শাহেদের আচরণ দিন দিন খারাপ হয়ে গেছে। ব্যবসায়িক কাজের পরিধি বেড়েছে কিন্তু মনের মধ্যে সংকীর্ণতা বেড়েছে। সন্তানদের সাথেও ইদানীং ভালো ব্যবহার করেনা। অবশ্য তার আগের পক্ষের সন্তানদের জন্য সে অন্তপ্রাণ। কিন্তু ছোটো দুই মেয়ে বড়ো হচ্ছে অবহেলায়। মেঘ কিন্তু সবার খেয়াল রাখে কিন্তু শাহেদ শুধু টাকা দিয়েই মনে করছে সব দায়িত্ব পালন করছে। রোদেলা এবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলায় ভর্তি হয়েছে। ও এখন হলে থাকে তাই মায়ের জন্য সারাক্ষণ মন খারাপ করে থাকে।
ভার্সিটি সাত দিনের জন্য ছুটি তাই রোদেলা বাড়ি চলে যায়। বাড়ি মানে ওর নানার বাড়ি। পরের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে মাকে দেখতে রওনা দেয়। রোদেলা আসবে বলে মেঘ মেয়ের পছন্দের খাবার তৈরি করা নিয়ে ব্যস্ত। এদিকে শাহেদ মেঘকে ডেকে সাথে সাথে সাড়া পায়নি বলে বাড়ির মধ্যে চেচামিচি করতেছে। রান্নাঘর থেকে মেঘ এসে শাহেদের কাছে দাঁড়ালে আরোও ক্ষীপ্ত হয়ে উঠে। এক পর্যায়ে বলতে থাকে রোদেলা এখন বড়ো হয়েছে ওর জন্য এতো আদিখ্যতা দেখানোর কি আছে? ও আসলেই তুমি অতিরিক্ত রান্নাবান্না নিয়ে ব্যস্ত থাকো। এ বাড়িতে এসব আর চলবে না। মেঘ শাহেদের মুখে মুখে কখনো কথা বলে না কিন্তু আজ রোদেলার এখানে আসা নিয়ে যেসব কথা বললো তা শুনে মেঘের সহ্য হয়না ।তাই সে বলে আমি বেঁচে থাকতে ওকে কষ্ট দিতে পারবো না। আমি তো সব সন্তানদের দেখভাল করি তাহলে আমার রোদেলাকে নিয়ে কেনো এত কথা হচ্ছে। এ কথা শোনামাত্র শাহেদ মেঘের গায়ে হাত তুলে।এর আগেও শাহেদ মেঘের গায়ে হাত তুলেছে কিন্তু আজ আঘাতের পরিমাণ বেশি। শাহেদ যখন আবার মেঘের গায়ে হাত তুলতেছিলো ঠিক তখন রোদেলা এসে দরজায় দাঁড়ায়। আর শাহেদ নিজেকে সামলে দ্রুত বসার ঘরের দিকে চলে যায়।চোখের সামনে মায়ের এই বেহাল অবস্থা দেখে রোদেলা খুব কষ্ট পায় আর ভাবতে থাকে কিভাবে মায়ের জীবনে শান্তি আনা যায়?
মেঘ ভাবে রোদেলা কিছ দেখেনি বা বুঝেনি তাই ওড়না দিয়ে চোখ মুছে মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে।রোদেলাও মায়ের বুকে মুখ গুঁজে কাঁদে। শাহেদ বাড়ি থেকে বের হবার সময় শুধু বলে যায় আমি এসে যেনো তোমার মেয়েকে আমার বাড়িতে না দেখি।মেঘ চুপচাপ কাজ করতে থাকে। রোদেলা আজ মায়ের কাছে থাকতে এসেছিলো কিন্তু এ বাড়িতে ঢুকে মায়ের সাথে যে ব্যবহার দেখলো তাতে আর এক মুহূর্তুও থাকতে ইচ্ছে করছে না। কিন্তু মায়ের জন্য দুপুরে খেয়ে চলে আসে। রোদেলা চলে আসার সময় মেঘ মেয়েকে জড়িয়ে ধরে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদে। রোদেলা জানি মা কেনো কাঁদছে কিন্তু মাকে কিছু বুঝতে দেয়না।
রোদেলা নানা বাড়ি এসেই ওদের ঘরে গিয়ে শুয়ে পরে। মায়ের সামনে খুব কষ্ট করে কান্না লুকিয়েছিলো তাই এখন নিজেকে আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। রোদেলাকে ফিরতে দেখে সীমা বেগম কাছে এসে দেখে রোদেলা বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে আছে। কি রে বুবু তুই না আজ মায়ের কাছে থাকবি তাহলে এখনই চলে এলি কেন?কি রে কথা বলছিস না কেন? নানু আমার মাকে তোমরা মেরে ফে্লোনি কেন? আর আমাকেও মেরে ফেলতে।
কেন কি হয়েছে ? নানু আজ আমি আব্বুকে(শাহেদ) দেখেছি মায়ের গায়ে হাত তুলতে। মা বেঁচে থেকেও মরে গেছে তো অনেক আগেই। তুমিই তো বলেছিলে আমার বাবাকে মা অনেক ভালোবাসে আর তোমরা জোর করে চাপ দিয়ে মাকে ঐ মানুষটার কাছে পাঠিয়েছ।আজ আমার বাবার কাছে থাকলে মা কি এতো কষ্ট পেত?নানুর সাথে আরোও অনেক কথা বলে। সীমা বেগম চলে গেলে রোদেলা বিছানা থেকে উঠে মায়ের আলমারি খুলে পুরোনো জিনিস খুঁজতে থাকে কোথাও ওর বাবার ঠিকানা আছে কিনা। সারা ঘর তন্ন তন্ন করে রোদেলা খুঁজতে থাকে। কারণ মেঘ একদিন বলেছিলো যে সে রোদ্দুরের বাড়ির ঠিকানায় অনেক চিঠি দিয়েছিলো কিন্তু সেই চিঠির কোনো উওর পায়নি। আর তারপর তো শাহেদের সাথে মেঘের বিয়ে হয়ে যায়।
অনেক খোঁজাখুঁজির পরে রোদেলা ওর মায়ের একটা ছোটো নোটবুক পায়। আর সেই নোটবুকের শেষের পাতায় লেখা আছে রেদুয়ান সিহাব রোদ্দুর, ৩৭/১ সায়েদাবাদ,ঢাকা। ঠিকানাটি হাতে পেয়ে রোদেলার চোখেমুখে আলোর দ্যুতি ছড়ায়।রোদেলা ভাবে এই ঠিকানায় সরাসরি গিয়ে বাবার খোঁজ করবে না কি আগে চিঠি লিখবে। নোটবুকটা নিজের হ্যান্ডব্যাগে ভরে নেয়। ঢাকায় ফিরতে যেহেতু আরোও পাঁচ/ছয় দিন আছে তাই ভাবে আগে একটা চিঠি লিখলে কেমন হয়ু?
রোদেলা নিজের সঠিক পরিচয় উল্লেখ করেই চিঠি লিখতে গিয়ে থেমে যায়।তাই শুধু সৌজন্যমূলক কথা লিখে আর সাথে নিজের মোবাইল নাম্বার দিয়ে চিঠি পোস্ট করে। অবশ্য প্রাপকের ঠিকানায় ভার্সিটির ঠিকানা উল্লেখ করে।রোদেলা এই ঠিকানার কথা কাউকে বলেনা। ও শুধু ওর বাবার খোঁজ নিতে চায় ওর মায়ের জন্য আর নিজের জন্মদাতা বাবাকে কাছ থেকে দেখতে।
রোদেলা ঢাকা আসার আগে মায়ের সাথে দেখা করে আসে। প্রতিবার ঢাকায় ফেরার সময় মেঘ মেয়ের জন্য খাবার রান্না করে আগে থেকেই ডিপ ফ্রিজে রেখে দেয়। রোদেলাও মায়ের হাতের খাবার সানন্দে সাথে নিইয়ে আসে। এবার রোদেলা মাকে ফোন করে বলে যেনো তার জন্য খাবার তৈরি না করতে। বলে যে ভার্সিটির হলে থেকে এভাবে খাবার নিয়ে খেতে ভালো লাগেনা। মেঘকে কোনোভাবেই বুঝতে দেয়না যে শাহেদের সাথে মেঘের ঝগড়া শুনেছে তাই আর খাবার নিবে না। রাতের ট্রেনে ঢাকা ফিরবে তাই দুপুরে খাবার খেয়ে মায়ের সাথে দেখা করতে যায়। ছোট দুই বোন আশা আর আলোকে আদর করে মায়ের কাছ থেকে হাসিমুখে বিদায় নিয়ে চলে আসে। রাত আট টায় ট্রেন তাই সন্ধ্যার পরেই খাবার খেয়ে নেয় আর রাস্তায় খাওয়ার জন্য নানু হালকা নাস্তা দিয়ে দেয়।
রোদেলা চলে গেলে মেঘ ঘরে গিয়ে অনেক কান্নাকাটি করে। আশা আর আলো মায়ের কাছে চুপচাপ বসে আছে। মেঘের ভেতরে যে কষ্টের স্তুপ জমা হয়ে আছে তা দূর হবে কিভাবে? মাঝে মাঝে সব ছেড়ে দূরে কোথাও চলে যেতে ইচ্ছা করে কিন্তু বাচ্চাদের জন্য নিজেকে সামলে নেয়। কিন্তু ইদানীং শাহেদ এতো খারাপ ব্যবহার করছে যে সহ্য করা কষ্টকর। রোদেলার জন্য মনটা বেশি খারাপ করেছে। এবার মেয়েকে কাছেই পেলো না আবার মনের মতো করে খাবারও খাওয়াতে পারিনি। রোদ্দুরের কথা খুব মনে পড়ছে। আল্লাহর এ কেমন খেলা বাবা তার সন্তানের কথা জানেনা ,সন্তান বাবাকে চিনেনা আর কোনোদিন দেখা হবে কিনা তা নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারবে না। মেঘ এখন প্রয়োজন ছাড়া কারোর সাথে তেমন কথা বলে না। এমনকি সন্তানদের সাথেও বলে না। কোনোমতে জীবনটা পার করতে পারলেই হলো।
রোদেলা ভার্সিটিতে যাওয়ার পথে ফোনে মায়ের সাথে কয়েকবার কথা বলেছে কিন্তু প্রত্যেকবার মায়ের কান্নাজড়িত কণ্ঠ শুনে ভালো লাগেনি। মনে মনে ভাবছে যে করেই হোক বাবার খোঁজ নিতে হবে। মা এখনো বাবাকে অনেক ভালোবাসে তাহলে বাবাও নিশ্চয়ই মাকে ভালোবাসে। হলে ফিরেই খোঁজ নেয় রোদেলার নামে কোনো চিঠি আসছে কি না। চিঠির জবাব পেয়ে আবারও আরেকটি চিঠি পোস্ট করে। আর বরাবরের মতো এবারও চিঠির কোনো উত্তর নাই। এভাবে পরপর চার/পাঁচটি চিঠি দেয় কিন্তু কোনোটার উত্তর আসে না।
রোদ্দুর বাবা মায়ের কথায় বিয়ে করলেও তমার প্রতি ভালোবাসার কোনো সম্পর্ক গড়ে উঠেনি। দায়িত্ব কর্তব্যের বেড়াজালে শুধু নিজেকে আটকে রেখেছে। দেশে ফিরে রোদ্দুর নিজের ব্যবসায়ীক কাজ নিয়ে খুব ব্যস্ত সময় পার করছে। আর কাজের অবসরে গাড়ি নিয়ে খুঁজে ফিরে মেঘকে। রোদ্দুর আজও মনে করে সে মেঘকে ঠিক একদিন খুঁজে পাবে। এই যে রোদ্দুর তমাকে তেমন সময় দেয় না তা নিয়ে তমা কখনো অভিযোগের সুর তুলেনি এমনকি আফসোসও করেনা।রোদ্দুরের মা মাঝে মাঝে ছেলেকে এটা সেটা বলে । এমন ব্যস্ত যে নতুন বউকে নিয়ে কোথাও ঘুরতেও যাবার সময় নাই।
সেদিন রাতে খাবার টেবিলে মা বললেন, রোদ্দুর বাবা তুই এতো বছর বিদেশ থেকেছিস কতো দেশ ঘুরেছিস যা না বাবা বউমাকে নিয়ে ঘুরে আয়। মেয়েটা সারাদিন আমাদের সাথেই থাকে ।তুই তো সময় মতো বাড়িতেও আসিস না।
মা আমার অনেক কাজের চাপ আমি এখন কোত্থাও যেতে পারবো না। তোমরা কোথাও ঘুরে আসো আমি ব্যবস্থা করে দেই।
না বাবা থাক তোর সময় হলে তুই বউমাকে নিয়ে ঘুরে আসিস।
তমার মুখে কোনো কথা না থাকলেও বুঝা যাচ্ছে যে, তমার মন চায় বাইরে কোথাও ঘুরতে যেতে।
রোদ্দুর ঘরে এসে তমাকে বলে তুমি ভাবীর সাথে কোথাও বেড়াতে যেতে পারো। আসলে আমার সময় নাই আর আমার ভালো লাগে না।
না কোথাও যেতে ইচ্ছে করেনা ।
রোদ্দুরের মাঝে মাঝে মনে হয় আমি কি তমার উপর অন্যায় করছি?তমাকে তো আমি সব বলেছি। আসলেই আমার হৃদয় গহীনে শুধু মেঘের বসবাস আর এখান থেকে মেঘকে সড়িয়ে দেয়া মানে আমার মরে যাওয়া। তমার যখন যা লাগে সব তো দিচ্ছি তারপরও কি তমা আমার উপর দোষ চাপাবে? এভাবেই কেটে যায় কয়েক বছর। তমাও বুঝে গেছে যে কিছুতেই রোদ্দুরের মনে তার জায়গা হবে না। দুজনের মধ্যে শুধু দায়িত্ব কর্তব্যের সম্পর্ক। তমার নিজের একটা বড়ো ধরণের সমস্যা না শুধু বড় ধরণের অপারগতা আছে যা জেনেও রোদ্দুর তাকে স্ত্রীর সম্মান দিয়েছে এটাই কম কিসের।
তমার সাথে রোদ্দুরের কখনোই ভালোবাসাময় সম্পর্ক তৈরি হুয়নি। তবুও একই ছাদের নিচে ভালোই আছে। তমার সন্তান হয়না সে নিয়ে মাঝে মাঝে শাশুড়ি মন খারাপের কথা বলে কিন্তু রোদ্দুর তমাকে এই বিষয়ে চিন্তা করতে না করে এবং তমাকে সান্তনা দেয়। তমা রোদ্দুরকে অনেক শ্রদ্ধা করে আর ভালোবাসে অনেক। রোদ্দুর দেশে ফেরার পর মাত্র কয়েকবার তমাদের বাড়ি গিয়েছে। তমাকে তার পরিবারের প্রতি দায়িত্ব পালনে সাহায্য করেছে। তমার মা-বাবাও রোদ্দুরের ব্যবহারে সন্তুষ্ট।
অফিসে এসে রোদ্দুর ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পরে। আজকে একটার পর একটা মিটিং ছিলো। মাত্র অফিসে এসে বসেছে ঠিক তখন সাইফের ফোনটা রাখতেই আবার রিং বেজে উঠে। আমি ভেবেছিলাম সাইফই বুঝি ফোন করেছে কিন্তু দেখি তমা ফোন করেছে। সচরাচর তমা আমাকে অফিস টাইমে ফোন দেয় না কিন্তু আজ এই ব্যস্ত সময়ে ফোন দেখেই ধারণা করছিলাম নিশ্চয়ই বাড়িতে কোনো সমস্যা হয়েছে। হ্যাঁ আমার ধারণাই ঠিক। তমা ফোন করেই হাউমাউ করে কেঁদে ফেলে। কাঁদতে কাঁদতে বলে ওর বাবা গ্রামের বাড়িতে গিয়ে খুবই অসুস্থ হয়েছে। উনাকে ঢাকা নিয়ে আসতেছে তাই এক্ষুণি ও ওর ভাইয়ের বাসা হয়ে হাসপাতালে যাবে। আমি বললাম তুমি যাও আমি সরাসরি হাসপাতালে আসছি।
আমি হাতের কাজ গুছিয়ে রেখে তাড়াতাড়ি অফিস থেকে বের হলাম। ঘণ্টা খানেকের মধ্যেই হাসপাতালে পৌঁছে গেলাম। তমার বাবাকে হাসপাতালে ভর্তি করার সব ব্যবস্থা করলাম। কিন্তু এতো সময় পার হলো তবুও এখনো তমা এসে পৌঁছায়নি। সবাই রোগী নিয়ে ব্যস্ত তাই তমার অনুপস্থিতি কেউ খেয়াল করেনি।সেই দুপুরে বাসা থেকে বের হয়েছে আর এখন বিকেল গড়িয়েছে।
তমার মা আমার কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন আচ্ছা বাবা তুমি এতো দ্রুত আসলে কিন্তু আমার মেয়েটা কই?
এতোক্ষণ পরে আমারও মনে হলো সত্যিই তো এতোক্ষণে তো তমার এখানে পৌঁছানোর কথা। মেয়েটাকে স্ত্রী রূপে গ্রহণ না করলেও এ কয় বছরে কিছুটা মায়া জন্মেছে। তমার ফোন সুইচ অফ বলছে। বাড়িতে মায়ের কাছে ফোন করে শুনলাম তমা তো সেই দুপুরেই রওনা হয়েছে। এখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে কিন্তু তমা আসছে না কেন?
তমার বাবা এখন আগের চেয়ে ভালো আছে।তমা না আসাতে ওর মা সহ সবাই টেনশন করছে। আমিও ভেবে পাচ্ছিনা তমার দেরি হচ্ছে কেনো? কেবিনের বাইরে সবাই অপেক্ষা করছে ঠিক তখন কে যেনো একজনকে বলতে শুনলাম ইস কি মর্মান্তিক এক্সিডেন্ট, একেবারে স্পটডেথ।
আমার মনের মধ্যে অজানা এক দুশ্চিন্তা উঁকি দিলো। আমি ঐ লোকটার কাছে জানতে চাইলাম আচ্ছা ভাই কোথায় এক্সিডেন্ট হয়েছে?
উত্তরায় ,রাস্তা পার হতে গিয়ে একটা কাভার্ড ভ্যানের ধাক্কায় এক মহিলা মারা গেছে। তবে মহিলার কোনো পরিচয় পাওয়া যায়নি। হাতের মোবাইল ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। এতোক্ষণে পুলিশ লাশ হয়তো ময়নাতদন্তের জন্য নিয়ে গেছে। আল্লাহ পাক জানে কোন পরিবারের আপনজন হারালো।
লোকটার কথা শুনে তমার মুখটা ভেসে উঠছে। তমার মা কে কিছু না বলে ওর ভাইকে নিয়ে লোকটার কথা অনুযায়ী উত্তরায় দিকে ছুটলাম। গাড়িতে বসে কয়েক জায়গায় ফোন দিয়ে জানার চেষ্টা করলাম দুর্ঘটনার কথা।কিন্তু কেউ স্পষ্ট করে কিছু বলতে পারলো না।
আমি থানায় গিয়ে এক্সিডেন্টের খোঁজ নিয়ে জানলাম যে, মৃতদেহ ময়না তদন্তের জন্য লাশকাটা ঘরে নেয়া হয়েছে। তমার ভাইকে নিয়ে লাশকাটা ঘরে ঢুকে কয়েকটা লাশ চাদর দিয়ে ঢেকে রেখেছে।পর পর ৩/৪ টি মৃতদেহের উপর থেকে চাদর সরিয়ে এদের মধ্যে কাউকে চিনলাম না।মনে মনে ভাবছি যে আমার ধারণা ভুল ,তমা হয়তো অন্য কোনো কাজে আটকে গেছে।
তবুও এসেছি যখন সবগুলো মৃতদেহ না দেখে যাবো না। আমি আর তপু এক এক করে মৃতদেহ গুলো দেখে যাচ্ছি। প্রায় ১০/১২টি মৃতদেহ দেখলাম। ঘর থেকে বের হবো ঠিক তখন পূর্বদিকের এক কোণে একটা মৃতদেহ দেখে আমরা ওদিকে যেতেই একজন বলে উঠলো সাহেব ওদিকে যাবেন না। উনার চেহারার কিছু চেনার উপায় নাই ,আপনারা দেখলে ভয় পাবেন। তবুও আমি আর তপু চাদরটা সরাতেই রক্তেভেজা বিকৃত এক মুখচ্ছবি দেখে চমকে উঠি। মুখ দেখে না চিনলেও ওর পরনের শাড়ি দেখে নিশ্চিত হলাম এ তমা।
তপু হাউমাউ করে কান্না করতে থাকে। আমি কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে যাই। যে মেয়েটাকে আমি স্ত্রী রূপে হৃদয়ে ধারণ করিনি। শুধু সামাজিকতা রক্ষা করেছি আজ ওর এভাবে চলে যাওয়া সত্যিই আমাকে নাড়া দিচ্ছে। তপুকে শান্ত করতে পারছিনা। ভাবতে পাচ্ছি না কি করে এমন খবর কিভাবে বাড়িতে ও ওর পরিবারে জানাবো? তবুও নিজেকে শক্ত করে ওখানকার সব ফর্মালিটিস শেষে এম্বুলেন্স করে আমাদের বাড়ি নিয়ে আসলাম।বড়ো ভাইকে শুধু ফোনে জানিয়েছিলাম। ভাই ভাবী মা বাবাকে কিছু বলেনি তা বাড়িতে ঢুকেই বুঝতে পারলাম। বাসায় এম্বুলেন্স দেখে ভাই ভাবী এগিয়ে পরম যত্নে তমার মৃতদেহ নামালেন। ভাবী গিয়ে মাকে নিয়ে আসলেন ,মা বারবার জিজ্ঞেস করতেছিলো রোদ্দুর এ কাকে বাড়ি এনেছিস? আমি কিছুই বলতে পারিনি। আমার মা বাবা তমাকে অনেক ভালোবাসতেন আর তমাও তাদের সেবাযত্নের ত্রুটি করেনি। বড়ো ভাই বাবাকে ধরে নিচে নিয়ে আসলেন । মুহূর্তের মধ্যে আমাদের বাড়ি জনসমুদ্রে পরিণত হলো।
তমার অসুস্থ বাবাকে হাসপাতাল থেকে এম্বুলেন্স করে নিয়ে আসা হলো। ওর মা বারবার অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছিল।আজ নিজেকে অচেনা লাগছে। যে মেয়েটাকে কখনো ভালোবাসিনি আজ চলে যাওয়ায় ভেতরে কষ্ট হচ্ছিল। এমন অস্বাভাবিক মৃত্যু কারোর পক্ষেই মেনে নেয়া সম্ভব না। কিন্তু আল্লাহর বিধান মেনে নিতেই হয়। তমাকে চিরতরে কবরে রেখে রুমে আসতেই এক শূন্যতা অনুভব করলাম।
এইতো গতকালও এই ঘরে যার উপস্থিতি ছিলো আজ সে সবার ধরা ছোঁয়ার বাইরে। এটাই নিয়তি এভাবেই সবাইকে চলে যেতে হবে।তমার এভাবে চলে যাওয়ায় বাবা মা বেশি কষ্ট পাচ্ছিলো। তমা চলে যাবার এক সপ্তাহের মধ্যে ওর বাবাও মারা যায়। পারিবারিক অশান্তি ঘুচতে না ঘুচতেই আরেক অশান্তি বিরাজমান।সব কিছু স্বাভাবিক হতে অনেক দিন লেগে যায়।আমিও ব্যবসায়ীক কাজে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে থাকি।






