আজিজুন নাহার আঁখি

মুখোশের আড়ালে ভদ্রবেশী পিশাচ – পর্ব ২

আগস্টের ১২ তারিখে গভীর রাতে ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে নজর আলী নদী সাঁতরে চুপিচুপি বাড়ি এসে মৃদু কণ্ঠে ডাকতে থাকে বউ ও বউ। ঘুমের মধ্যে আচমকা নজর আলীর ডাকে হেলেনা ধরপর করে উঠে বসলো। আবারো ডাকছে বউ ও বউ আমি গো আমি আইছি ঘরের খিল খোলো। এবার হেলেনা উঠে কূপি জ্বালিয়ে দরজার খিল খুলে দেখে ভেজা কাপড়ে মুখ ভর্তি দাড়ি উসকোখুসকো মাথায় তার স্বামী দাঁড়িয়ে আছে। দ্রুত ঘরে ঢুকেই বউয়ের আঁচলে মাথা মুছে নিলো। হেলেনা কাপড়ের বোচকার মধ্য থেকে শুকনো লুঙ্গি গেঞ্জি এগিয়ে দিচ্ছে আর মুখ ফিরিয়ে আর কাঁদছে। পোশাক বদলে নিয়েই নজর আলী বউকে বুকে জড়িয়ে ধরলো। নজর আলীর সব ক্লান্তি যেনো এক নিমিষেই শেষ হয়ে গেল। বউকে সোহাগে যতই কাছে টানে হেলেনা ততই কান্না করে। হেলেনার চোখ মুছিয়ে দিয়ে পাশাপাশি বসে জিজ্ঞেস করে বউ ও বউ আমার উপর রাগ হইছে? খুব কষ্ট হইছে তোমাগো? হেলেনা বলে আপনি এতো পাষাণ, আমাগো ছাইড়া কই গেছেন? কোন খোঁজ নাই খবর নাই। হেলেনা স্বামীর জন্য ভাত বাড়তে যাবে এমন সময় পিছন থেকে বউকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আর তখনই হেলেনা কান্না করে বলে এভাবে পেটে চাপ দিলে কিন্তু আপনারই ক্ষতি অইবো। নজর আলী কিছু না বুঝে যখন আরও জোরে ধরতে যায় তখন হেলেনা বলে এমনে ধইরেন না। ঐখানে আপনার অংশ আছে। এবার নজর আলী বুঝে গেছে যে সে বাবা হতে চলেছে। এই খুশির খবরে আনন্দে আত্মহারা হয়ে হেলেনাকে কোলে তুলে নেয় আনন্দে আত্মহারা হয়ে বউয়ের কপালে চুমু দেয়। ওদের কথার শব্দে আম্বিয়া বেগম জেগেছে সে বলে বউ ও বউ তুমি কার লগে কথা কও। নজর আলী মায়ের কাছে গিয়ে বলে মা ও মা আমি তোমার বেটা। মা বিছানা থেকে ওঠে ছেলেকে বুকে নেয়।

নজর আলী বলে মা ভোর হওয়ার আগেই নদী পার হইতে অইবো। এদিকে হেলেনা স্বামীর জন্য ভাত বাড়ছে আর সাথে কাঁঠাল বিচির ভর্তা। নজর আলী তৃপ্তি নিয়ে ভাত খেয়ে একটু সময়ের জন্য বিছানায় গেল। হেলেনা স্বামীর মাথায় হাত বুলাচ্ছে আর জিজ্ঞেস করছে আপনি কবে ফিরবেন? যুদ্ধ কি শেষ অইবো না? নজর আলী তখন বললো যে জানিনা কবে শেষ অইবো। এতোদিন তো আমি মুক্তিযোদ্ধা গো কাম করছি অস্রহাতে যুদ্ধ করি নাই। তবে কাইল সোহেল আমাগো সবাইরে নিয়ে কোনহানে জানি যাইব। সেইখানে আমরা অস্র চালানো শিখুম। দেশের জন্য যুদ্ধ করতে গিয়া যদি মইরা যাই তাতেও শান্তি। তোমাগো একনজর দেখার জন্য আইছিলাম। এবার যাওন লাগবো বইলাই মায়ের কাছে বিদায় নেয়। হেলেনা স্বামীর সঙ্গে বাইরে বের হয়। বউকে বলে দেইখা শুইনা থাইকো, মাকে দেইখা রাইখো। বাড়ি থেকে বের হবার সময় গোয়াল ঘরে গিয়ে গাভীটির গায়ে হাত বুলিয়ে অশ্রুসজল চোখে তাড়াতাড়ি নদীর দিকে চলে যায়।

হেলেনা অশ্রুসজল চোখে স্বামীর চলে যাওয়ার দিকে চেয়ে থাকে। ঘরে ফিরেই শাশুড়িকে বলে সে যেনো তার ছেলের আসার কথা কাউকে না বলে। সেদিন শিউলি এসে বলে গেছে যে উত্তর পাড়ার আয়নাল বেপারী রাজাকারে নাম দিছে। কবে জানি সব মুক্তিযোদ্ধা গো পরিবারের উপর হামলা করে। আম্বিয়া বেগমের কপালে দুশ্চিন্তার রেখা স্পষ্ট বুঝা যায়। হেলেনকে কিছু বুঝতে দেয় না। তবে দুশ্চিন্তা হলেও ছেলের জন্য গর্ব হয় তার।
এভাবেই দিন কাটছিলো। এসময়ের মধ্যে তাদের গাভীর একটা লাল রঙের বাছুর হয়েছে। দেখতে দেখতে ৩ মাস পার হয়ে গেল।

সেদিন সাঁঝের সময় শিউলি হাঁপাতে হাঁপাতে হেলেনাদের বাড়ি এসে থমকে দাঁড়ায়। উঠোনে এসে ডাকে ভাবী ও ভাবী। হেলেনা ঘর থেকে বের হয়েই জিজ্ঞেস করে কোনো খবর আছে কি না।
হ্যাঁ ভাবী একটা দুঃসংবাদ আছে। আয়নাল বেপারী জানতে পারছে মিয়া ভাই গো কথা। সে না কি মসজিদে যাওয়ার সময় ঐ বট গাছের তলে বইসা পশ্চিম পাড়ার জলিলের সাথে মুক্তিযোদ্ধা গো ধরার কথা বলতেছিলো। পিছন থাইকা আমাগো টোটন সব শুনছে। ভাবী গো তুমি পোয়াতি চাচীও বুইড়া হইয়া গেছে এখন কই যাইবা কি করবা?
হেলেনা কপালে ভাঁজ ফেলে বলে শিউলি আমি কই যামু। আমার তো বাপ মা কেউ নাই। আমি এহানেই থাকুম। একদিকে তার সন্তান প্রসবের সময় চলে আসছে, স্বামী কাছে নাই আরেক দিকে এই খবর।
ডিসেম্বরের ১২ তারিখ সারাদেশে অস্থিরতা বিরাজ করছে। সোহেলের সাথে নজর আলী সহ আরো ২০/২৫ জন সেঘুরীতে সম্মুখ যুদ্ধে পাক সেনাদের হারিয়েছে। তবে তাদের ৩/৪ জন সহযোদ্ধা শহীদ হয়েছে। নজর আলীর চোখে প্রতিবাদের আগুন জ্বলজ্বল করছে। ১৩ আর ১৪ তারিখে তারা বড় অপারেশন করেছে। উল্লাচরের ব্রিজ উড়িয়ে না দিলে পাক বাহিনী অনেক লোক মেরে ফেলতো। বাড়ির কথা মনে করে ভাবে বাড়ি গিয়ে হেলেনার সাথে দেখা করতে কিন্তু কমান্ডারের হুকুম বাড়ি যাওয়া যাবে না।

১৫ তারিখে আয়নাল বেপারী গ্রামের সাধারণ মানুষের উপর হামলা চালায়। স্পিডবোট করে পাক মিলিটারির দল নদী পার হইতে থাকে। হেলেনা তার শাশুড়িকে খাবার দিচ্ছে এমন সময় গুলির শব্দে ভয়ে নতজানু হয়ে যায়। তাদের বাড়িতে আক্রমণ হলে মৃত্যু ছাড়া কোনো উপায় নাই। তারা দুজনেই আল্লাহকে ডাকতে থাকে। ছোট্ট ছনের ঘরের কোণে জড়সড় হয়ে বসে আছে।

এমন সময় কে যে বলছে মুক্তি কন হে? হেলেনা ভয়ে কাঁপছে, এবার বুঝি প্রাণ যাবেই।আবার জোরে জোরে বলছে মুক্তি কাহা হে? বলতে বলতেই ঘরের ভিতর ঢুকে গেল। আম্বিয়া বেগম বলে আমার এহানে কেউ নাই। এই যে আমি আর আমার পোয়াতি বউ। পোলাডা কয়মাস আগে বজ্রপাতে মইরা গেছে। মিলিটারিরা আম্বিয়ার কথা বিশ্বাস করে না। তখন হেলেনা দাঁড়াতেই একজন মিলিটারি পিছন থেকে লাথি মারার সাথে সাথে লুটিয়ে পরে। হেলেনা পরার সাথে মাটির ঘরের মেঝে রক্তে ভেসে যায়।

ওরা হাসতে হাসতে নজর আলীর বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়। সারারাত অনেক যন্ত্রণা সহ্য কররা পরে ১৬ ই ডিসেম্বর হেলেনার একটা কন্যা সন্তান জন্ম নেয়।
১৫ তারিখে সোহেলদের বাহিনী পাক সেনাদের ক্যাম্পে আক্রমণ করার পরিকল্পনা করে। তারা ভাবে রাতের আঁধারে ক্যাম্পে আক্রমণ চালাবে। সরাদিন প্রস্তুতি নেয়।গভীর রাতে পাক সেনাদের ক্যাম্পে তারা ঝাপিয়ে পরে। পাক মিলিটারির সাথে সম্মুখ যুদ্ধে সোহেল শহীদ হয়। শহীদকে বাঁচাতে গিয়ে একটা গুলি নজর আলীর বাম পায়ে এসে বিধঁলে সে মাটিতে লুটিয়ে পরে।এ অপারেশনে অন্য ক্যাম্প থেকেও অনেক মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধ করে শত্রুদের পরাজিত করে। ১৬ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধারা বিজয় মিছিল করে গ্রামে আসতে থাকে কিন্তু সোহেলদের কেউ তো আসছে না।

Leave a Comment