো প্রাইমারি স্কুল পাশ দিয়ে এখন রিক্সা চালায়। নজর আলী বাড়ির কাছে একটা চা পানের দোকান দিয়েছে। জয়মালা সংসারের কাজকর্ম তেমন পারে না। ওর সব কিছুতে অস্বাভাবিক আচরণ হেলেনার চোখ এড়ায় না।
দারিদ্রতার কারণে কখনো ডাক্তার দেখাতে পারেনি। আজ মনে মনে ভাবছে নজর আলী বাড়ি এলেই হেলেনা মেয়েকে ডাক্তার দেখানোর কথা বলবে।

রাতে ঘুমানোর আগে হেলেনা স্বামীকে বলে জয়মালাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে।
এই যে হুনেন এতোদিন তো মেয়াডা ছোটো ছিলো তাই চিন্তা করিনি। এখন ও বড় হয়ে গেছে বিয়ের বয়স হইছে। এখন যদি ও স্বাভাবিক বুদ্ধি না খাটায় তাহলে তো বড় ধরনের বিপদ অইবো।
বউয়ের কথা শুইনা নজর আলীর মুখেও চিন্তার ছাপ স্পষ্ট বুঝা গেল। ঠিক আছে সামনে হাটবার ওরে নিয়া আমি আর তুমি বড় হাসপাতালে ডাক্তারের কাছে নিয়া যামুনি।

রবিবার হলো হাটবার। ঐ দিন সকাল সকাল জয়মালাকে নিয়ে বাবা মা হাসপাতালে গেল। হাসপাতালের ডাক্তার জয়মালাকে দেখে কিছু পরীক্ষা করতে পাঠালো।
পরীক্ষার রিপোর্ট পেতে বেলা ৩ টা বেজে গেল। ডাক্তার সব রিপোর্ট দেখে হেলেনার কাছে জানতে চায় জয়মালা গর্ভে থাকার সময় সে কোনো আঘাত পেয়েছে কি না।

তখন হেলেনার চোখের সামনে ১৯৭১ সালের ১৫ ডিসেম্বরের বিভীষিকা ময় দিনের কথা মনে পরে যায়।কান্না জড়িত কণ্ঠে বলে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাক মিলিটারিরা আমাকে লাথি মেরে উপুড় করে ফেলে দেয়ায় আমি অনেক কষ্ট পাই আর অনেক রক্ত বের হয়। ডাক্তার হেলেনার কথা শুনে বুঝতে পারলেন যে ঐ সময়ের আঘাতে জয়মালার ব্রেনের ভিতর কিছুটা ক্ষতি হয়েছে আর এ জন্যই সে সম্পূর্ণ সুস্থ নয়। জয়মালা এমনই থাকবে অর্থাৎ বয়সে বড় হলেও ম্নানসিক ভাবে সে শিশুর মতো আচরণ করবে।
ডাক্তারের কথায় নজর আলী আর হেলেনার দুশ্চিন্তা আরো বেড়ে যায়।তারা ভাবতে থাকে তাদের মেয়ের ভবিষ্যতে কি আছে? কে ওকে বিয়ে করবে?

জয়মালার কোনো চিন্তা নাই সে আইসক্রিম খাইতে খাইতে বাড়ি চলে আসলো। বিকেলে চম্পা এলো জয়মালাদের বাড়ি। চাচী ও চাচী জানো আব্বা আমারে আর পড়াইব না। আমারে বিয়া দিব। অনেক বড় লোক বাড়ি থাইকা সম্মন্ধ আইছে। উনারা আইজ আমারে দেইখা গেছে দেখ দেখ আমারে আংটি পরাইছে। জয়মালা চম্পার আংটি দেইখা হাসিতে লুটোপুটি খাচ্ছে——

Leave a Comment