আজিজুন নাহার আঁখি

সৈকত অজপাড়া গাঁয়ে বেড়ে উঠেছে তাই তেমন করে পহেলা ফাগুন উদযাপিত হতে দেখেনি। কিন্তু ভার্সিটিতে ভর্তি হবার পর এবার প্রথম তার ফাগুনের অনুষ্টান দেখা। নানা রঙে ঢঙে সবাই সেজেছে। যার দিকে সৈকত অপলক নয়নে তাকিয়ে আছে। সবাই হৈ হুল্লোড় করছে কিন্তু সৈকত এক কোণে দাঁড়িয়ে মিটমিট করে হাসছে। হটাৎ করে হলুদ শাড়ি পরে শিলা এসে সৈকতের হাত ধরে সবার মাঝে নিয়ে যায়। সৈকত চমকে উঠে এক সুন্দর অনুভূতিতে হৃদয়ে শিহরণ জাগে।
সৈকত আর শিলা একই ডিপার্টমেন্টে পড়তো। তাই খুব তাড়াতাড়ি তাদের মাঝে বন্ধুত্ব হয়। একে অপরের খুব কাছাকাছি চলে আসে। জন্ম নেয় পবিত্র ভালোবাসার।

অনার্স শেষে শিলার বিয়ের জন্য বাড়ি থেকে চাপ দিতে থাকে। কিন্তু পড়াশোনা করে আরও উন্নতি করবে এ কথা বলে বাবা মাকে বুঝায়।মাস্টার্স পরীক্ষা শেষ হওয়ার সাথে সাথে শিলার পরিবার আর দেরি করতে চায় না।এদিকে একটা চাকরি ছাড়া সৈকতের পক্ষে তো এখন বিয়ে করা সম্ভব নয়। কি করবে এখন? । শিলা কয়েক দিনের জন্য গিয়েছিল আর এর মাঝে সৈকতের সাথে যোগাযোগ হয়নি।
ক্যাম্পাসে এসে শিলা জানতে পারে সৈকত অসুস্থ।

সৈকতের কয়েকদিন যাবত জ্বর পেটে ব্যথা শুনে শিলা জোর করে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায়।ডাক্তারের পরামর্শ মেনে সৈকত একটু সুস্থ হয়ে ওঠে।
কিন্তু এই সুস্থতা স্থির থাকে না মাঝে মাঝেই সে অসুস্থ হয়ে যায়। এরই মাঝে ওদের পরীক্ষা শেষ হয়।
সৈকত প্রথম শ্রেণি পায় আর শিলা দ্বিতীয় শ্রেণি।

কিছু দিনের মধ্যেই সৈকত ভালো একটা চাকরি পায় কিন্তু আবার শারীরিক ভাবে অসুস্থতা গ্রাস করে। সৈকত ছোট্ট একটা বাসা ভাড়া নিয়েছে আর কিছুদিন পরেই শিলাকে সে ঘরে তুলবে।
হটাৎ সেদিন অফিসে সৈকত অসুস্থ হয়ে যায়। ঢাকার নামকরা একটা হাসপাতালে তাকে ভর্তি করানোর পর বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা করে জানা যায় তার লিভারে সমস্যা। সুস্থ হতে চাইলে ট্রান্সপ্লান্ট করা অতি জরুরি।
আর এই খবরটা দ্রুত শিলার কানে পৌঁছে। শিলা ব্যস্ত হয়ে পরে তার লিভার সৈকতকে দেয়ার জন্য।

সৈকত আর শিলার বিয়ে করার কথা ফাগুনে। শিলার কাছে বিয়ে জরুরি নয় জরুরি সৈকতের প্রাণ ফিরে পাওয়া। তাই দ্রুত সব পরীক্ষা নিরীক্ষা করে কিভার ট্রান্সপ্লান্টের সব কাগজ পত্র তৈরি করা হয়। পরিবারের কারোর কথা না শুনে শিলা লিভার ট্রান্সপ্লান্টের সকল কাগজ পত্র স্বাক্ষর করে।
সব ঠিকঠাক হবার পর যখন অপারেশনের তারিখ নির্ধারণ হয় তখন ডাক্তার জানান লিগ্যাল সম্পর্ক ছাড়া ট্রান্সপ্লান্ট হবে না। এ কথা শোনার সাথে সাথে শিলা সৈকতকে বলে আজই আমাদের বিয়ে হবে। সৈকত কোনোভাবে শিলাকে থামাতে পারেনি।
হাসপাতালের বেডে শুয়েই সৈকত শিলার বিয়ে হয়।বিয়ের পরের দিনই লিভার ট্রান্সপ্লান্ট হয়। আস্তে আস্তে সৈকত সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে।

ওদের ভালোবাসাময় জীবনে সুখ যেন উপচে পরে।
এক বছর যেতে না যেতে ওদের ঘরে এক পুত্র সন্তানের জন্ম হয়।
আল্লাহ পাক যেন সৈকত শিলার ঘরে সুখ শান্তিতে ভরে দিয়েছে।
প্রতি বছর ভ্যালেন্টাইন্স ডে তে ওরা বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ায়।
চার বছর হলো সৈকতের ট্রান্সপ্লান্ট হয়েছে কিন্তু আর কোনো সমস্যা দেখা দেয়নি।

এবার ওদের সমুদ্রে যাবার কথা। ফাগুনের রঙে নিজেদের রাঙানোর কথা। কিন্তু হটাৎ করে কি যেন হলো।
সৈকত হালকা জ্বর নিয়ে অফিস থেকে ফিরলো। শিলাকে চিন্তিত দেখে সৈকত বলে আরে চিন্তা করো না। এখন ঋতু পরিবর্তন হচ্ছে তাই একটু জ্বর এসেছে দেখো কালকেই সেরে যাবে।
মাঝরাতে হটাৎ করে জ্বর অনেক বেড়ে যায় আর সাথে শুকনো কাশি।ভোর হওয়ার সাথে সাথে সৈকতকে নিয়ে শিলা হাসপাতালে যায়। ডাক্তার করোনা পরীক্ষা করার জন্য বলে। পরীক্ষায় পজেটিভ আসে এবং সৈকতকে হাসপাতালে ভর্তি করায়।দিন দিন সৈকতের অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। সাত দিন পরে ডাক্তার ICU তে শিফট করে।সৈকত ছেলেকে দেখতে চায় কিন্তু ডাক্তার অনুমতি দেয়নি। শিলা ছেলেকে শাশুড়ির কাছে রেখে সৈকতের কাছে থাকে। শিলার সেবার কোনো ত্রুটি ছিলো না। কিন্তু সৈকতকে শিলার ভালোবাসা সুস্থ করতে পারেনি। দশদিন পরে সৈকতকে লাইফ সাপোর্টে দেয়া হয়। শিলা কান্নায় বার বার মুষড়ে পড়ে।শিলার বারবার মনে পড়ে সৈকত সমুদ্রে যেতে চেয়েছিলো কিন্তু সেটা আর সম্ভব নয়। ডাক্তার বলে দিয়েছে মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতে। এরই মধ্যে আজ সকালে শিলা ডাক্তারকে অনুরোধ করে লাইফ সাপোর্ট খুলে দিতে। নাকমুখ থেকে সব খোলার পর ভিডিও কলে ছেলেকে দেখে দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পরে আর সাথে সাথে সৈকতের দেহ নিস্তেজ হয়ে পরে।
চিরদিনের জন্য সৈকত সবাইকে কাঁদিয়ে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে।

সৈকতের নিথর দেহের উপর পরে শিলা নিশ্চুপ পাথর হয়ে গেছে।
কিভাবে থাকবে শিলা?
শিলার জীবনের ফাগুনের রঙ কেন হারিয়ে গেল?
কেন ভালোবাসা হারিয়ে যায়?
কেন প্রিয় মানুষ হারিয়ে যায়?

Leave a Comment